image

আজ, শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯ ইং

বয়সে নয়, মানুষ তার কর্মেই চিরকাল বেঁচে রয়

মোঃ আবুল কালাম    |    ১৪:১২, এপ্রিল ২৫, ২০১৯

image

দুপুর বেলা, সূর্য যখন ঠিক মাথার উপরে থাকে।এমন সময়ে আমার বাসার সামনে দুজন লোক এসে হাজির। সামনের রুমে আমার বাবাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কালাম সাহেব বাসায় আছেন? 
- হ্যা, আপনারা কে? কোত্থেকে আসছেন?
- আমরা থানা থেকে আসছি। আপনি কি উনার বাবা??
- জি, আমি ওর বাবা,  কি সমস্যা??
আমি ভিতর রুম থেকেই শুনতে পাচ্ছিলাম সব। 
লোক দুটো আর কিছু না বলেই বাসার ভিতর প্রবেশ করল।
 বল্ল, কালাম সাহেব কে একটু ডেকে দিন
উনার নামে একটা ওয়ারেন্ট আছে।
আমার বাবাতো অবাক! আর আমারো যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল! আমার লাইফে এমন কোন ঘটনা ঘটেনি যে, থানার লোকজন আমাকে খুঁজবে!! 
আমি ভিতর থেকে ওদের সামনে এসে হাজির হলাম। জানতে চাইলাম আমার নামে কিসের ওয়ারেন্ট?? 
আমিই কালাম। 
আমাকে একটা কাগজ দেখিয়ে বল্ল, টি এন্ড টির অভিযোগে সরকারি মামলা। আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে। 
বললাম, আমার বাসায় তো কোন টি এন্ডটির লাইন ই নেই! মামলা হবে কোত্থেকে??
বল্ল, কলতান সংঘের নামে একটি অনাদায়ী  বকেয়া বিল সংক্রান্ত।
......বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা কি!!
প্রায় ৬/৭ মাস আগে আমাদের ক্লাব কলতান সংঘের নামে একটি  উদ্ভট বিল আসে প্রায় চল্লিশ হাজারের মতো। আমাদের ক্লাবে ইন্টারনেট সংযোগ ছিল, মাসে সর্বোচ্চ ১২শ/১৩শ   টাকা বিল আসতো। আমরা মাসেরটা মাসেই পেমেন্ট করে দিতাম। কিন্তু এই অনাখাংকিত, উদ্ভট বিলটা নিয়ে ক্লাবের সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবগত করা হয়েছিল।এমনকি  টি এন্ড টি অফিসেও কয়েকবার যোগাযোগ করার পরও কোন সুরাহা হয়নি। কখন যে এটা নিয়ে মামলা হল, আমরা নিজেরাও জানি না।এমনকি এই ব্যাপারে কখনো একটা নোটিশও পাইনি। আমি তখনো ক্লাবের সচিব হিসেবে দায়িত্বরত। তাই ক্লাবের অনেক নেতৃবৃন্দ থাকা সত্বেও সব দায়িত্ব  নিয়মানুযায়ী আমার উপরেই বর্তায়। 

যাই হোক, আমাকে থানায় যেতেই হবে এই পরিস্থিতিতে এটাই বুঝলাম। কিন্তু আমার বাবা অনেক উত্তেজিত। আমি ইশারায় ওনাদের আমার বাবাকে শান্তনা দেওয়ার ইংগিত করছিলাম। ওনারাও বুঝিয়ে বল্ল,আমিও। বললাম, বাবা কোন সমস্যা নেই আমি থানায় যাই, সমস্যা হবে না, ক্লাবের নেতৃবৃন্দরাই দায় নিবে। উনাদের সাথে আমার যোগাযোগ হচ্ছে, সবাই থানায় আসছে।

