image

আজ, শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯ ইং

কর্ণফুলীতে খাবার পানির তীব্র সংকট ! 

মালেক রানা, কর্ণফুলী সংবাদদাতা    |    ২৩:০৪, মে ১৩, ২০১৯

image

ছবি-প্রতীকি

‘আমরা মৌলিক চাহিদার খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান চাই না, কোনো রকমে বেঁচে থাকার জন্য একটু সুপেয় নিরাপদ পানি চাই।’ আবেগজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের মাদ্রাসা গ্রামের গৃহিনী খাদিজা বেগম (৪২)।

তিনি একা নন, তার মতো গোটা উপজেলাবাসী সুপেয় পানি নিয়ে নানা কষ্টের কথা তুলে ধরলেন অনেকে।

জানা যায়, কর্ণফুলীতে নিত্য প্রয়োজনীয় সুপেয় পানি নিয়ে বিপাকে রয়েছেন পাঁচ ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ। কর্ণফুলীতে সুপেয় নিরাপদ পানির একমাত্র উৎস ৬৫% অগভীর নলকুপে আর সহজে পানি আসেনা। পাশের বাড়ির গভীর নলক‚প কিংবা বরফ কলের পানি কিনে ব্যবহার করে কাটছে অনেকের নিত্য জীবন।

আনুমানিক ১৯৯৪ কিংবা ১৯৯৮ সালের দিকে গ্রামের মানুষেরা পানির সহজ স্তর ৩০/৩৫ ফুট মাটির নিচে সুপেয় পানির সন্ধান পেত কিন্তু তা আজ হারিয়ে গেছে। এলাকাবাসীর পক্ষে চরলক্ষ্যার ওমর ফারুক ও ওয়াজ উদ্দীন আজাদ বলেন, বর্তমানে ৮০০/৯০০ ফুট গভীরে গেলেও খাবার পানি মিলছেনা। ফলে জোয়ারের পানিতেই তারা গোসল ও গৃহস্তির নানা কাজ সারছে বলে জানান।’

গ্রামের লোকজন মাইলের পর মাইল হেঁটে কলসি করে, কেউ কেউ ভ্যানে করে পানি সংগ্রহ করেন। বিশুদ্ধ পানির অভাবে গ্রামাঞ্চলের কিছু মানুষ নদীর লবণাক্ত পানিতে ফিটকিরি মিশিয়ে খাওয়া ও রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহার করছেন। এছাড়া কিছু কিছু পুকুরের যৎসামান্য পানি আছে তাতে শেওলার দুর্গন্ধ হলেও তা বাধ্য হয়ে ব্যবহার করায় অনেকে পানিবাহিত রোগ পেটের পীড়াসহ, ডায়রিয়া ও আমাশয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা জানান, ভৌগোলিক কারণে এ উপজেলা সমুদ্র উপক‚লীয় কর্ণফুলী নদী মোহনায় অবস্থিত। বছরের প্রায় ১২ মাসই এলাকাবাসীকে নদীর পানির চারপাশে বসবাস করতে হয়। উপজেলায় বেশির ভাগ মানুষকে বিশুদ্ধ খাবার পানি জন্য অন্যের জলসীমা ও লাইনের কেনা পানির ওপর নিভর্রশীল হতে হয়।’

অনেক বাসা ভাড়িতে বসানো সাধারণ টিউবওয়েল গুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় বেশির ভাগ নলকুপগুলো অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। প্রাথমিক ভাবে ধারণা করছে বিগত ১০/১৫ বছরেরও অধিক সময়ে সাধারণ টিউবওয়েলে পানি ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করে। অভাবে পড়ে সুপেয় পানির। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এ সমস্যা।

সত্রমতে, কর্ণফুলী উপজেলায় লক্ষাধিক লোকের বসবাস হলেও প্রায় ৬৫% ভাগ মানুষের জন্য সুপেয় পানির কোন ব্যবস্থা নেই। অথচ ২১ বছর আগেও এ অঞ্চলে যখন নদীর পানির সরাসরি অনুপ্রবেশ ছিল শাখা খাল গুলোতে তখন সুপেয় পানির কোন ঘাটতি ছিল না।
তথ্যমতে জানা যায়, ১৯৯৪ সালের দিকে কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের আজিমপাড়ায় ‘রনসন’ নামে এক ফ্যাক্টরী গড়ে ওঠে। যা পরবর্তীতে গোল্ডেনসন নাম ধারণ করে। সে সময় রনসন ফ্যাক্টরীতে মাটির গভীর থেকে পানি তোলার জন্য একটি ডীপ বসানো হয়। এলাকাবাসীর ধারণা এর পর হতে সৈন্যেরটেক ও চরপাথরঘাটার আশেপাশে ধীরে ধীরে কমতে থাকে সুপেয় পানির উৎস গুলো এবং শুকিয়ে যায় পানির স্তর।

