image

আজ, সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং

প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলিতে নতুন নির্দেশিকা: খুলেছে বদলি বাণিজ্যের দুয়ার

ডেস্ক    |    ১৬:৫৮, ডিসেম্বর ৫, ২০১৮

image

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ২০১৪ সালের আগে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও কোনো সদর উপজেলার বাইরে কর্মরত প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের ওইসব এলাকায় বদলি হওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। যে কারণে বদলির জন্য তদবির কিংবা বদলিতে ঘুষ বাণিজ্যের কোনো প্রশ্নও ছিল না। কিন্তু ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সেই চিত্র একেবারেই বদলে যেতে শুরু করে। ২০১৫ সালে ওই নীতিমালা সংশোধন করে মন্ত্রণালয় ‘প্রয়োজনে’ বদলি করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বছরের ১২ মার্চ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক বদলি নীতিমালা’ ঘোষণা করে। এই নির্দেশিকায় প্রথম আন্তঃসিটি কর্পোরেশন বদলির অনুমতি দেওয়া হয়। একই বছরের ৫ জুলাই শিক্ষকদের বদলি সংক্রান্ত আরেকটি নির্দেশিকা জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই নীতিমালার মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য রমরমা করতে যে কোনো কারণে যে কোনো শিক্ষককে যে কোনো সময় বদলির ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে নিয়ে নেন মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। এ নীতিমালার অপব্যবহার করে সারাদেশে ব্যাপক বদলি বাণিজ্য ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। গ্রাম ছেড়ে শহরে ভিড় করেন বিপুলসংখ্যক শিক্ষক। একেকটি বদলির ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকা লেনদেন হয়। ওই সময়ের বদলির আদেশগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায় বেশিরভাগ আদেশই জারি হয়েছে মন্ত্রী, এমপি কিংবা  রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশের দোহাই দিয়ে। কিন্তু সুপারিশের দোহাই দেয়া হলেও কোনো বদলিই ঘুষ লেনদেন ছাড়া হয়নি। এসব বদলিতে অনেক ক্ষেত্রেই মাঠ পর্যায়ের অবস্থা বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ফলে একটি পদের বিপরীতে তিনটি বদলির ঘটনাও ঘটে। শিক্ষক বদলিতে এই বাণিজ্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভায় কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে। সভায় সারাদেশে এ নীতিমালার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপক বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ উত্থাপন করেন এমপিরা।

সূত্র জানায়, প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলির নামে গত কয়েক বছরে অন্তত: শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। বদলি প্রার্থীদের প্রতিজনের কাছ থেকে ৬-৭ লাখ টাকা করে ঘুষ নেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে আসিফ উজ জামান আসার পর তিনি এসব বদলি বাণিজ্যসহ মন্ত্রণালয়ের আরো বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে চাইলে তার সঙ্গে মন্ত্রীর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। প্রতিবছর শত শত শিক্ষকের বদলিতে তদবির আর অবৈধ অর্থ লেনদেন নিয়ে সরকারের ওপর মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন মন্ত্রী। তারপরও তিনি ছিলেন বেপরোয়া। মন্ত্রীর দফতরসহ গোটা মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের হাট বসে। তদবিরকারী শিক্ষকদের চাপে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন সচিব আসিফ উজ জামান নিজ উদ্যোগে বিতর্কিত ওই ‘বদলি নীতিমালা’ স্থগিত করেন। ফলে হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায় বদলি বাণিজ্য। এতে মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। চেষ্টা করতে থাকেন সচিবকে অন্যত্র বদলির। অবশেষে সফলও হন। বদলি বাণিজ্যের পথ সুগম করতে মন্ত্রীর চাপে গত ৩০ অক্টোবর আবার নতুন নীতিমালা জারি করা হয়। এই নীতিমালা ‘নারীবান্ধব’ হিসেবে দাবি করা হলেও এটিকে বদলি বাণিজ্য বৈধ করার একটি ধান্ধা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কারণ দেশের মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮০ শতাংশই রয়েছে গ্রামে। যার ৬০ শতাংশ শিক্ষকই নারী। প্রাথমিক শিক্ষার কল্যাণে তাদেরকে বেশি অংশে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো। ২০১০ সালে অনেক ভেবেচিন্তেই নীতিমালা করে গ্রাম থেকে শহরে আসা বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু এই মন্ত্রী দায়িত্বে এসে ‘নারীবান্ধব’ বদলি নীতিমালার নামে সেই নিয়ম শিথিল করেছেন কেবলমাত্র বদলি বাণিজ্য রমরমা করার জন্য।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে দুবার এবং ২০১১ ও ২০১৫ সাল মিলে মোট ৪ বার প্রাথমিকের ‘শিক্ষক বদলি নীতিমালা’ পরিবর্তন করা হয়। সর্বশেষ গত ৩০ অক্টোবর আবারও সেই বিতর্কিত নীতিমালা জারি করা হয়। এই নীতিমালা জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেট্রোপলিটন ও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বদলির তদবিরের হিড়িক পড়েছে। পদ শূন্য না থাকলেও বিভিন্ন মহল থেকে বদলির তদবির শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। ঘুষের মাধ্যমে বদলি নিশ্চিত করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এক শ্রেণির দালাল চক্রও। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ইতিপূর্বে আড়াই বছরে প্রায় ১২০০ শিক্ষক বদলি করা হয়েছে।

