বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) মালিকানাধীন বন্ধ থাকা সীতাকুণ্ডের হাফিজ জুট মিলস, গুলআহম্মদ জুট মিলস ও আরআর জুট মিলসসহ ১২টি পাটকল বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে অপেক্ষমান রয়েছে।অনুমোদন দিলেই ইজারায় চালু হবে এসব মিলগুলো।
হাফিজ জুট মিলের প্রকল্প কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন জানান, সীতাকুণ্ডের হাফিজ, গুল আহম্মদ ও আরআর জুট মিলস ইজারা নেয়ার জন্য স্বাদমুছা জুট ও বে-ফুটওয়্যার কোম্পানী দরপত্র জমা দিয়েছে। তাদের মধ্যে স্বাদমুছা জুট কর্তৃপক্ষ দরপত্রের দরের দিক থেকে হাফিজ জুট ও আরআর জুট ইজারা পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন। অপরদিকে গুল আহম্মদ জুট মিলের ইজারা পাওয়ার ক্ষেত্রে বে ফুটওয়্যার কোম্পানী এগিয়ে রয়েছেন।
সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রায়া্ত্ত এসব জুট মিলস দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হবে খুব শীঘ্রই। সীতাকুণ্ডে বিজেএমসির চারটি মিল ও একটি যন্ত্রাংশ তৈরী কারখানা গাল্ফ্রা হাবিব বন্ধ করে সকল শ্রমিকদেরকে চাকুরীচ্যুত করে মন্ত্রনালয়। তবে এই পাঁচটি মিলের প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে কর্মস্হলে বহাল রেখে বেতন ভাতা দিয়ে আসছে গত এক বছেরের ও অধিক সময়কাল। মিলের উৎপাদন বন্ধের সুযোগে কর্মকর্তা কর্মচারীরা দীর্ঘ অবসরে মিলের ভিতর খুলে বসেছে অসংখ্য ডেইরী ফার্ম। কর্মকর্তা কর্মচারীদের সারাদিন গরু ছাগল নিয়েই ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।
সিবিএর নেতৃবৃন্দরা অভিযোগ করে বলেন, মিল চালু না হলে কর্মকর্তা কর্মারীদের লাভ। তারা বসে বসে বেতন পাচ্ছে। গরু ছাগল পালন করে বাড়তি আয় করছে, গরুর দুধ খেতে পারছে।
বিজেএমসির মতে বছরের পর বছর লোকসান দেখানো সীতাকুণ্ডের হাফিজ জুট, গুলআহম্মদ জুট, এমএম জুট, আরআর জুট ও গাল্ফ্রা হাবিব লিমিটেডসহ মোট ২৫টি পাটকল গত বছরের ১জুলাই বন্ধ করে দেয় সরকার। এরপর পাটকলগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিয়ে চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেটিও গত ১৩ মাসে সম্পন্ন হয়নি। ফলে চালু হয়নি একটি পাটকলও।
হাফিজ জুট মিল শ্রমিক লীগের সিবিএ সভাপতি মাহাবুবুল আলম জানান, প্রথম পর্যায়ে ১৭টি পাটকল ইজারা দেওয়ার জন্য গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বিজেএমসি। তার মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সীতাকুণ্ডের হাফিজ জুট মিলস, গুল আহমেদ জুট মিলস, এমএম জুট মিলস, আরআর জুট মিলস রয়েছে। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় ইউএমসি জুট মিলস, বাংলাদেশ জুট মিলস, রাজশাহী জুট মিলস, জাতীয় জুট মিলস এবং খুলনা অঞ্চলের প্লাটিনাম জুবেলি জুট মিলস, ক্রিসেন্ট জুট মিলস, ইস্টার্ন জুট মিলস, খালিশপুর জুট মিলস, দৌলতপুর জুট মিলস, স্টার জুট মিলস, যশোর জুট মিলস ও কার্পেটিং জুট মিলস রয়েছে বলে তিনি জানান।
আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবানের পর দেশি-বিদেশি ২৪টি প্রতিষ্ঠান সীতাকুণ্ডের তিনটিসহ ১৪টি পাটকল ইজারা নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রাথমিক প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করে ৪৮টির একটি তালিকা তৈরি করে বিজেএমসি। এসব প্রস্তাব যেসব প্রতিষ্ঠান দিয়েছে, তাদের চূড়ান্ত পরিকল্পনা পাঠাতে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল সংস্থাটি।
শেষ পর্যন্ত ১২টি পাটকল ইজারা নেওয়ার জন্য ২৯টি চূড়ান্ত পরিকল্পনা আসে। এবারে চট্টগ্রামের এমএম জুট ও নরসিংদীর ইউএমসি জুট মিলস নিতে কোনো প্রতিষ্ঠানই আগ্রহ দেখায়নি।
বিজেএমসির কর্মকর্তারা জানান, মূল্যায়ন কমিটি প্রস্তাবগুলো সাতটি পয়েন্টে র্যাঙ্কিং করেছে। তারপরই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
দেশে বেসরকারি পাটকল লাভের মুখ দেখলেও রাষ্ট্রয়াত্ব বিজেএমসির পাটকলগুলো বছরের পর বছর লোকসান গুনছিল। ২০১৫ থেকে ২০১৯সাল পর্যন্ত পাঁচ অর্থবছরে বিজেএমসির এই পাটকলগুলোর ২হাজার ৯শ ৩৩ কোটি টাকা লোকসান দেখানো হয়েছে। লোকসানের বোঝা বইতে অনিহা প্রকাশ করে সরকার সারাদেশে বিজেএমসির ২৪হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছায় অবসরে (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) পাঠানোর প্রক্রিয়ায় গত বছরের ১জুলাই পাটকলগুলো বন্ধ করে সরকার। কিন্তু এখনো সম্পূর্ন পাওনা পরিশোধ করেনি বিজেএমসি অভিযোগ করেন শ্রমিক নেতা মাহবুবুল আলম।
সূত্রে জানা যায়, বিজেএমসির অধীনে থাকা ২৬টি পাটকলের মধ্যে গত বছরের জুন পর্যন্ত চালু ছিল ২৫টি।
লিজের প্রক্রিয়া কতটুকু জানতে চাইলে বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রউফ বলেন, ‘আমরা বি,জে,এম, সি থেকে ১২টি পাটকল ইজারা দেওয়ার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় যেসব প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার অনুমোদন দেবে, সেটিই আমরা চূড়ান্ত করব। তারপর আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ২৪ মাসের ভাড়া অগ্রিম হিসেবে জমা দেওয়ার জন্য চিঠি দেব। সেই টাকা জমা হলেই ইজারা গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হবে এবং মিল ইজারাদারদের পরিকল্পনা মতে চালু হবে।
আরআর জুট মিলের প্রকল্প প্রধান জানান, মিলগুলো সরকার লীজ প্রদানের মাধ্যমে চালু করবে আমরা সেই অপেক্ষায় আছি। মিলের যন্ত্রপাতি যাতে নষ্ট না হয় সেই দিকেও লক্ষ রাখছি। লীজ নিলে আগের কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে চাকুরীতে বহাল রাখবেন কিনা বা পুরাতন শ্রমিকদেরকে নিয়োগ দিবেন কিনা তা কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারেনি।
Developed By Muktodhara Technology Limited