কেন কর্ণফুলীতে ভ‚-গর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাচ্ছে? এটা কী মানবসৃষ্ট কোন কারণ না অন্য কিছু? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পাঁচটি ইউনিয়নের অধিকাংশ সাধারণ মানুষেরা আমাদের কিছু তথ্য দিয়েছেন। যা আমলে নেওয়ার মতো তাদের কথায় রয়েছে অনেকটা যুক্তিনির্ভর বলে মনেহয়।

তার কারণ হিসাবে প্রধানত তারা জানায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন ও সরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার বিধি নিষেধ’কে বৃদ্ধাঙ্গুগুলি দেখিয়ে যেখানে সেখানে কর্ণফুলীতে শিল্প কারখানা গড়ে তোলা। পাশাপাশি আনোয়ারা কর্ণফুলীতে কোরিয়ান ইপিজেড ও চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরী লিমিটেড (সিইউএফএল) পানি সংকটে বড় একটি ফ্যাক্টর বলে ধারণা করছে এলাকাবাসী। সাথে আইনের তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র স্থাপন করা হচ্ছে বরফ কল ও ছোট বড় ফ্যাক্টরীতে গভীর নলকূপ।

এসব গভীর নলক‚প স্থাপনের ফলে ভ‚’গর্ভেস্ত পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই সাধারণ নলক‚প থেকে পানি কম উত্তোলন হচ্ছে অথবা সাধারণ নলক‚প অকেজো হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় ৩০০/৪০০ ফুট গভীরে গেলেও পানি পাচ্ছে না খাওয়ার। সুপেয় পানির বেলায় মিলছে শুধু হাহাকার আর হতাশার বানী।

জানা গেছে, কর্ণফুলী উপজেলার জুলধায় কিছুটা পানি ভালো। বড়উঠানে নলক‚প বসায় আর ওঠায়। শিকলবাহায় পানির দ‚র্দশা, চরলক্ষ্যায় পানি নিখোঁজ, চরপাথরঘাটায় টাকায় মিলে পানি।

স্থানীয়রা জানায়, নদীর পাশে চরপাথরঘাটার অবস্থান ফলে গড়ে ওঠেছে একাধিক বরফ কল আর পানি বেচাকেনার সিন্ডিকেট। প্রতিদিন ভোরে এসব বরফকলে স্থাপিত গভীর নলক‚প থেকে ড্রামে পানি ভর্তি করে সোডিয়াম কার্বনেট পার অক্সিহাইড্রেট জাতীয় ঔষধ মিশ্রণ করে কিংবা অনেকে না করে বিভিন্ন ট্রলারে ও ভাড়া বাসায় বেচাকেনা করছে। ভ্রাম্যমান আদালত কিংবা অভিযান পরিচালনা না থাকায় এ সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে পানি ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রাম ওয়াসাও এবিষয়ে অনেকটা উদাসীন বলে জানা যায়।

যুবলীগ নেতা মো. আবিদ হোসেন বলেন, ইতিমধ্যে সরকারি উদ্যোগে উপজেলার দৌলতপুর গাবতল ২নং ওয়ার্ডে জনস্বার্থে গভীর টেস্ট টিউবওয়েল বসিয়ে এলাকার পানি পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ডি,পি,এইচ,ই। কিন্তু পানি খাবার যোগ্য না হওয়ায় নতুন পদ্ধতিতে পানির ব্যবহার ও খাওয়ার উপযোগী করার প্রক্রিয়ায় কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট স‚ত্র জানায়, ভ‚’গর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে ১৯৮৬ সালে একটি অধ্যাদেশ জারি হয়। এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী একটি গভীর নলক‚প থেকে আরেকটি গভীর নলক‚প স্থাপন করা যেত ২৫০০ ফুট দ‚রত্বে। কিন্তু সরকারের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অপ ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডবিøউএম) এক বির্তকিত প্রতিবেদনে সেই দ‚রত্ব কমিয়ে ১২০০ ফুট করা হয়।