সর্বশেষ গত ৩০ অক্টোবর মন্ত্রণালয় বহুল বিতর্কিত। এই নির্দেশিকা জারির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক বদলি বাণিজ্যের পথ সুগম হয়েছে। যার ফলে মন্ত্রণালয়ে এবং অধিদফতরে তদবিরকারীদের দৌড়ঝাপ শুরু হয়েছে।  বিপুল সংখ্যক শিক্ষক পছন্দের স্থানে বদলি হতে দালালদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এই সুযোগে দালালচক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। একেকটি বদলির জন্য ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা ঘুষ নেয়া হচ্ছে।

নতুন নির্দেশিকা জারির পর সংবাদ মাধ্যমে দেয়া মন্ত্রীর প্রতিক্রিয়াতেও তা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বলেছেন, আগে বদলির ক্ষেত্রে অনেক কড়াকড়ি ছিল। আমরা যতটা সম্ভব শিথিল করেছি। বেসরকারি চাকরিজীবীদের বিষয়টি নীতিমালায় আনা হয়নি। তবে বিশেষ বিবেচনায় বদলি নিশ্চয়ই থেমে থাকবে না। তাছাড়া এটি ভবিষ্যতে অন্তর্ভুক্ত হতেও পারে। 

নতুন শিক্ষক নির্দেশিকায় যা আছে: 
নীতিমালায় ৬ ক্যাটাগারিতে বদলির সুযোগ রাখা হয়েছে। স্বামী বা স্ত্রী সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত যে কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বদলির সুযোগ পাবেন। বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে এ সুযোগ রাখা হয়নি। নির্দেশিকা অনুযায়ী, সাধারণভাবে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার বাইরে থেকে কেউ বদলি হয়ে আসতে পারবেন না। কেবল স্বামী বা স্ত্রীর চাকরির সুবাদে এবং স্থায়ী ঠিকানা হলেই সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মধ্যে বদলি হওয়া যাবে। চাকরির মেয়াদ ২ বছর পূর্ণ না হলে কেউ বদলি হতে পারবেন না। ৫ বছরের মধ্যে দু’বার বদলির সুযোগ মিলবে না। কোনো উপজেলাতেই মোট পদের ১০ শতাংশের বেশি অন্য এলাকার শিক্ষককে পদায়ন করা যাবে না। 

