image

আজ, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮ ইং

প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য চট্টগ্রাম 

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ    |    ১০:০৫, অক্টোবর ১৯, ২০১৮

image

সাগর, পাহাড় ও নদীঘেরা চট্টগ্রাম অপার সম্ভাবনার আধার । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এই চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন গনমানুষের নেত্রী শেখ হাসিনা । ঘোষণায় বাণিজ্যিক রাজধানী হলেও চট্টগ্রামবাসীর জীবন মানে ছিলনা তার ছোঁয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলাবদ্ধতা, যোগাযোগ অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে একের পর এক মেগা প্রকল্প অনুমোদন ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রয়াস নেয়ায় চট্টগ্রামে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। উন্নত সমৃদ্ধ আধুনিক চট্টগ্রামে বসবাসের স্বপ্ন নিয়ে আশায় দিন গুনছেন চট্টগ্রামের বাসিন্দারা । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। চট্টগ্রামেও এই উন্নয়নের ছোঁয়া রয়েছে। সরকারের ১০ বছরে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ১ লাখ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।এর মধ্যে কর্ণফুলী টানেল, মহেশখালীর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বেড়িবাঁধ ও রিং রোড, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহের ফলে শিল্পোৎপাদনে গতির সঞ্চার হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করায় পন্য পরিবহনে দীর্ঘসুত্রিতার অবসান হয়েছে। সরকারের জনবান্ধব উন্নয়নের ফলে ইতোমধ্যে বদলে যেতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম।

পতেঙ্গায় বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র : বঙ্গোপসাগরের তীরে পাহাড়, নদী ঘেরা চট্টগ্রাম প্রকৃতির এক স্বর্গরাজ্য। চট্টগ্রাম পাহাড়, সমুদ্র আর নদী বেষ্টিত একটি সুন্দর শহর শুধু নয়, জেলাও বিভাগীয় শহর। ছোট-বড় পাহাড়, টিলা নিয়ে গড়ে উঠা এ শহর খুবই সুন্দর ও দৃষ্টি নন্দন। সমুদ্র,পাহাড় অসংখ্য ছোট-বড় নদীর এক অপূর্ব মিলন ক্ষেত্র। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পর্যটনের জন্য যেসব উপাদান আবশ্যক সবই আছে ; শুধু ছিল না সমন্বিত উদ্যোগ। প্রাচ্যের রানী খ্যাত এই চট্টগ্রামকে স্বরূপে ফিরিয়ে আনতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কর্মবীর খ্যাত আবদুচ ছালাম। চট্টগ্রাম নগরীর সাগর তীরবর্তী পর্যটন এলাকা পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বর্ধনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ার স্বপ্নে বিভোর এ কর্মবীর। চলমান আউটার রিং রোড প্রকল্পের আওতায় তার এ উদ্যোগ । দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করতে পরিকল্পিতভাবে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছেন তিনি । কর্ণফুলীর মোহনা থেকে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে ৫ কিলোমিটার এলাকায় গড়ে তোলা হবে আধুনিক ও বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র। প্রকল্পের আওতায় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে নির্মান করা হবে ওয়াকওয়ে, বসার জন্য সুন্দর ও সুপরিসর আসন, শিশুদের জন্য কিডস কর্নার, ফুড কোড, গ্রীন জোন, খেলার মাঠ, কেবল কার,উন্নত মানের রাইড, সাগরে নিরাপদে ওঠানামার জন্য জেটি, সাঁতারের পর গোসলের ব্যবস্থা, কার পার্কিং এবং আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের ব্যবস্থা থাকবে পাঁচতারকা হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কাফেটেরিয়া, বিনোদন কেন্দ্র সৈকতের পাশেই সিঙ্গাপুরের আদলে গড়ে তোলা হবে বিলাসবহুল স্মার্ট সিটি। পর্যটকদের জন্য উন্নতমানের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি মাথায় রেখে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার এ প্রয়াস। নগরবাসীকে নির্মল বিনোদনের ব্যবস্থা করে দেয়ার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে বাস্তবসম্মত বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে চউক। ২০১৯ সালের মধ্যে কক্সবাজারমুখী গাড়ি সহজেই পতেঙ্গার নেভাল একাডেমির পাশ দিয়ে নির্মানাধীন টানেল হয়ে কর্ণফুলীর ওপারে চলে যেতে পারবে। দেশের প্রথম এবং একমাত্র এ টানেলটি চালু হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। সরকারের গৃহীত ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়ন আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। কর্ণফুলী নদীর ওপারে গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক জোন ও সমৃদ্ধ আরও এক মহানগরী। এর ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সাথে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকার দূরত্ব আরো কমে আসবে। মূল শহরের সঙ্গে নদীর অন্য প্রান্তের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার পাশাপাশি বিকশিত হবে পর্যটন শিল্প । চাপ কমবে নদীর উপর থাকা অন্য দুই সেতুর। একই সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে প্রস্তাবিত সোনাদিয়া সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে।