এরই ফাঁকে আমি আমার সংঘের অনেক নেতৃবৃন্দ, আমার প্রভাবশালী আত্নীয় স্বজনদের সাথে মুবাইলে যোগাযোগ করে ফেলেছি আমার সমস্যা নিয়ে।  কেউ বল্ল কিছু টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে নাও, কেউ বল্ল বুঝিয়ে বল....ইত্যাদি ইত্যাদি। বাট কোন কিছুতেই ম্যানেজ করা গেলো না। তারা বল্ল, এটা সরকারী মামলা এটাতে কোন উপায় নেই। যদিও যেতে যেতে ২/৩ দিনের সময় দেয়া সাপেক্ষে আমাকে একটা মোটা অংকের টাকার প্রস্তাব রেখেছিল তারা, কিন্তু তা প্রদান করা তো দূরে থাক,সেটা দেবার  কমিটমেন্ট করারও যোগ্যতা বা সাহস  ছিল না আমার।

থানায় পৌঁছে ফোন দিলাম আমাদের ক্লাবের সভাপতি জোবাইয়ের সাহেবকে।তিনি সব ঘটনা শুনে আমাকে বল্ল, তুমি কোন চিন্তা করো না আমি এক্ষুনি ব্যবস্থা নিচ্ছি। তিনি আমাকে এমনভাবে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন,যেন আমি একটা অবুঝ শিশু। অথচ আমি উনাকে প্রথমে ফোন দেই নাই এই ভেবে যে, উনি একজন বড় ব্যবসায়ী, ব্যস্ত মানুষ। হয়তো আমার ফোনটা রিসিভ করার সময়ও পাবেন না।কিন্তু শেষ মুহুর্তে  নিরুপায় হয়ে উনাকে ফোন দিয়েই আমি অবাক!!

উনি যে আমাকে এতটা গুরুত্ব দিবেন ভাবতেই পারিনি।শুধু কি তাই?? দু' মিনিট পর পর আমাকে উনি নিজে থেকে ফোন দিয়ে সাহস যোগাচ্ছিলেন আর এই বারবার ফোন আসা দেখে আমার থেকে আমার মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দিলেন থানার কর্মরত অফিসার। আমি হতাশ। কি হবে এখন! 

আজ বৃহস্পতিবার যদি কোর্ট থেকেও আমার কেউ জামিনের ব্যবস্থা করে তাও মিনিমাম আমার দু থেকে তিনদিন জেল কাটতে হবে। যেটার জন্য আমি আমার জীবনে কখনোই প্রস্তুত ছিলাম না। আমার পৃথিবীটা যেন ক্রমশ অন্ধকার হয়েই আসছিলো। 

কিন্তু আমি দেখলাম, আমার ফোন কেড়ে নেওয়ার পর ঐ থানার আর কারো ফোন শান্তিতে নেই। একের পর এক ফোন বাজতেই লাগল। সবার মুখে শুধু আমাকে নিয়ে আলোচনা। প্রায় তিন ঘন্টা পর একজন রাজনৈতিক নেতা আসল আমার কাছে... আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বল্ল। কিছুক্ষন পর ওসির রুমে নিয়ে গেল আমাকে। কি একটা কাগজে সই নিয়ে আমাকে নিয়ে থানার সামনে রাখা জোবায়ের সাহেবের সদ্য কেনা ব্যক্তিগত কোটি টাকার মূল্যের গাড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে ওই নেতা বল্ল,  আপনাকে সামনে বসিয়ে জোবাইয়ের সাহেবের কাছে নিতে বলেছেন। দয়া করে আপনি সামনের সিটে উঠে বসুন। 

আমি বুঝতে পারছিলাম না, এটা কি স্বপ্ন না বাস্তব!!বিস্মিত আমি সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে  উঠে বসলাম গাড়িতে আর পৌছে গেলাম উনার অফিসে। আমার সামনে তিনি! আমি উনাকে কদম বুচি করলাম। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আনন্দে আমার দু 'চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলাম না। আমি কাঁদতে শুরু করলাম। উনি আমাকে সাথে নিয়ে আমার বাসায় পৌঁছে দিলেন।

আমি পরে শুনেছিলাম উনি আমাকে থানা থেকে ছাড়াবার জন্য সংশ্লিষ্ট  মন্ত্রনালয় পর্যন্ত যোগাযোগ করেছিলেন। আর আমি থানা থেকে চলে আসার পর আমার ক্লাবের অনেক নেতৃবৃন্দ, আত্বীয় স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী থানায় গিয়েছিলেন আমার খবর নেওয়ার জন্য। আমি তাদের কাছেও কৃতজ্ঞ।

