image

আজ, বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ ২০২১ ইং

মানবিক ও বাসযোগ্য হোক পটিয়া পৌরসভা

ওমর ফারুক    |    ০০:৫৩, ফেব্রুয়ারী ১৪, ২০২১

image

পটিয়া চট্টগ্রামের একটি সমৃদ্ধ জনপদ। শুধু পৌরসভা হওয়ার কারণে নয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সব বিবেচনায় এই পৌর শহর তৈরি হয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের একক কেন্দ্র হিসেবে। পটিয়া পৌরসভা হয়েছে ১৯৯০ সালে। পৌরসভার আয়তন মাত্র ১০ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার। সরকারি হিসেবে জনগণ ৬৮ হাজার। তবে, পৌর শহরে এত মানুষকে ধারণ করার জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন, পরিবহন ব্যবস্থা, সামাজিক ও নাগরিক পরিষেবা ইত্যাদি চাহিদা মাফিক তৈরি হয়নি। এখানে যে উন্নয়ন হওয়ার দরকার ছিল তা হয়নি। এই শহরের জন্য মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় দুর্বল পৌর নগর পরিচালনের কারণে শহরের উন্নতি হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে।

বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নে পৌর শহরের ভূমিকা ক্রমশই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সরকারের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি গ্রামে নগরসুবিধা সম্প্রসারণের কাজ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চলছে। পটিয়া পৌরসভার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে অপরিকল্পিত পৌরায়ণ  সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসন, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ সুবিধা ইত্যাদি পরিষেবা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকল্পিত পৌরায়ণ না হলে এ চ্যালেঞ্জ পটিয়া পৌরসভার দায়িত্বশীলদের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভবপর নয়। পৌর বাসিন্দাদের জন্য সুশাসন, বিভিন্ন সেবামূলক কাজ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং জননিরাপত্তা ও জনগণের স্থায়িত্ব বা স্থিতিশীলতার উদ্দেশ্যে মূলত এ পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ উদ্দেশ্যগুলো অনেকাংশে পূরণ করার জন্য যে শর্তাবলী পালনীয় তা বাস্তবে পটিয়া পৌর এলাকায় অদৃশ্যমান। পৌর শহরকে গড়ে তুলতে হবে সবার জন্য মানবিক ও বাসযোগ্যরূপে। ভূমি ব্যবহার, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সব বিষয় নিয়ে মানবিক পৌর শহর তৈরির সমন্বিত ‘ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ করতে হবে।  পৌরসভা গঠনের প্রায় ৩১ বছর পরও পটিয়ায় অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। নাগরিকদের শতভাগ সেবা দিতে গেলে পৌরসভার আয়তন বর্ধিত করতে হবে। পৌরসভার আয়তন ২৫ বর্গকিলোমিটার করার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে অনেক দিন ধরে। সবাই বলছে। কিন্তু কাজ হয়নি। একটি ভালো ও সার্থক পৌর শহর হতে গেলে যেসব নিয়ামক একটি শহরে থাকে, তার অনেক কিছুই অনুপস্থিত অথবা অপ্রতুল আছে আমাদের এ পৌর শহরে। তবে যে বিষয়গুলোর অভাব প্রকটভাবে সবার ওপর আসবে, তার মধ্যে আছে পরিবহন ব্যবস্থার দুরবস্থা, পানিনিষ্কাশনের দুর্দশা, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের মানসম্মত আবাসনের অভাব, সবুজ ও উন্মুক্ত স্থানের অভাব, মানসম্পন্ন অবকাঠামোর অভাব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ অপ্রতুল নাগরিক পরিষেবা ইত্যাদি।

সময়মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না গেলে আমাদের সমস্যার আবর্তেই ঘুরপাক খেতে হবে। যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সামাজিক সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবেশ, আর্থিক সামর্থ্য ইত্যাদি বিবেচনায় এনে সঠিকভাবে শহরের অন্তর্ভুক্তিমূলক জনবান্ধব পরিকল্পনা তৈরি হবে। তবে সবকিছুর ওপরে আছে একটি ভালো নগর পরিচালন পদ্ধতি। সুশাসন নিশ্চিত না করে ভালো পৌর শহর গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি জনগণের ভোটে পটিয়ার জন্য যিনি মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তাঁকেই ভাবতে হবে।