যানজটমুক্ত স্বপ্নের স্মার্ট চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরীর যানজট সমস্যার সমাধান , চট্টগ্রাম বন্দর, ইপিজেড ও বিমানবন্দর মুখী বিকল্প পন্য পরিবহন সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, শহর রক্ষা, শিল্পায়ন, আবাসন ও পর্যটনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হচ্ছে আউটার রিং-রোড। ট্রাঙ্ক রোড নেট-ওয়ার্কের আওতায় দুটি রিং রোড এবং মহানগরীর চারপাশে বৃত্তাকার সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ছয়টি রেডিয়েল রোড নির্মাণের অংশ হিসেবে আউটার রিং রোড প্রকল্পের কাজ শুরু হয় গত কয়েক বছর আগে। ইতোমধ্যে পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত আউটার রিং রোডের কাজ প্রায় শেষের পথে । ফৌজদারহাট থেকে বায়েজিদ বোস্তামি পর্যন্ত চিটাগাং বাইপাসের নির্মাণকাজও শেষ পর্যায়ে। বায়েজিদ থেকে অক্সিজেন এবং অক্সিজেন থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ হয়ে কাপ্তাই রাস্তার মাথা পর্যন্ত সড়ক ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে। প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে চাক্তাই-কালুরঘাট আউটার রিং রোড প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যানজট নিরসনের পাশাপাশি কর্ণফুলীর তীরবর্তী সন্নিহিত পিছিয়ে পড়া এলাকার উন্নয়ন ,পর্যটন শিল্পের বিকাশ সহ বৃত্তাকার এই সড়কটি বিস্তীর্ণ এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। আউটার রিং রোড প্রকল্পের মাধ্যমে শহরের ভিতরে প্রবেশ না করেই দক্ষিণ বা উত্তর চট্টগ্রামের যানবাহন সমূহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করতে পারবে। এ প্রকল্পের আওতায় কালুরঘাট থেকে শাহ আমানত সেতু বা চাক্তাই খালের মুখ পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করা হবে। চাক্তাই খালের মুখ থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত রাস্তা রয়েছে। ফলে নগরীর চারদিকে একটি বৃত্তাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হবে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার গাড়িগুলো শহরে প্রবেশ না করে টানেল হয়ে পতেঙ্গা থেকে আউটার রিং রোড ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলে যাবে। একইভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে আসা রাঙামাটির কোনো গাড়ি ফৌজদারহাট থেকে বায়েজিদ হয়ে অক্সিজেন কিংবা কাপ্তাই রাস্তার মাথা হয়ে শাহ আমানত সেতুতে পৌঁছতে পারবে। এ ছাড়াও চট্টগ্রাম শহরের যানজট ও জনদুর্ভোগ কমাতে নগরীর প্রধান সড়কের ওয়াসা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। এক্সপ্রেসওয়েটি নগরীর প্রধান সড়কের আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারের সাথে যুক্ত হবে। ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলে চট্টগ্রাম শহর এলাকা এবং এর দক্ষিণ অংশের সাথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। এতে যানজট হ্রাস পাবে এবং বিমানবন্দরে যাতায়াতের পথ সুগম হবে। ২৪টি র‌্যাম্প সহ এক্সপ্রেসওয়েটির মোট দৈর্ঘ্য হবে ২৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার। নগরের বিভিন্ন মোড় ও এলাকায় র‌্যাম্প থাকায় এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নগরবাসীর অনেক উপকারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে । এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মিত হলে চট্টগ্রাম শহরের গণপরিবহন ও যানচলাচলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। চট্টগ্রাম মহানগরে বিভিন্নসেবা সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে  কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলে ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড জন সন্মুখে তুলে ধরা,জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সুফল জনগণের দ্বোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য মহানগরীর প্রতিটি পাড়া মহল্লায় চউক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম এর সভা-সমাবেশ উঠান বৈঠক ইতোমধ্যে সাধারন মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। এছাড়াও সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড প্রচারে তার অভিনব স্লোগান সম্বলিত বিল বোর্ড প্রিন্ট ও ইলেট্রনিক মিডিয়ার সাহায্যে উন্নয়ন প্রচার ও সচেতনতা তৈরি কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তার ১০ বছর মেয়াদকালে চট্টগ্রাম শহরের প্রায় প্রতিটি সরু রাস্তাকে চার লেনে উন্নীতকরণ ও চারটি ফ্লাইওভার নির্মাণসহ ৩০টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে । এর বাইরেও বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে ১৪ হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পসহ ১১টি মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে।চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড, পতেঙ্গায় পর্যটন কেন্দ্র ও লালখান বাজার থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে এবং কর্ণফুলি নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রকল্পের সমন্বয় সভা সম্প্রতি সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের সভাপত্বিতে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তিনটি প্রকল্পের সংযোগ স্থলে ভবিষ্যতে ট্রাফিক চাহিদার কথা বিবেচনা করে সুপ্রশস্ত অ্যাপ্রোচ রোড, ওভারপাস, আন্ডারপাস এবং পার্কিং এরিয়ার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রেখে প্রকল্প সমূহ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙক্ষা জলাবদ্ধতা ও যানজটমুক্ত চট্টগ্রাম, বিশ্বমানের পর্যটননগরী চট্টগ্রাম এবং বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠা লাভ করবে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও রাজনৈতিক নেতারা। চট্টগ্রাম শহরের অধিকাংশ বাসিন্দাদের মতে আবদুচ ছালাম জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন মডেল ! সততা, যোগ্যতা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দায়বদ্ধতার কারনে তিনি গণমানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন তার হাত ধরে চট্টগ্রামের মানুষ উন্নত সমৃদ্ধ ও আধুনিক চট্টগ্রামে বসবাসের স্বপ্ন লালন করেন ।