তার পরের রবিবারে চল্লিশ হাজার টাকা দিয়ে টি এন্ড টির বকেয়া বিল পরিশোধ করে ওই দিনই হাতে হাতেই ওখান থেকেই ক্লিয়ারেন্স নিয়ে থানায় জমা দিয়ে সবকিছু চিরতরে মিমাংসা করেন। 

পরের দিন ক্লাবের হিসেবের খাতা সামনে নিয়ে আমি ফোনে জানতে চাইলাম, আমাদের সভাপতি জোবাইয়ের সাহেবের  কাছে এই চল্লিশ হাজার টাকাতো ক্লাবের ফান্ড থেকে যাবে, আমি কি হিসেবে আপনার টাকাটা জমা দেখাবো? তিনি বললেন," আপাতত তোমার ভাবীর নামে ক্লাবে লোন হিসেবে দেখাও, বাকিটা পরে দেখা যাবে।"

আমাদের ক্লাবে যে কোন অনুষ্ঠান বা কর্মসুচীতে কম বেশি সবাই  অর্থের যোগান দেন। এবং তা যার যার ব্যক্তিগত লোন হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকে। পরে কোন সংঘের আয়ের সাথে তা সমন্বয় করা হয়। কিন্তু উনি ঐদিন উনার নামে না দেখিয়ে কেন ভাবীর নামে দেখাতে বলেছিলেন তা বুঝতে পারিনি। আর  এরকম কখনোই বলেননি তিনি।

তবে কি উনি জেনে গিয়েছিলেন উনার সব দায়িত্ব উনার প্রানের সহ সহধর্মিণী সাকিরা নুর চৌধুরীর হাতেই দিয়ে চলে যাবেন সহসা বহুদুরে!!উনি কি তাহলে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন???  আমাকে এটা এখনো ভাবায়। আমি এখনো ভাবি....।

আর বর্তমানে আজ উনার সব দায়িত্ব উনারই প্রতিচ্ছবি মিসেস সাকিরা নুর চৌধুরীর হাতে অর্পিত। যিনি এখন একজন সফল সংসারের উপযুক্ত যোদ্ধার ভূমিকায় যুদ্ধরত।সমাজের প্রতিটা স্তরে,প্রতিটা গরীব দুঃস্থদের সহায় এখন তিনিই।প্রাণপ্রিয় জীবনসঙ্গীর অসমাপ্ত কাজ সুচারুরুপে করে যাচ্ছেন তারই সুযোগ্য সহধর্মীনী।

এখনো আমার মতো অসংখ্য মানুষের মুখে জোবায়ের সাহেবের সাহায্যের কথা,আন্তরিক ব্যবহারের কথা চর্চা  হয়। এখনো অসংখ্য অসহায় মানুষের বুকে উনি বেঁচে আছেন,স্মৃতিপটে সমুজ্জ্বল  উনার সু কর্মের মধ্য দিয়ে। 

আজ এই মহান আলোকিত মানুষটির তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। আজকের দিনে প্রার্থনা, দয়ালু আল্লাহ উনাকে জান্নাতের সর্বশ্রেষ্ঠ মহিমান্বিত স্থান দান করুন আর উনার পরিবারবর্গকে অসীম ধৈর্য্যে আর উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।

লেখক : মোঃ আবুল কালাম, সাহিত্য ও প্রচার সম্পাদক, মধ্যম হালিশহর কলতান সংঘ।



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

০১:৫১, মে ১০, ২০১৯

এলবাম


Los Angeles

০১:১৫, মে ৭, ২০১৯

উখিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা


Los Angeles

১৪:১২, এপ্রিল ২৫, ২০১৯

বয়সে নয়, মানুষ তার কর্মেই চিরকাল বেঁচে রয়


Los Angeles

১৬:৩৯, এপ্রিল ৩, ২০১৯

দাও বৃষ্টি ঝেঁপে, কল্যাণে ছেপে


Los Angeles

০১:১৩, মার্চ ২৪, ২০১৯

লোডশেডিং


Los Angeles

১৩:২৩, ফেব্রুয়ারী ২৩, ২০১৯

ফয়সাল শাহরিয়ার এবং কন্যা ফারিয়া


image
image