image

আজ, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯ ইং

উখিয়া টেকনাফের সবুজ পাহাড় এখন রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল !

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা    |    ০১:৪০, আগস্ট ৬, ২০১৯

image

উখিয়া টেকনাফের আগের সবুজ পাহাড় শ্রেণী এখন আর নেই। সবুজ পাহাড় কেটে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল। একসময়ের ঘন সবুজ পাহাড়ের ঘন বন জঙ্গল সাবাড় করে গড়ে তোলা হয়েছে লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের জন্য ঝুপড়ি ঘর।
২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট উখিয়া সীমান্ত দিয়ে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আগে এসব এলাকার চিত্র ছিল ভিন্ন। তখন টেকনাফ-উখিয়ায় ছিল গায়ে গা লাগানো অসংখ্য ছোট বড় পাহাড়। যে দিকে চোখ যায়, সেদিকেই শুধু সবুজ আর সবুজ। আকাশে হেলান দিয়ে থাকা এসব পাহাড়ের গহিন অরণ্য বণ্য প্রাণীর অভয়ারণ্য। যে কারণে কিছুদূর পরপরই বন বিভাগের সতর্কতা মূলক বিলবোর্ড চোখে পড়ত ।

পথচারীরা সাবধানে পথ পাড়ি দিত অন্যরকম এক অনুভূতি নিয়ে। এমন দৃশ্য ছিল ২ বছর আগে। কিন্তু মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ঠাঁই দিতে গিয়ে ভাঙাগড়ার মুখে পড়ে পাহাড় শ্রেনী ও সবুজ বন বনানী।

উখিয়ার সেই সবুজ পাহাড় এখন ধু-ধু মরুভূমি। সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার পরিস্থিতিও পাল্টে যেতে থাকে। দ্রুততর সময়ের মধ্যে চমকে ওঠার মতো পরিবর্তন সেখানে। পাহাড় কেটে পাকা রাস্তা, কংক্রিটের ব্রিজ, আরসিসি পিলারের ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেখানে গড়ে উঠেছে হাটবাজার, বিপণিবিতান, স্কুল, মাদ্রাসা ও হাসপাতাল। সকাল-বিকাল শত শত দামি জিপ মাইক্রোবাস সিএনজি চালিত অটোর চলাচলে মুখরিত থাকে শিবির। কখনো কখনো দীর্ঘ যানজটেও পড়তে হয় পাহাড়ের বুক চিরে গড়ে ওঠা সড়কে। সন্ধ্যা হলেই বৈদ্যুতিক খুঁটির মাথায় জ্বলে ওঠে আলো। তখন ঝলমলে এক জনপদ। আর এভাবে গড়ে উঠেছে নতুন এক নগরী। এ নগরী শুধু রোহিঙ্গাদের। তাই অনেকেই একে বলেন ‘রোহিঙ্গা নগরী’।

উখিয়ার বালুখালী পশ্চিমপাড়া, জুমেরছড়া, থাইংখালীর লন্ডাখালী, ময়নারঘোনা, তাজনিরমারখোলা, কুতুপালংয়ের মধুরছড়া, লম্বাশিয়ার পাহাড় ঘুরে দেখা গেছে নতুন নগরী গড়ে ওঠার নানা ঘটনা। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সময় বা তার কিছু পরে এসব স্থানে যেতে যুদ্ধ করতে হতো। হাঁটু সমান কাদা ডিঙিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিত রোহিঙ্গারা। তখনো দুর্গম এলাকায় খাবার পৌঁছত না। পানির জন্য হাহাকার করত মানুষ। এবার দেখা গেল সেই পাহাড়ের বুক চিরে, ক্যাম্পের ভিতর দিয়ে এঁকে-বেঁকে চলে গেছে পাকা রাস্তাঘাট। যেখানে আগে পা রাখতে ভয় পেতে হতো, সেখানে অবলীলায় চলছে মালবাহী বিশাল ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস, এনজিওদের দামি জিপ, অটোরিকশা, ভ্যানসহ অন্যান্য যানবাহন। আগে যেখানটায় নালা ছিল, সেই পাহাড়ি নালার ওপর এখন কংক্রিটের ব্রিজ হয়েছে। শুধু ওখানটায় না, এমন ব্রিজ হয়েছে আরও অনেকখানে। আক্ষেপ করে উখিয়ার স্কুলের একজন শিক্ষক বললেন, এমন একটা ব্রিজের জন্য সংসদে আমাদের এমপিরা কতই না কথা বলেন। কত যুদ্ধ করতে হয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্যে। কিন্তু এখানে প্রয়োজনের আগেই ব্রিজ কালভার্ট তৈরি হয়ে গেছে।