কর্ণফুলী ড্রেজিং ও বন্দরের সক্ষমতা : ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হওয়া কর্ণফুলী নদী, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলিত হয়েছে। এ নদীর মোহনায় বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর ‘চট্টগ্রাম বন্দর’। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রসার ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখছে চট্টগ্রাম বন্দর। প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বর্তমান সরকার চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রিক ৩০ বছরব্যাপী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যেখানে আছে সমুদ্র বন্দরের উন্নয়নও। দেশের লাইফ লাইন খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণ কর্ণফুলী নদী। বঙ্গোপসাগর থেকে জোয়ারের সময় এ নদী দিয়ে বন্দরের মূল জেটিতে জাহাজ আনা-নেওয়া হয়। ফলে বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত খননের পাশাপাশি প্রয়োজন পড়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলের নাব্যতা-ড্রাফট ঠিক রাখা। প্রধানমন্ত্রী পটিয়ার জনসভায় ‘সদরঘাট টু বাকলিয়া চর ড্রেজিং’ প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন। বছরের পর বছর ৬৫ লাখ মানুষের এ নগরের অপরিশোধিত বর্জ্য, পাহাড়ি বালু, পলিথিন-প্লাস্টিক সামগ্রীতে ভরা নদীর তলদেশে ড্রেজিং অনিবার্যহয়ে উঠেছে। কারণ বর্ষা মৌসুমে এ নদীর নাব্যতার ওপর নির্ভর করে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগের বিষয়টিও। নদীর গভীরতা কমে গেলে পানি ধারণক্ষমতা যেমন হারিয়ে ফেলে তেমনি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নামতেও পারে না। আবার জোয়ারের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উজানে রুই-কাতলা-মৃগেল-কালবাউশ মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহের জন্য বিখ্যাত হালদায় মা-মাছ, ডলফিনসহ বিভিন্ন জাতের জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। সর্বোপরি চট্টগ্রামকে আধুনিক বিনিয়োগ বান্ধব সমৃদ্ধ পর্যটন নগরীতে রূপান্তরের অংশ হিসেবে ১৬ অক্টোবর ২০১৮ মঙ্গলবার নগরের বাকলিয়ার ক্ষেত্রচর ও সৎসঙ্গ বিহার সংলগ্ন এলাকায় কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রমের সুচনা করা হয়। ইতোমধ্যে কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ের জন্য হল্যান্ড থেকে ১৩০ কোটি টাকার ড্রেজার ও সরঞ্জাম আনা হয়েছে। গত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং এর পরিমাণ বাৎসরিক ১২-১৪% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যে বন্দর ৭০০ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতো সেটি এখন ২৮ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। ২০১৪ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং হয় ১৭ লাখ, ২০১৫ সালে ২০ লাখ, ২০১৬ সালে ২৩ লাখ এবং ২০১৭ সালে তা ২৬ লাখে উন্নীত হয়েছে। চলতি ২০১৮ সালে ৩০ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।২০১৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক বন্দরগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে পরিচিতি পায়। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে দশ বছরে ২৮ ধাপ উন্নীত হয়ে ৭০তম অবস্থানে চট্টগ্রাম বন্দর। । ফলশ্রূতিতে গত কয়েক বছর যাবত চট্টগ্রাম বন্দর্রে গ্রোথ ডাবল ডিজিটে উন্নীত হয়েছে । