image

আজ, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ইং

রোহিঙ্গা বসতি, আড়াই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি বনাঞ্চলের

কায়সার হামিদ মানিক,উখিয়া সংবাদদাতা    |    ১৯:৩৭, সেপ্টেম্বর ২, ২০২০

image

ফাইল ছবি

তিন বছর আগে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার পূর্বপ্রান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্ত রেখা পেরিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরনার্থীদের অনুপ্রবেশ শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। বন্যার স্রোতের মত অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছিল উখিয়া-টেকনাফের বনভূমিতে। এরপর দেশী-বিদেশী বিভিন্ন এনজিও সংস্থার প্রত্যক্ষ ইন্ধনে বন উজাড় করে গড়ে উঠেছিল রোহিঙ্গা বসতি।

এরপর থেকে পেরিয়ে গেছে তিনটি বছর। এসব রোহিঙ্গা বসতির কারণে ছয় হাজার একর বন ধ্বংস হয়েছে। তাদের জ্বালানি কাঠ হিসেবে ছাই হয়ে গিয়েছে আরও এক হাজার ৮৩৭ একর বন। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৫৫৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ধ্বংস হয়েছে প্রায় আট হাজার একর বনভূমি বা দুই হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এক হাজার ৮২৯ কোটি টাকার জীববৈচিত্র্য এবং ৫৯১ কোটি টাকার বনজদ্রব্যের ক্ষয়ক্ষতিও এই ধ্বংসলীলার অন্তর্ভুক্ত।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে গত অক্টোবর পর্যন্ত সময়কালে ক্ষয়ক্ষতিসংক্রান্ত এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল। তখনকার পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংসদীয় কমিটি উখিয়ার কুতুপালংয়ে বনের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছিল।

কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের বসতি এবং তাদের কারণে বনের যেসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার একটি চিত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে; যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।

রোহিঙ্গারা বনভূমিতে বসতি স্থাপন করায় তা যেমন বেদখল হয়ে যাচ্ছে, তেমনি জীবিকার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বনভূমির গাছই কেটে পাচার করছে তারা। শরণার্থী ক্যাম্প ও বনাঞ্চলে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি বন ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে। তারা জ্বালানির চাহিদা মেটাতে বনভূমি ধ্বংস করা ছাড়াও পাহাড় কাটা ও মাটি বিক্রি, অবৈধভাবে কাঠ ও বনজদ্রব্য পাচারে যুক্ত হয়েছে। সঠিক নাম-ঠিকানার অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোহিঙ্গা অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগের ছয় হাজার ১৬৪ একর বনভূমিতে বসতি স্থাপনের ফলে দুই হাজার ২৭ একর সৃজিত (সামাজিক বনায়ন) বন এবং চার হাজার ১৩৬ একর প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে যায়। সৃজিত বনের ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুইশ’ কোটি টাকা। প্রাকৃতিক বনের ক্ষতি আড়াইশ’ কোটি টাকারও বেশি। মোট বনজদ্রব্যের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা।

বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা বসতির কারণে বালুখালী-ঘুমধুম করিডোর দিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে হাতি চলাচলের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে। তাই হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘাত বাড়ছে। ইতিমধ্যে হাতির আক্রমণে ১২ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। ভবিষ্যতে এই সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কক্সবাজার জেলার বনভূমি এশিয়ান হাতির বাসস্থান, বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) ২০১৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী- এই এলাকায় ৬৩টি এশিয়ান হাতি বাস করে। উখিয়া-টেকনাফ এবং রামু (আংশিক) উপজেলার বনভূমিতে বাস করলেও পানেরছড়া-রাজারকূল এবং বালুখালী-ঘুমধুম করিডোর দিয়ে হাতিগুলো বান্দরবান ও মিয়ানমারে চলাচল করত। রামু ক্যান্টনমেন্ট স্থাপনের ফলে আগেই পানেরছড়া-রাজারকূল করিডোর বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা আসায় বাকি সাড়ে চার কিলোমিটার করিডোরও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হাতির সঙ্গে মানুষের সংঘর্ষ বাড়ছে। উখিয়া-টেকনাফের বনভূমিতে পরিকল্পনাহীন বসতি এবং জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের ফলে হাতির আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে গেছে এবং হাতির খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে মানুষ ও হাতির সংঘর্ষ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্যাপক ক্ষতি জীববৈচিত্র্যের : রোহিঙ্গা বসতির ফলে জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়, যা নিরূপণে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তাছাড়া এই ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করতে হয় বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে বাস্তবায়নাধীন সিঙ্গেল পয়েন্ট মোরিং (এসপিএম) প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত সংরক্ষিত বনভূমিতে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষজ্ঞ কমিটি জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব-নিকাশ করে। একই জেলায় প্রায় একই ভূ-প্রকৃতির অংশ হওয়ায় এসপিএম প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটির নির্ধারিত ক্ষয়ক্ষতির অনুরূপ হারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে ধ্বংস হওয়া ছয় হাজার একর রক্ষিত ও সংরক্ষিত বনভূমিতে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। বনজদ্রব্যের ৪৫০ কোটি ও জীববৈচিত্র্যের এক হাজার ৪০৯ কোটি মিলে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা।

