image

আজ, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯ ইং

রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে চায়, ভাসানচরে নয়

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা    |    ১৫:৪৩, অক্টোবর ১৩, ২০১৮

image

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, বিজিপি ও উগ্রপন্থী রাখাইনদের নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ৩০টি ক্যাম্পে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করলেও সেখানে যেতে রাজি নয় রোহিঙ্গারা। তবে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব নিয়ে মিয়ানমারে ফিরতে চায়।

বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে এ দেশে আশ্রয় দিয়েছে। স্থানীয় জনগণও তাদেরকে সহযোগিতা করেছেন। মিয়ানমার যতদিন তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে না নেয়, ততদিন উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশাপাশি ভাসানচরে তাদের জন্য অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ কথা রোহিঙ্গারা জানে। তবে রোহিঙ্গারা বেশিরভাগই যে নামটির সঙ্গে পরিচিত সেটি হচ্ছে ঠেঙ্গার চর। তবুও তারা সেখানে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ঘরবাড়ি, সাইক্লোন শেল্টারসহ অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং গত ৪ অক্টোবরে সরকার এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়েছে। অথচ উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা কোনোভাবেই সেখান থেকে সরতে চান না।

রোহিঙ্গা মাঝি সুলতান আহমদ বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, জনমানবহীন ভাসানচরের দ্বীপটি শরণার্থীদের অন্যান্য আশ্রয় শিবির থেকে অনেক দূরে। বন্যায় তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিপজ্জনক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সেখানে। এমন জনমানবহীন একটি দ্বীপে আমাদের নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এনজিও কর্মী বলেন, ঠেঙ্গারচর স্থানীয়ভাবে ভাসানচর নামেও পরিচিত। এ চরটি দৃশ্যমান হয় ১১ বছর আগে। বর্ষার মওসুমে তা মারাত্নকভাবে বন্যাকবলিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তাছাড়া নিকটবর্তী বসতি থেকে এই দ্বীপে সময় লাগে দুই ঘন্টা। তাই রোহিঙ্গাদের কাছে মানবিক ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেয়া খুব কঠিন হয়ে পড়বে। ২০১৬ সালে অক্টোবর ও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর হত্যা, ধর্ষণ অগ্নিসংযোগের কারণে তারা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। উখিয়া-টেকনাফের অধিকাংশ রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে আগ্রহী নন। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এই দূরবর্তী দ্বীপে ভবিষ্যত ত্রাণ এবং ওষুধ পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত।

ভাসানচরে যেতে চায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বালুখালী সি ব্লকের মাঝি শামশু আহমদ জানান, তারা এখানে ভালো আছেন। তাদের কোথাও যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। তাছাড়া সাগর দেখে তারা ভয় পান। মিয়ানমারের বলী বাজার এলাকার বাসিন্দা আবদুল গণি। বয়সের ভারে অনেকটা নুয়ে পড়া মানুষটি জানালেন, ভাসানচরে নেয়ার চেয়ে এখানেই মরে যাওয়া অনেক ভাল।

তিনি বলেন, বছরখানেক আগে বর্মি সেনাদের গুলিতে আহত হওয়ার পর বাংলাদেশে এসে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় তার ভাই মোহাম্মদ শফি। সেই স্মৃতি মনে করেই এ মাটি ছেড়ে কোথাও যেতে চান না।

মোঃ লালু নামের এক বয়স্ক রোহিঙ্গা জানান, কিছু মানুষ বলছে তারা ওই জায়া চেনেন না। তাছাড়া পানি উঠে ডুবে যাবে কি না, সে বিষয়ে তাদের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে।

রোহিঙ্গারা কী চাইছে জানতে চাইলে আজিম নামে আরেক রোহিঙ্গা জানান, এখানে থাকবে, না-হয় এখান থেকে নিজের দেশে চলে যাবে। এছাড়াও ক্যাম্পে তাদের আতœীয়-স্বজন থেকে আলাদা হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে যেতে অনাগ্রহী বলে জানিয়েছেন অনেকে।

আরেক রোহিঙ্গা মাঝি ইউছুপ বলেন, মিয়ানমার সেনারা আমার ভাই, স্ত্রী-সন্তানকে পুড়িয়ে মেরেছে। তাদের সমাধিস্থ করার ভাগ্য হয়নি আমার। আমার মতো হাজারো রোহিঙ্গা নির্যাতনের ক্ষত শরীর নিয়ে পালিয়ে এসেছে। গত বছরের ২৫ আগস্টে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি পার করে আমরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছি।