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রবল আগ্রহে বন্দরের সর্বস্তরে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে বন্দরের অটোমেশন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হয়েছে। সংস্কার করা হয়েছে পুরোনো বন্দর আইনের। চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকার কর্ণফুলী কন্টেইনার টার্মিনাল, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল ও বে টার্মিনাল নির্মাণ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। স্বয়ংক্রিয় কন্টেইনার অপারেশন নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সিটিএমএস এবং বন্দরে নিরাপদে জাহাজ যাতায়াত ও বহির্নোঙ্গরে অবস্থানকালে জাহাজগুলোকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করার জন্য আধুনিক ভিটিএমআইএস চালু করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে এ বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বাড়তি চাপ কমানোর লক্ষে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে নির্মাণাধীন আরেকটি সমুদ্রবন্দর। ২০২৩ সালের মধ্যে এ সমুদ্রবন্দর নির্মাণ কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের অধীনে ২টি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। টার্মিনাল দুটিতে প্রায় ১৫ মিটার ড্রাফট সম্বলিত ৩৫০ মিটারের জাহাজ ভিড়তে পারবে। যেসব মাদার ভ্যাসেল চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে আসতে পারে না সেসব বড় আকারের জাহাজ এ বন্দরে ভিড়তে পারবে। দিনে দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংযুক্ত হওয়া নতুন গ্যান্ট্রি ক্রেন দিয়ে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্দরের সক্ষমতা না বাড়লে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হতো। এদিকে মোংলা বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং এর পরিমাণ বাড়াতে জুলফিকার চ্যানেলের আউটার বার ড্রেজিংসহ দুটি অতিরিক্ত জেটির নির্মাণ কাজ চলছে। এই বন্দরকে আরও গতিশীল করতে সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।পাশাপাশি ২০১৯ সালের মধ্যে পায়রা বন্দর পুরোপুরি চালু করতে নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এ বন্দর চালু হলে দেশের অভ্যন্তরীণ আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া প্রতিবেশি ভারত, নেপাল ও ভুটান এ বন্দর ব্যবহারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে। বাংলাদেশ অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বন্দরনগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় নির্মিত হয়েছে সুরম্য বিশ্ব বাণিজ্যকেন্দ্র । চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের উদ্যোগেই এটি নির্মিত হয়েছে। যা বাংলাদেশে প্রথম ডব্লিউটিসি। ৭৫ কাঠা জায়গার উপর ২শ’কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে এটি। তিনটি বেসমেন্টসহ ২৪ তলা ভবনটি চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ ভবন। চট্টগ্রামে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ভবনের ৫৩ হাজার ৯১৩ বর্গফুট আয়তনের বিশাল পরিসরে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের কনভেনশন সেন্টার, কনফারেন্স হল, হেলথ ক্লাব, দেশীয় পণ্যসামগ্রীর প্রদর্শনী হল, সুইমিং পুল, মূল অফিস, আইটি ও মিডিয়া সেন্টার, অফিস স্পেস, পাঁচ তারকামানের হোটেল, আন্তর্জাতিকমানের ব্যবসা-বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট পরিসেবা ইত্যাদি। এ ছাড়াও চট্টগ্রামের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য , আরব্য, পর্তুগীজ, তুর্কি, পারস্য, চীনা বণিকদের চট্টগ্রামে গমনাগমনের তথ্যাবলী রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রটির মিডিয়া সেন্টারে।