এ শহরের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলেও পৌর এলাকার আশপাশের জলাভূমি, নিম্নভূমি, খাল বেদখলের শিকার হয় এবং বর্ষা মৌসুমে পানি ধারণের স্থান কমে যায়। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে অপরিকল্পিতভাবে কয়েক মিটার দীর্ঘ ড্রেন রয়েছে। তবে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পৌরসভায় পানির কোনো সরবরাহ নেই। গভীর নলকূপগুলোর অধিকাংশ বিকল।  সড়কবাতি থাকলেও প্রায় বাতির নীচে থাকে অন্ধকার। পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। শহরের রাস্তাঘাট পরিষ্কার থাকেনা প্রায় সময়। অবশ্যই পটিয়া পৌরসভায় ঝাড়ুদারও অপ্রতুল। পটিয়া পৌরবাসীর মুখে মুখে একটা কথা চাউর, তাহলো-‘রাতে মশার কামড়ে ঘুমাতে পারি না। পৌরসভার নাগরিক হিসেবে তেমন কোনো সুবিধা না পেলেও করের বোঝা টানতে হচ্ছে এমন অভিযোগ অনেকের। পৌরসভার অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলোর খুবই বেহাল দশা। যেকোনো অসুস্থ মানুষের চলাফেরা করা ভয়াবহ কষ্টের। সরু রাস্তার কারণে কোন কোন এলাকায় আগুন লাগলেও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে কষ্ট হয়।  পৌরবাসীকে প্রতিনিয়ত শ্রীমাই খালের ভাঙন-আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। যেকোনো পৌরসভা গড়ে তোলার আগে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও নকশা করা দরকার, যা এখানে অনুপস্থিত। অথচ পরিকল্পনামতো গড়ে উঠলে শ্রীমাই ও চাঁনখালী খাল বেষ্টিত এই শহরটি আধুনিক পর্যটন পৌর নগর হয়ে উঠতে পারত। পটিয়া পৌর এলাকায় মাত্র ৩১ শয্যার একটি হাসপাতাল রয়েছে। ৫০ শয্যা লেখা থাকলেও বরাদ্দ পাওয়া যায় মাত্র ৩১ শয্যার। হাসপাতালের অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। পটিয়া বিসিক শিল্প এলাকা এবং ইন্দ্রপুল লবন শিল্প নগরীকে যেভাবে সাজানো দরকার ছিল সেভাবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যায়নি। চিত্তবিনোদনের জন্য নেই কোন শিশু পার্ক। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কারণে পটিয়া পৌরসভা এলাকায় নিয়মিত যানজট হয়। এখানে মহাসড়কটি একেবারে অপ্রশস্ত। চার লেন না হোক, অন্তত দুই লেন হলেও তা হবে পটিয়ার মানুষদের জন্য আশীর্বাদ। পটিয়া পৌর এলাকায় সরকারি একটি মাত্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অগ্রগামী পটিয়া পৌর এলাকায় সরকারি একটি বালক এবং আরো একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি রাখে। পৌর ওয়ার্ডগুলোতে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। এলাকার ভালো মানের পাঠাগার নেই। নাচ-গানের স্বতন্ত্র স্কুল নেই। নাঠ্যমঞ্চ নেই। সাংস্কৃতিকপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে না উঠলে পটিয়ায় মুন্সি আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, আহমদ শরীফ, প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমের মতো আলোকিত মানুষ সৃষ্টি হবে না। সরকারকে সাধুবাদ জানাতে হয় পটিয়ায় আধূনিক একটি পৌরভবন করে দেওয়ার জন্য। থানার হাটে আধূনিক কিসেন মার্কেটসহ বেশ কিছু হয়েছে বর্তমান সরকার আমলে। পটিয়ার সাংসদ শামসুল হক চৌধুরী ও পৌর মেয়র অধ্যাপক হারুনুর রশীদের অবদান এক্ষেত্রে কম নয়।