অবকাঠামো নির্মাণ অব্যাহত : প্রতিবেদনে বলা হয়, শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কক্সবাজার দপ্তরের গত অক্টোবর পর্যন্ত হিসেবে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা কাজের হালনাগাদ প্রতিবেদনে শুধু বসতির কারণেই ক্ষতি দেখানো হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার একর বনের। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম, ভাসানচরে স্থানান্তর এবং ক্যাম্প এলাকার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির পর্যালোচনা করা হয়। এ সময় বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাই কক্সবাজারে আর কোনো জমি বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। কক্সবাজারে বরাদ্দ দেওয়া আট হাজার একর বনভূমির বাইরে রোহিঙ্গাদের আর কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। এসব তত্ত্বাবধান করবেন জেলা প্রশাসক।

তবে বিভিন্ন সংস্থা ক্যাম্প এলাকায় চলাচলের জন্য রাস্তা, ল্যাট্রিন, নলকূপ, গুদামঘর/ওয়্যারহাউস ইত্যাদি তৈরি করছে। বন বিভাগের গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত/রক্ষিত বনভূমিতে এসব স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে। এ পর্যন্ত ৩৪টি ক্যাম্প ও ২৮টি সিআইসি অফিস স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যাম্পে দুই লাখ ১২ হাজার ৬০৭টি ঘর (অস্থায়ী শেল্টার), ৯ হাজার ৪৩৭টি নলকূপ, ৫৮ হাজার ৩০টি ল্যাট্রিন, ১৬ হাজার ৯৫৭টি গোসলখানা, ২০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন, ৩৪ দশমিক ৬০ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক, ত্রাণ সংরক্ষণের জন্য ২০টি অস্থায়ী গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। স্থাপনার পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। স্থাপনা নির্মাণ করতে গিয়ে ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন এনজিও, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, এলজিইডি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সংস্থা ব্যাপক হারে পাহাড় কাটছে। ক্যাম্প এলাকায় বনভূমির পাহাড় কেটে পুলিশ ক্যাম্প এবং বিভিন্ন সংস্থার অফিসের জন্যও অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।

জ্বালানি সংগ্রহে বন ধ্বংস এক হাজার ৮০০ একর : রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন ধরনের ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হলেও রান্নার জন্য কোনো জ্বালানির ব্যবস্থা করা হয়নি। তারা ক্যাম্পের বাইরে এক হাজার ৮৩৭ একর বনভূমিতে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে গাছ কাটছে। এমনকি গাছের শিকড়ও উপড়ে ফেলছে। জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কারণে বনজদ্রব্য ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫৫ কোটি টাকা। বিভিন্ন সংস্থা এক লাখ ৭০ হাজার ৪৭৮ পরিবারকে (স্বাগতিক পরিবারসহ) বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজি সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা পরিবার এক লাখ ৬৪ হাজার ৫১৩টি এবং স্থানীয় স্বাগতিক পরিবার পাঁচ হাজার ৯৬৫টি।

তবে এখানে কৌতুহলোদ্দীপক ব্যাপার হল, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কোনো কোনো স্থানে হাতির ছবি টানানো রয়েছে এবং লেখা আছে হাতির চলাচলের পথ। অথচ সেখানে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি করে থাকতে দেওয়া হয়েছে। তারা সেখানে অবস্থান করছে।

দেশী বিদেশী এনজিও সংস্হার প্রত্যক্ষ ইন্ধনে রোহিঙ্গা বসতি স্হাপনের ফলে এভাবেই ধ্বংস হয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশ। আর এর প্রভাবে কক্সবাজারে জলবায়ুগত পরিবর্তনের আভাষ ক্রমশ প্রকট আকার ধারন করছে বলে মত দিয়েছেন পরিবেশবিদগন।



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

২৩:৩৫, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

আনোয়ারায় অবৈধ উপায়ে বালু উত্তোলনের ড্রেজার জব্দ, জরিমানা, আটক -১


Los Angeles

১৬:৪৩, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০

৪০ বছর ধরে একজন মুক্তিযোদ্ধার চাওয়া একটি কালভার্ট !!!


Los Angeles

১৯:২৩, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০

করোনায় বিপর্যস্ত পান চাষীদের ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা


Los Angeles

১৮:৪২, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০

রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে স্ল্যাব তৈরি করছে ‘এসএমইপি’


Los Angeles

১৮:৪৬, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০

বাঁশখালীর পুঁইছড়ি: কবরস্থানে স্বজনের মরদেহ পারাপার হয় গলা পানিতে


Los Angeles

১৮:০২, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০

রাঙ্গুনিয়ায় করোনাকালে বিনামূল্যে পাঠাগার


Los Angeles

১৯:৫৬, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০

কর্ণফুলীতে ব্যাটারী রিক্সা : প্রশাসন নিরব, শিশু কিশোর’রা সরব


Los Angeles

১৯:০৯, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০

কোভিড-১৯ এর প্রভাব : কক্সবাজারে বাড়ছে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা 


Los Angeles

০২:১৭, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২০

ভাসানচর পরিদর্শনে যাওয়া রোহিঙ্গা নেতারা নিরাপত্তা হুমকিতে


image
image
image

আরও পড়ুন

Los Angeles

২২:৫০, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় রাউজান প্রবাসীর মৃত্যু, এলাকায় শোকের ছায়া


Los Angeles

২২:৪৬, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

চন্দনাইশের দোহাজারীতে বিট পুলিশিং কার্যক্রম ও উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত


Los Angeles

২২:২৯, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

রাউজানে সাপের কামড়ে গৃহবধুর মৃত্যু