কিন্তু সেই আইনের তোয়াক্কা না করে কর্ণফুলীতে যত্রতত্র মিল কারখানায় ও ফ্যাক্টরীতে গভীর নলকূপ স্থাপন করছে। গড়ে ওঠছে অনুমোদনহীন বরফকল ফলে ভ‚-গর্ভে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। সাধারণ নলক‚প হারাচ্ছে পানি। উত্তোলন হচ্ছে না সুপেয় জল। সংকটে পড়ছে সাধারণ মানুষেরা। যা সংকট নিরসণে দাবি ওঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী তামজীদ ও জিসান জানান, যত্রতত্র গভীর নলক‚প স্থাপনের ফলে ভবিষ্যতে কর্ণফুলীবাসী বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়বে।

উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে বিশাল পানির চাহিদার বিপরীতে এ মুহ‚র্তে ৫৭টি গভীর নলক‚প বসানোর পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মজা পুকুরগুলো পুনঃখননসহ নতুন করে কমপক্ষে আরো কয়েকটি বড় পুকুর খনন ও স্বাস্থ্যসম্মত রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্লান্ট নির্মাণ জরুরি। এগুলো নির্মিত হলে এলাকাবাসীর পানির চাহিদা কিছুটা হলেও প‚রণ হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন।
কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ’লীগের সভাপতি আলহাজ্ব ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘সংকট সমাধানে নতুন উপজেলা হওয়া সত্বেও স্থানীয় সংসদ সদস্য মাননীয় ভ‚মিমন্ত্রীর সার্বিক সহযোগিতায় ইতিমধ্যে 

৫৭টি গভীর নলক‚প স্থাপনে পরীক্ষাম‚লক কাছ চলছে। নিরাপদ পানির অভাব পুরণে প্রতিটি ইউনিয়নে দ্রæত সময়ে এসব টিউবওয়েল স্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়াও আমরা চিন্তা করছি উপজেলা গভর্ন্যান্স প্রজেক্টর আওতায় প্রতিটি পুকুরের খননকাজ করার।’
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্ণফুলী উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপ-সহকারী প্রকৌশলী উত্তম কুমার মজুমদার বলেন, পানির সমস্যা বুঝতে পেরে সরকারী উদ্যোগে ৫৭টি গভীর নলক‚প বসানোর প্রকল্প হতে ৮টি নলক‚প ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয়েছে। বাকি গুলো বসানোর কাজ চলছে।’

তিনি আরো বলেন, এসব কাজ করতে গিয়ে দৌলতপুর গাবতলে একটি টেস্টটিউবওয়েল বসিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম তাতে ওয়াটার লেবেলে আর্সেনিক ও ক্লোরাইড এর পরিমাণ স্বাভাবিক ৩৫০ এর জায়গায় পাওয়া গেছে ১৮০০ মাত্রা। ফলে এ পানি খাওয়া যাবেনা কিছুতেই।’

এ জন্য সুপেয় পানি পেতে হলে এ সমস্ত জায়গায় ‘ক্লোরাইড এন্ড আয়রন রিমুভাল প্ল্যান্ট’ বসানোর প্রয়োজন হবে। তবেই পানি পান করা যাবে আর নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

০০:১৬, মে ২৪, ২০১৯

পেকুয়ায় ক্ষতিপূরণ না পেয়ে খোলা আকাশের নিচে ৪টি অসহায় পরিবার


Los Angeles

০৪:১২, মে ২১, ২০১৯

ঈদকে সামনে রেখে কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশের লাগামহীন টোকেন বাণিজ্য


Los Angeles

০০:২০, মে ২০, ২০১৯

ঈদ সামনে রেখে সরগরম দোহাজারী'র টেইলার্সগুলোঃ দর্জি কারিগরদের নির্ঘুম কর্মব্যস্ততা


Los Angeles

০০:০১, মে ২০, ২০১৯

আনোয়ারায় জমে উঠছে ঈদ বাজার


Los Angeles

০০:৩৭, মে ১৯, ২০১৯

টেকনাফে বাড়িতে বাড়িতে হুন্ডি : রেমিট্যান্স হারাচ্ছে সরকার 


Los Angeles

০২:১৮, মে ১৮, ২০১৯

বিলুপ্তির পথে মাটি-ছনের ঘর !


Los Angeles

০১:৫৫, মে ১৮, ২০১৯

কর্ণফুলীতে তেল চোরাকারবারীদের পোয়াবারো, রাতারাতি বনছেন কোটিপতি !


Los Angeles

০১:৪৬, মে ১৮, ২০১৯

কর্ণফুলীতে এনজিও সংস্থার কাজ নিয়ে প্রশাসনের কাছেও তথ্য নেই!


Los Angeles

০০:৩৩, মে ১৮, ২০১৯

দোহাজারীতে কচি তালের শাঁস বিক্রি বেড়েছে বহুগুন


image
image