বলা হয়ে থাকে “শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড”। মেরুদন্ডহীন প্রাণী যেমন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনা, তেমনি শিক্ষা ভিত্তি মজবুত না হলেও তা কোন কাজে আসেনা। ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনে শিক্ষার যথাযথ অর্জন এবং প্রয়োগ করতে হলে এর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীক যত সীমাবদ্ধতা তা দূর করা না গেলে এর মূল্য লক্ষ্য কখনোই অর্জিত হবেনা। বর্তমানে আমাদের দেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে তা যুগোপযোগী কিংবা দীর্ঘ গবেষণায় পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হয়ে এ রূপ ধারণ করেছে। শিক্ষার পদ্ধতিগত ত্রæটি বিচ্যুতি আছে এবং থাকাটাও স্বাভাবিক কিন্তু আমাদের দেশে কাংখিত বিষয়ে জনবল কিংবা রিসোর্স তৈরী না হওয়ার পিছনে কিছু বাধা বা দূর্বলতা রয়েছে, যা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে ব্যাহত করছে।
শিক্ষা কোন পণ্য নয়, কিন্তু বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এটাকে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। তবে সেটা একদিনে তৈরী হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি আমাদের নৈতিক ও মানসিক চেতনার উন্নয়ন না ঘটা এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার যথাযথবোধ হৃদয়ঙ্গমে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই সর্বক্ষেত্রে আমাদের দেশপ্রেম’র ঘাতটি রয়ে গেছে। আর দেশপ্রেম’র এ ঘাটতির কারণেই অন্যান্য বিভাগের মতো শিক্ষাও আমাদের এখানে পণ্য কিংবা বাণিজ্যিকীকরণের রোষানলে পড়ে তার মানবিক এবং সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় গুণাবলী আত্মস্থ করা হয়ে ওঠেনি। ফলে কোচিং বাণিজ্য, গাইড বই নির্ভরতা, শিক্ষক অনুপস্থিতি, একগেঁয়ে ও সেকেলে রীতিতে পাঠদান, শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার না হওয়া সহ নানামুখী প্রতিবন্ধকতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রায় গিলে খাওয়ার উপক্রম।
একদা নকল প্রবণতার প্রচলন থাকলেও বর্তমানে প্রায় সেটি বিলীন কিন্তু তারচেয়েও মহামারী আকার ধারণ করে যে অনুষঙ্গটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কোমড় একেবারেই ভেঙ্গে দিচ্ছে সেটি হলো “প্রশ্নপত্র ফাঁস“। যেনতেন, উপায়ে সার্টিফিকেট অর্জনে মরিয়া শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা পরীক্ষার আগে প্রশ্ন কিনে উতরে যাবার যে হীন মানসিকতা পোষণ করে তা দূর করা না গেলে এ প্রক্রিয়া রোধ করাও কঠিন হবে। কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষার্থী পাবার লোভে বেশী বেশী শিক্ষার্থীকে অনৈতিক উপায়ে পাশ করানোর মিশন বাস্তবায়ন করতে গিয়েই এ জঘন্য অপকর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন।
শিক্ষার গুণগত মান অর্জন এবং জাতি হিসেবে নিজেদের অস্থিত্ব বিশ্ব দরবারে উঁচু করে তুলে ধরতে শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক সকল বাধা তাড়াতে হবে শক্ত হাতে। কোচিং বাণিজ্য রোধ, গাইড বই বন্ধ, শিক্ষকদের ফাঁকি দেয়া বন্ধ, প্রাইভেট টিউশন অতিমাত্রায় মনোনিবেশ বন্ধ করা গেলেই আমাদের পথ কিছুটা হলেও মসৃণ হবে। সেই সাথে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে আগের নেয়া পদক্ষেপ বাতিলের প্রথাও বন্ধ করতে হবে, ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে, শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে শ্রেণিকক্ষকে করতে হবে প্রাঞ্জল ও আধুনিক যা হবে আমাদের গোটা ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক।
শিক্ষা বিস্তারে চলমান কার্যক্রম যথাসময়ে বিনামূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তি, টিফিন প্রদান, পরিবহণ ব্যবস্থা, কম্পিউটার তথা আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান, বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ নানাবিধ গৃহীত কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তাদের অফিসে বসে মনিটরিং বাদ দিয়ে স্কুলমুখী তদারকি বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের আন্তরিকতা বাড়াতে তাদের সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্য পেশার ড্রাইভারের বেতন দিয়ে শিক্ষক রাখলে মেধাবীরা এ পেশায় না এসে অন্যদিকে যেতে আগ্রহী হবে। মেধাবী শিক্ষক পাওয়া না গেলে, মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরী হবেনা এসব বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ অন্তত এ সেক্টরে রোধ করতে হবে, নতুবা যত প্রকল্পই হাতে নেয়া হোক লক্ষ্য অর্জন ব্যাহতই হবে। প্রাইভেট ও বিদেশমুখী শিক্ষারোধ এখন সময়ের দাবী। শিক্ষা গ্রহণে অর্থ কখনো মাপকাঠি হতে পারেনা। দশ হাজার টাকায় যে শিক্ষা, ১০টাকায়ও তা হওয়া উচিত।
পরিশেষে, ধারকরা ও মুখস্থ বই পড়া অর্জন কোন শিক্ষার্থীকে মানুষ নয়, মেশিনই তৈরী করতে পারবে। আমাদের প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সুশিক্ষায় শিক্ষিত আগামী প্রজন্ম। যাদের যোগ্য নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হবে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

লেখক : শামসুল আলম, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।
Developed By Muktodhara Technology Limited