গত সপ্তাহে উখিয়া বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও উখিয়াতেই ছিল বড় বাজার। কিন্তু সেই জৌলুস এখন আর নেই। কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের সামনে ও ভিতরে বড় বাজার বসে। রোহিঙ্গা শিবিরের ভিতর স্বর্ণালঙ্কার, প্রসাধনী থেকে শুরু করে সব পণ্যেরই দোকান আছে। ওই দোকানগুলোর ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই রোহিঙ্গা। শিবিরের ভিতর ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জীবন-জীবিকা ঘিরে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকা পরিচালিত হচ্ছে।

মানবিক সহায়তা হিসেবে বিদেশ থেকে যে কোটি কোটি টাকা আসে তার এক অংশ ব্যয় হয় রোহিঙ্গা শিবিরে। আর বিশাল অংশ ব্যায় হচ্ছে এনজিওকর্তাদের ভোগ বিলাসে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সামনে দিয়ে দেশি-বিদেশি এনজিও ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার শত শত গাড়ি প্রতিদিন রোহিঙ্গা শিবিরে যাতায়াত করে। কথিত মানবিক সহায়তার কাজে নিয়োজিত দেশি কর্মীদের বড় অংশই উখিয়া ও টেকনাফের বাইরের।

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ক্যাম্প নামের নগরীর মোড়ে মোড়ে বাজার বসে। টাটকা শাক-সবজি আর মাছ কিনে ঘরে ফেরে রোহিঙ্গারা। পুরান ঢাকার মতো পারিবারিক ক্ষুদ্র ব্যবসা তাদের। ইউএনএইচসিআর বা আইওএম এর তৈরি করে দেওয়া ঘরের একপাশ ব্যবহৃত হচ্ছে থাকা-খাওয়ার কাজে, অন্য পাশ দোকানদারিতে। এসব ছোটখাটো দোকান ছাড়াও ক্যাম্পের মধ্যে বেশকিছু বড় স্থায়ী বাজার গড়ে উঠেছে। গ্রামের মানুষেরা পাড়ার দোকানে প্রয়োজনীয় জিনিস না পেয়ে যেমন গঞ্জে যায়, অনেকটা তেমন। রোহিঙ্গাক্যাম্প নামক নতুন নগরীতে গড়ে ওঠা গঞ্জে খাবার হোটেল থেকে শুরু করে জুয়েলারির দোকান- সবই আছে। ইলেকট্রনিকস পণ্য, জামা-কাপড়, জুতা, ওষুধ, জ্বালানি কাঠ, গ্যাসের সিলিন্ডার, দা-বঁটি-কুড়াল, রড-সিমেন্ট, দৈনন্দিন জীবনের সব, সবকিছুই পাবেন এখানে। এমন কি তাদের হাটে বিভিন্ন হাতুড়ে ডাক্তাররাও বসে। কেউ কেউ আসে আয়ুর্বেদিক পণ্য নিয়ে। এক কথায় জমজমাট ব্যবসা-বাণিজ্য।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, এই বাজারের অন্তত ৪০ ভাগ পণ্যই আসছে মিয়ানমার থেকে; চোরাই পথে। প্যাকেটের গায়ে সে দেশের ভাষায় লেখা পণ্যের বর্ণনা অন্তত তাই প্রমাণ করে। বাকি পণ্যের (বিশেষ করে খাদ্যপণ্য) অর্ধেকই বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া রিলিফ বা ত্রাণসামগ্রী যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হওয়ায় বিক্রির জন্য দোকানে তুলেছে তারা। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে- এদের ক্রেতা কারা? টাকা-ই বা পায় কোথায়? জানা গেছে, ইউএনএইচসিআর এর ‘ক্যাশ ফর ওয়ার্ক’ নামে কোনো এক প্রকল্পের আওতায় বহু আগে থেকেই রোহিঙ্গারা কাজের বিনিময়ে টাকা পায়। অন্যান্যদেরও এমন প্রকল্প আছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেকের পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে থাকে। নিয়মিত টাকা পাঠায়।