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী-দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সিংহভাগই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা, বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা, নগরীর ক্রমবর্ধমান যানজট নিরসন এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য নগরীর অবকাঠামো উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেস্টায় একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সর্বোপরি চট্টগ্রামের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ২০০৯ সালের এপ্রিলে আবদুচ ছালাম কে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেছিলেন। শেখ হাসিনার প্রবল আগ্রহে দীর্ঘ সময়ের বন্ধাত্ব কাঠিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম এর নেতৃত্বে দশ বছরে চট্টগ্রামের উন্নয়নের পালে হাওয়া লেগেছে। উন্নয়নে বদলে যেতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের উন্নয়নে গৃহীত প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, যানজট নিরসনের পাশাপাশি জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে নগরবাসী। কর্ণফুলী টানেল এবং আউটার রিং রোডকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম শহরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে ,বদলে যাবে হালিশহর, পতেঙ্গা, কাট্টলী এবং কালুরঘাট থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার আর্থ সামাজিক চিত্র। উন্মোচিত হবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য “চট্টগ্রাম” রুপান্তরিত হবে উন্নত সমৃদ্ধ আধুনিক এক নগরীতে

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

১০:০৫, অক্টোবর ১৯, ২০১৮

প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য চট্টগ্রাম 


Los Angeles

২১:০০, অক্টোবর ৫, ২০১৮

শিক্ষক দিবস ও আমার প্রিয় শিক্ষক


Los Angeles

১২:০১, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৮

সিনহার বাড়ি এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা


Los Angeles

২৩:০৮, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮

অপার সম্ভাবনার পদ্মা সেতু


Los Angeles

২৩:২৬, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮

আবারও ভোট বর্জনের পথেই হাঁটছে বিএনপি


Los Angeles

১৩:১৪, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮

নির্বাচনমুখী রাজনীতি : আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ


Los Angeles

১৯:১৫, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮

স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল বিপ্লব


Los Angeles

১৫:৩৬, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮

সাদা শুভ্র স্কুল ড্রেস


image
image