উখিয়ার কুতুপালং এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় ধরণের মানবিক এই বিপর্যয় বুঝতে পেরে সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছে। খাবার দিয়েছে। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবারও কমতি নেই। আন্তর্জাতিক দাতারাও দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের পাশে।

ক্যাম্প মাঝিদের নেতা মোঃ জাবের জানান, ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে প্রশাসনের লোকজন ক্যাম্পের মাঝিদের সঙ্গে একদফা আলাপ করেছিল। তাদের একটি তালিকা করারও কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেটি আর পরে হয়নি। জাবের আরও জানান, ওই জাগায়াটা কেমন প্রথমে সেটা জানতে হবে। সবাই যদি সিদ্ধান্ত দেয় যে, ওই জায়গাটাই ভালো। তাহলে কোনো সমস্যা নেই।

এদিকে, রোহিঙ্গাদের বাসস্থানের জন্য বনভূমিসহ প্রায় ছয় হাজার একর জমি বরাদ্ধ দিয়েছে বাংলাদেশ। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গাদের রেজিস্ট্রেট ক্যাম্প ছিল আগে থেকেই। ধীরে ধীরে এটি বিস্তৃত হয়েছে বালুখালী, হাকিমপাড়া, জামতলী, শফিউল্লার কাটা, গয়ালমারা, বাঘঘোনা, ময়নাঘোনা, তাজনিমারঘোনা, মধুরছড়া, থাইংখালী। টেকনাফের প্রকৃতি ঢাকা পড়েছে হোয়াইক্যং, লেদা, উনছিপ্রাং, নয়াপাড়া, মুসুনি, হ্নীলার অস্থায়ী শিবিরের কারণে। এসব এলাকার অসমতল ভূমি তাঁবুর শহরে রূপ নিয়েছে। এখানেই গাদাগাদি করে ঠাঁই নিয়েছে বাস্তুহারা মানুষ। সরকারি হিসেবে কক্সবাজারে মিয়ানমার থেকে আসা নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখেরও বেশি। এই রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা, আবাসনসহ সার্বিক ত্রাণ সরবরাহ করছে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেন, ‘তাদেরকে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার মূল কাজটি শুরু করার আগে আমাদের একটি পরিকল্পনা আছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও নির্দেশনা আছে তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য। তাই মাঝিদের একটি নির্বাচিত দলকে আমরা সেখানে নিয়ে যাব। তারা নিজেরা সেখানে সরেজমিনে দেখে আসবেন এবং সেখানের পরিস্থিতি সুযোগ সুবিধা দেখে তারা নিজেরাই যেতে আগ্রহী হবে বলে আমার বিশ্বাস।



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

০০:২৬, এপ্রিল ১৮, ২০১৯

আন্তর্জাতিক মুদ্রাপাচার চক্রে ৫০ বাংলাদেশি


Los Angeles

২২:৫৭, এপ্রিল ১৭, ২০১৯

শত শত রোহিঙ্গার হাতে বাংলাদেশি এনআইডি ও পাসপোর্ট


Los Angeles

১২:৫০, এপ্রিল ১৭, ২০১৯

চিনি ও খেজুরে দুশ্চিন্তা


Los Angeles

০০:৪৩, এপ্রিল ১১, ২০১৯

উখিয়ায় ইয়াবা পাচার থেমে নেইঃগডফাদাররা প্রকাশ্যে 


Los Angeles

০০:২১, এপ্রিল ৮, ২০১৯

সীমান্ত সুরক্ষা, মাদক, মানবপাচার এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানোই টার্গেট


Los Angeles

০০:১২, এপ্রিল ৮, ২০১৯

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের তুমব্রু খালে সেতুর নিচে লোহার নেট দিচ্ছে মিয়ানমার


Los Angeles

২৩:০২, এপ্রিল ৬, ২০১৯

দালালদের টার্গেট রোহিঙ্গা ক্যাম্প : উত্তাল সাগর পথে থেমে নেই মালয়েশিয়া পাচার


Los Angeles

২২:৫৩, এপ্রিল ৬, ২০১৯

অরক্ষিত বেড়িবাঁধ, ঝুঁকিতে ৩০ হাজার মানুষ


image
image
image

আরও পড়ুন

Los Angeles

২৩:১০, এপ্রিল ১৮, ২০১৯

তুমব্রু খালে এবার স্লুইচ গেইট নির্মাণ করছে মিয়ানমারঃবিজিবি ও বিজিপির পতাকা বৈঠক সম্পন্ন


Los Angeles

২৩:০৫, এপ্রিল ১৮, ২০১৯

সীতাকুণ্ডে  নিজ বাড়ির পুকুরে পড়ে এক শিশুর মৃত্যু