এ ছাড়া কক্সবাজারের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে (চেয়ারম্যান, মেম্বার) যৌথ বিনিয়োগে দোকানদারির মতো এই ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্যও করছে তারা। সুতরাং এদের টাকার অভাব নেই। এদের ক্রেতা স্থানীয় কক্সবাজারবাসীও। এ ছাড়া মিয়ানমার থেকে আসা ইদ্রিস সওদাগর একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। বালুখালীতে তিনি দোকান দিয়েছেন। বড় দোকান। তার এখানে রয়েছে দুটি গুদাম। অল্প দিনেই তার ব্যবসা বড় হয়েছে। এখন তিনি পাইকারি মাল বিক্রি করেন। অর্ধ কোটি টাকার মতো মালামাল রয়েছে তার দোকানে।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল হওয়ার আগেই ক্যাম্প ছাড়তে হয় এনজিও, আইএনজিওসহ বিশাল টাকার বিনিময়ে যারা রোহিঙ্গাদের সেবা দেন (চাকরি করে) তাদেরকে। তবে এই নিয়ম না মেনে অনেকে থেকেও যান। পড়ন্ত বিকালে রোহিঙ্গা নগরীতে কিছুটা শান্ত পরিবেশ নেমে আসে। পাড়াগাঁয়ের মতোই ক্যাম্প নামের এই নগরীতে গড়ে ওঠা হাট-বাজারে সিনেমার আসরও বসে। পড়ন্ত বিকালে ছেলেরা গঞ্জে আসে টিকিট কেটে হিন্দি সিনেমা দেখতে। সন্ধ্যা নামতেই রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসানো বৈদ্যুতিক খুঁটিতে জ্বলে উঠল বাতি। অন্ধকার পাহাড় আলোকিত করে জেগে উঠল আরেক জনপদ। নগরীতে বেশকিছু মোবাইল কোম্পানির টাওয়ারও বসানো হয়েছে। সেগুলোর মাথায় জোনাকির মতো জ্বলছে লাল-নীল বাতি।

বালুখালী ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে গড়ে উঠেছে নিউমার্কেট। সোনা, মোবাইল থেকে শুরু করে এমন কোনো মূল্যবান সামগ্রী নেই যে সেখানে বেচা-কেনার দোকান নেই। বার্মিজ ভাষায় দোকানের নাম রয়েছে। গড়ে উঠেছে স্কুল মাদ্রাসা। কোনো কোনো স্কুলে রোহিঙ্গা ভাষাতেই শিক্ষাপাঠ চলছে।

ডাব্লিউএফপি, ইউএনএইচসিআরসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী এনজিও সংস্থার বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের উদ্দেশ্যে পাহাড়গুলো কেটে ন্যাড়া করা হয়। উখিয়া উপজেলা সদর রাজাপালং ইউনিয়নের বন্যপশু প্রাণীর অভয়ারণ্য মধুরছড়া, লম্বাশিয়া এলাকায় অর্ধশত বুলডোজার দিয়ে পাহাড় কেটে শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়েছে, আর শত শত ডাম্পার গাড়িতে করে মাটিগুলো অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে। লন্ডাখালী থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সড়কপথে প্রায় ৫ কিলোমিটার উত্তরে রাজাপালং ইউনিয়নের মধুরছড়া ও লম্বাশিয়া এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, প্রায় অর্ধশত বুলডোজার পাহাড় কেটে শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়েছে ।

নতুন করে রোহিঙ্গা বসতি তৈরী করতে এর আগে চৌখালী এলাকায় পাহাড় কাটতে শুরু করে এনজিও সংস্হা ব্র্যাক। ডজনখানেক বুলডোজার দিয়ে পাহাড় কাটার সচিত্র সে সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে জেলা প্রশাসন তা বন্ধ করে দেয়।



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

০১:৪০, আগস্ট ৬, ২০১৯

উখিয়া টেকনাফের সবুজ পাহাড় এখন রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল !


Los Angeles

১৭:৫০, জুলাই ৩০, ২০১৯

রোহিঙ্গা শরনার্থী বাংলাদেশের জন্য একটা বিশাল বোঝা: জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো 


Los Angeles

২০:৫৪, জুলাই ২৮, ২০১৯

৪৪০ হিন্দু রোহিঙ্গা পরিবারকে ফেরত নিতে রাজি মিয়ানমার


Los Angeles

১৯:৩৭, জুলাই ২৭, ২০১৯

নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দিলে মিয়ানমারে ফিরবে রোহিঙ্গারা


Los Angeles

০২:২৪, জুলাই ২৭, ২০১৯

উখিয়া-টেকনাফের স্কুলগুলোতেও এনজিওর প্রভাব; ফলাফল বিপর্যয়ের আশংকা


Los Angeles

০০:১৫, জুলাই ১৩, ২০১৯

স্থানীয়দের কাছে আতংক হয়ে উঠছে রোহিঙ্গারা


Los Angeles

০০:২৮, জুলাই ১১, ২০১৯

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য বড় “বোঝা” : বান কি মুন


Los Angeles

১৮:৫১, জুলাই ৭, ২০১৯

রোহিঙ্গাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে হবে : উখিয়ায় মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী


image
image
image

আরও পড়ুন

Los Angeles

০১:০৫, আগস্ট ১৯, ২০১৯

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চন্দনাইশ ছাত্র ঐক্য চট্টগ্রাম'র সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত