বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম শহর হতে দক্ষিণাংশে অবস্থিত একমূখী কালুরঘাট ব্রীজের অবস্থান। দ্বিখন্ডিত বৃহত্তম চট্টগ্রাম জেলাকে কর্ণফুলী নদী উত্তর দক্ষিণে ভাগ করেছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রবেশদ্বার এই একমূখী কালুঘাট ব্রীজটি। ৯০ বছর বয়সী মেয়াদোত্তীর্ণ একমূখী ব্রীজটি দিয়ে এখনো পর্যন্ত হাজার হাজার ভারী, হালকা নানা মোটরযানসহ ১ লাখেরও বেশি মানুষ চলাচল করে জীবনের ঝুঁকি ও ভোগান্তি মাথায় নিয়ে। যেকোন সময় বড় ধরনের র্দূঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা সেতু পারাপারকারী লোকজন ও মোটরযান পরিচালনাকারীদের। অতিদ্রæত একমূখী কালুরঘাট সেতুর স্থানে দ্বিমূখী সড়ক ও রেলসেতু নিমার্ণের দাবীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনসহ নানা শ্রেণীর মানুষ আন্দোলন করে যাচ্ছেন।

১৯৩০ সালে নির্মিত মেয়াদোত্তীর্ণ কালুরঘাট সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে চট্টগ্রাম চুয়েটের একদল গবেষক। তারপরও বিকল্প না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেতু পার হচ্ছে সবাইকে। সেতুর পূর্ব দিকে উঠার সময় দেখা যায়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সাইনবোর্ড। যাতে লিখা রয়েছে এই সেতুর উপর দিয়ে যানবাহন ছাড়া জনসাধারণের চলাচল নিষেধ। আরেকটি সাইনবোর্ডে দেখা যায়, এই সেতুর উপর দিয়ে ১০ টনের অধিক মালামাল পরিবহণ নিষেধ। আদেশ অমান্যকারীকে ফৌজদারী আইনে সোপর্দ করা হইবে। কর্তৃপক্ষ কেবল সাইনবোর্ড দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছেন।
বেহালদশা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা, কি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে সেতুটি। একমূখী সেতুটির উপর উঠলে দেখতে পাওয়া যায়, এক শতেরও বেশি বড় ছোট গর্ত। কিছু কিছু গর্তে ভারী যানবাহন আটকে গিয়ে মুক্ত হতে অনেকক্ষণ সময় লাগে। আর ব্রীজটি ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠে প্রতিনিয়তই। পশ্চিম থেকে কিছু সামনে গেলে সেতুর ক্ষতগুলো এতোই ভয়াবহ, দেখলে মনে হবে যেন পাহাড়ী ভাঙারাস্তা। তাছাড়া সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপারের ব্যাপক অনিয়মও চোখে পড়ে সবসময়। একপাশ দিয়ে যান বাহন পারাপারের জন্য ছাড়লে কয়েক ঘন্টা সময় ধরে ছাড়তে থাকে আর অন্য পাশ দিয়ে রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। গেইটের সিগন্যালের দায়িত্বে নিয়োজিত লোকটি শুধু রাস্তা বন্ধের বাঁশখানা নামিয়ে আর তুলে দিয়েই দায়িত্ব পালন শেষ করেন।
প্রতিদিন শহরে যাতায়াতকারী কর্মজীবি এক ব্যক্তি শামসুল আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাই আমি ছাড়া প্রতিদিন আমার মত হাজার হাজার লোকজন এই ব্রীজ দিয়ে কর্মস্থলে যায়। আমিতো কাজ করি বাস সিগন্যাল নামক স্থানে একটা জুতা তৈরির কারখানায়। আমাকে সকাল আট টায় হাজির হতে হয়। এই ১৫ মিনিটের আসা যাওয়ার রাস্তা এখন সময় লাগে দেড় থেকে ২ ঘন্টা। ছুটির পর বাড়ীতে যেতে যেতে রাত ৯টা বা ১০ টা বাজে।
শামসুল আলমের সাথে কথা বলতে বলতে দেখতে পাওয়া গেল রোগী বহন করা একটা এম্ভুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। এ্যাম্ভুলেন্সে সড়ক র্দূঘটনায় মারাত্মক আহত এক রোগী। রক্তাক্ত শরীর পরিবারের সদস্যরা মুছে দিচ্ছে। আর পশ্চিম পাড় দিয়ে যানবাহন চলছে। কথা হলো আহত রোগীর ভাই জানে আলমের সাথে। সে বললো, ভাই দেখেন এখানে জরুরী রোগী বললেও কাজ হয় না। তাদের যখন ইচ্ছে হয় তখন গাড়ি বন্ধ করে আর ছাড়ে। রোগী মারা গেলেও তাদের কোন প্রকার দায়িত্ব নেই। তিনি আরো বলেন, যদি কোন ভুমিকম্প বা প্রাকৃতিক র্দূযোগ হয়ে এই ব্রীজটা ভেঙ্গে যেত তাহলে হয়তো আরেকটা ব্রীজ তৈরী করার পরিকল্পনা সরকার করতো।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের শাসন আমলে ব্রিটিশ শাসকরা বার্মা ফ্রন্টের সৈন্য আনা নেওয়ার জন্য কর্ণফুলী নদীর উপর একটি ব্রীজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটিশদের ব্রীজ নির্মাণের প্রয়োজন হলে ১৯১৪ সালে কর্ণফুলী নদীর উপর এ ব্রীজ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ব্রæনিক এন্ড কোম্পানী সেতু বিল্ডার্স হাওড়া নামক সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে এই সেতু নির্মাণের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৩০ সালে ব্রæনিক এন্ড কোম্পানী সেতু বিল্ডার্স হাওড়া নামক প্রতিষ্ঠানটি কালুঘাট ব্রীজটি নির্মাণ কাজ শেষ করেন। মূলত রেল চলাচলের জন্য ৭শত গজ লম্বা ব্রীজটি ১৯৩০ সালে ৪ জুন উদ্বোধন করা হয়। পরে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মাফ্রন্টের যাতায়াতের সুবিধার্থে পাটাতন যুক্ত করা হয়। পরে দেশ বিভাগের পর পাটাতন তুলে দেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালে সব ধরনে যান চলাচলের যোগ্য করে তুলেন। ব্রীজটিতে রয়েছে ২টি এব্যাউজটমেট, ৬টি ইটের পিলার,১২টি স্টীল পিলার এবং ১৯টি স্প্যান।
Developed By Muktodhara Technology Limited