নতুন জারি করা ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলি নির্দেশিকা ২০১৮’-তে ৮টি ধারা ও ৪২টি উপধারা আছে। ৩০ অক্টোবরে জারি করা এ নীতিমালায় বলা হয়েছে- সাধারণ, বৈবাহিক, প্রশাসনিক, সমন্বয়ের প্রয়োজন, সংযুক্ত ও বিবিধ কারণে বদলি করা যাবে। বদলি ও এর আবেদনের সময় আগের মতোই জানুয়ারি থেকে মার্চ। তবে প্রশাসনিক ও সমন্বয়ের প্রয়োজনে সারা বছরই বদলি করা যাবে। এ ধরনের বদলির আদেশ দেবেন মহাপরিচালক। অন্য ক্ষেত্রে বদলির অধিক্ষেত্র সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এসব অধিক্ষেত্রের অধিকর্তা উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বিভাগীয় পরিচালক। ডিপিই (প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর), জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে থানা শিক্ষা অফিসারদের সুপারিশক্রমে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বদলি করা হবে। নীতিমালা অনুযায়ী, চাকরি পাওয়ার পর নারী শিক্ষকদের বিয়ে হলে স্বামীর কর্মস্থলের পার্শ্ববর্তী স্কুলে বদলি হতে পারবেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষকদের স্থায়ী ঠিকানার পার্শ্ববর্তী এলাকার স্কুলে বদলি করা যাবে। প্রতিবন্ধী সন্তানের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক বদলির সুযোগ পাওয়া যাবে। স্বামী মারা গেলে বা বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সুবিধামতো স্থানসহ বিশেষ কোনো কারণে বছরের যে কোনো সময় বদলি হওয়া যাবে।
দুর্গম এলাকায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা চাকরির ২ বছর পর নিজ এলাকায় বদলি হতে পারবেন। এসব বদলির জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও বিভাগীয় উপ-পরিচালকের সুপারিশ প্রয়োজন হবে। জাতীয়করণ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা চাইলে নিজ জেলায় বদলি হতে পারবেন। তবে ৫ বছর পর।
মন্ত্রণালয় কর্মকর্তারা জানান, এখন থেকে যোগ্য ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে শিক্ষকরা ঢাকা মহানগরের যে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য আসনে বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে কেবল বৈবাহিক কারণ বা জীবনসঙ্গীর চাকরি সূত্রে বদলি হওয়া যাবে। বিশেষ কারণে যে কোনো সময় বদলি করা হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগদাতা কর্তৃপক্ষের সুপারিশ লাগবে। শিক্ষকরা নিয়োগের পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে স্বামী বা স্ত্রী উভয়ের স্থায়ী ঠিকানায় বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কাবিননামা, প্রত্যয়নপত্র, সংশ্লিষ্ট পৌর মেয়র/ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান/ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র, স্বামী/স্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানার জমির দলিল, খতিয়ান, বাড়ির হোল্ডিং নম্বর (সিটি কর্পোরেশন এলাকার জন্য) ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রশিদ আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

তবে একই পদে একাধিক আবেদনকারী হলে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বদলির জন্য বিবেচনা করা হবে। স্বামীর কর্মস্থল বা স্থায়ী ঠিকানা- যেখানেই হোক নারী শিক্ষকরা বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়, নদী ভাঙন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিক্ষকের বসতভিটা বিলীন হলে, প্রশাসনিক প্রয়োজনে, কোনো বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ও শিক্ষকদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার প্রয়োজনে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে একই উপজেলায় বদলি করতে পারবেন। এসব নির্দেশনা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার জন্য প্রযোজ্য হবে না। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষকসহ প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা এ নীতিমালার আওতাভুক্ত হবেন। তবে এর আলোকে সংশ্লিষ্ট জেলার উপযোগী নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে পারবে।



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

০০:৩৫, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়েছে: সিইসি


Los Angeles

১৮:২২, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৮

বুথ নয়, কেন্দ্র দেখানো যাবে : সিইসি


Los Angeles

২০:১৭, ডিসেম্বর ১২, ২০১৮

নির্বাচন,নববর্ষকে সামনে রেখে তৎপর হচ্ছে উখিয়া টেকনাফের ইয়াবা সিন্ডিকেট


Los Angeles

২৩:১৬, ডিসেম্বর ৫, ২০১৮

মার্কিন রাষ্ট্রদূত রর্বাট মিলার’র টেকনাফ পরিদর্শন


image
image
image

আরও পড়ুন

Los Angeles

১৬:২৪, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮

রাঙ্গুনিয়ায় আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেছে ইসলামী ফ্রন্ট