গতিময়, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পটিয়া পৌর শহর বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বশীল সব প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসা দরকার। ভবিষ্যতে যুগ যুগ ধরে যাঁরা এই শহরে বসবাস করবেন, তাঁদের মঙ্গলের জন্য নানা পরিকল্পণা নিতে হবে। সুস্থ পটিয়া পৌর এলাকা গড়তে শহরের রাস্তা, খোলা জায়গা ও ভবনের ছাদে বনায়ন, এলাকাভিত্তিক পার্ক ও খেলার মাঠ নির্মাণ, ভেজালমুক্ত কাঁচাবাজার, জলাশয়-জলপথের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, প্রয়োজন মাফিক গণশৌচাগার, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিধনে নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তরুণদের অনুপ্রেরণা দান, অপরাধ ও মাদকের বিস্তার রোধে জনসচেতনতা তৈরি ও সৃজনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে পটিয়া পৌর নির্বাচনে আগামী দিনে জয়ী হওয়া মেয়র ও কাউন্সিলরদের। পৌর শহরকে সচল করতে পথচারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিবান্ধব ফুটপাত, পদচারী-সেতু, সড়ক সংস্কার ও নিরাপদ রাস্তা পারাপার নিশ্চিত করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বর্ষাকালীন জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিকল্পনা করা জরুরী। পটিয়া পৌর এলাকাকে আধুনিক করতে বিভিন্ন সেবাকে ই-সেবায় রূপান্তর, দুর্নীতি দমনে বিশেষ কমিটি গঠন এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার সমস্যা সরাসরি গ্রহণ ও এর দ্রুত সমাধান,  প্রতিটি ওয়ার্ড এলাকায় এমিনিটি সেন্টারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ও সেবা কার্যক্রমে উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা করা, পরিবেশবান্ধব  রাস্তাঘাট ও এর আধুনিকায়ন, সৌন্দর্যবর্ধন, সব খাল ও নালার সংস্কারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশে পৌরসভাগুলো ক, খ ও গ তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত। আমরা সুভাগ্যবান পটিয়া পৌরসভাবাসী। আমাদের অবস্থান ‘ক’। তবে মনে কষ্টও কম নয়। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণজনিত সুযোগ-সুবিধা ও কিছুটা অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও, এখনও জনপ্রতিনিধি ও জনগণের মধ্যে কাক্সিক্ষত শহুরে সংস্কৃতি ও সঠিক দায়িত্ববোধ পুরোপুরি গড়ে উঠেনি। ফলে আমদের প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা যেন এক বিড়ম্বনা ও নামের প্রতি অসম্মান।

ভাবলে কষ্ট লাগে, পটিয়ার সব ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সামাজিক সেবা আসলে ভালো নয়। আমরা জানি, বিশ্বের অনেক দেশে যখন এ রকম পরিস্থিতি হয়েছে, তারা উদ্ভাবনী উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করেছে।  প্রায় পৌণে লক্ষাধিক মানুষের চাপ, যানজট, নানা ধরনের নাগরিক সুবিধার অভাব, বাসস্থানের সংকট এবং ব্যাপক দূষণ পটিয়ার নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই এলাকার রাস্তা ও ড্রেন রীতিমতো মৃত্যুফাঁদ হয়ে গেছে। আগামী দিনে পটিয়া পৌর এলাকার চেহারা কেমন হবে, সেই কথা ভেবে অনেকেই আঁতকে ওঠেন। আর এসব কারণে পটিয়া পৌর এলাকা যদি অচল এবং বসবাসের অযোগ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন আর বিকল্প কী?

পটিয়া পৌরবাসীর প্রত্যাশা একটি বাসযোগ্য পৌর নগরী যেটা হঠাৎ করেই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নির্বাচিত হলেও নতুন মেয়র বা কাউন্সিলর যে সময় পাবেন তাতে সুস্থ, সচল ও আধুনিক নগরী গড়া অসম্ভব। এই স্বল্প সময়ে বহুতল কিংবা ও ভূগর্ভস্থ পার্কিং কমপ্লেক্স নির্মাণও সম্ভব না। তবে মশা নিধন, বায়ুদূষণ রোধ, সন্ত্রাস নিমূল, প্রশস্ত রাস্তাঘাট নির্মাণ সম্ভব। এ ছাড়া সামনে যেহেতু বর্ষাকাল, তাই পানি নিষ্কাশন ও পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থার উন্নতি ঘটালেও পৌরবাসী খুশি হবে।

লেখক: ওমর ফারুক, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

১৭:১৩, মার্চ ২, ২০২১

২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সাংবাদিক সম্মেলন


Los Angeles

২০:০০, মার্চ ১, ২০২১

আসুন, পরিষদেই সমাধান খোঁজা হইবে : বঙ্গবন্ধু


Los Angeles

০১:১৮, ফেব্রুয়ারী ১৭, ২০২১

অনেক বিজয়ও পরাজয়ের গ্লানি বহন করে


Los Angeles

০০:৫৭, ফেব্রুয়ারী ১৭, ২০২১

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদা : প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ


Los Angeles

০০:৫৩, ফেব্রুয়ারী ১৪, ২০২১

মানবিক ও বাসযোগ্য হোক পটিয়া পৌরসভা


Los Angeles

০০:৪২, ফেব্রুয়ারী ১৪, ২০২১

ভালোবাসা  প্রতিক্ষণ; কেন ভ্যালেনটাইনস ডে উদযাপন !!!


Los Angeles

২৩:৫৪, ফেব্রুয়ারী ৮, ২০২১

ইচ্ছা যখন সেরা শক্তি


image
image