image

স্বাস্থ্যখাত উপরে ফিটফাট, ভিতরে সদরঘাট

image

যুগ যুগ ধরে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতে অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত জনশক্তির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা একটা বড় সমস্যা। নব্বই দশকের পর হতে ধীরে ধীরে আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্মগুলো স্বল্প শয্যা হতে অবস্থানভেদে কোথাও কোথাও ১৫০-২০০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত হয়েছে৷ যাকে আমরা উন্নতি হিসেবেই দেখেছি, কিন্তু অবকাঠামো হলেই তা যে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন নয়, তা আমরা এখন হয়তো কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারছি!

কেননা, দেখা গেছে অবকাঠামো বাড়ানো হলেও জনশক্তি প্রায় জায়গাতেই আগের শয্যা অনূসারেই রয়ে গেছে! আমরা প্রায়শই দেখতে পাই, দক্ষ জনশক্তির অভাবে হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন মেশিন অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে, এম্বুলেন্স আছে কিন্তু চালক নেই এমন আরও নানাবিধ সমস্যা৷ রোগীরা সেইসব যন্ত্রের সেবা নিতে না পেরে বেশি দামে বাহিরে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছে! অর্থাৎ অবকাঠামো বাড়ানো হলেও অনেক ক্ষেত্রেই জনশক্তি বাড়ানো হয়নি। এতে আমরা দেখাতে পারছি হাসপাতাল ভবন হয়েছে, কিন্তু আদতে সেখানে যথাযথ সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার এমনও দেখা যাচ্ছে, হয়তো কোনো হাসপাতালে অনেক বিশেষজ্ঞ আছেন, কিন্তু ডিগ্রীধারী নার্স নেই, সাপোর্ট ফোর্স নেই। এভাবেই চলছিল, আমরাও ছিলাম নির্বাক ও নির্লিপ্ত!

কারন, আমাদের সমাজের মধ্যবিত্তসহ একটা বড় অংশ দেশের বাহিরে চিকিৎসা নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন! কিন্তু, করোনাকালে এসে নিজের দেশেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হতে গিয়ে আমরা চারিদিকে এত অব্যবস্থাপনা আর প্রায় ক্ষেত্রেই শুধু নাই নাই দেখে মাথা চাপড়াচ্ছি! কিন্তু, আদৌ আমাদের বোধদয় হয়েছে কী?

যা বলছিলাম, করোনাকালের আগে আমাদের নাগরিকদের বড় একটি অংশের শারীরিক যে কোন সমস্যায় চেষ্টা থাকতো যে কোনভাবে কোলকাতা/চেন্নাই/বেংগালোর গিয়ে চিকিৎসা করানোর, আর ধনীক শ্রেনীসহ সমাজের প্রভাবশালিদের ভাবনায় ছিল সিংগাপুর-থাইল্যান্ড-ইউরোপ-আমেরিকা!

কিন্তু, দেশে কেন অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ ন্যূনতম চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই বা কেন সবকিছুতেই বিদেশমুখি হতে হবে তা নিয়ে কী উচ্চবিত্ত আর কী মধ্যবিত্ত কেউই ভাবেননি আর নাগরিকের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যে তার সাংবিধানিক অধিকার তা নিয়ে উচ্চকন্ঠ হওয়াতো আরও দূরের কাহিনী!

এখন করোনাকালে এসেও দেখছি, এইযে আমাদের আইসিইউ সংকট, অক্মিজেনের স্বল্পতা, ফার্মেসিগুলোর ঔষুধ নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা সহ জবাবদিহিতাহীন বেসরকারি চিকিৎসা সেবা তা নিয়েও আমরা কেমন নির্লিপ্ত!

এতসব অব্যবস্থাপনা নিয়ে উচ্চকন্ঠ হওয়ার বদলে দেখছি, এমন হাজারো নাগরিকের অনেকেই ব্যস্ত আছে (যাদের কোন প্রয়োজনও হয়তো নেই) চাল-ডালের মতো চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকেই অক্মিজেনের সিলিন্ডার-অক্মিমিটার কিনে বাসায় মজুদ করে রাখছে! ফলাফল, বাজারে এগুলোর কৃত্রিম সংকট ও দাম বৃদ্ধি!

আমরা কী ধরেই নিয়েছি, আমাদের নিজেদের অক্মিজেন নিজেদেরই কিনে বাঁচতে হবে? আর শুধু অক্মিজেন বাসায় কিনে রেখেই কী বাঁচা যাবে? আমরা কী ধরেই নিয়েছি, এভাবেই চলবে আর সবকিছু ঠিক হলে নিজে আবার কোলকাতা/চেন্নাই/সিংগাপুর গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে আসবো! এভাবে কী চলতেই থাকবে??

সফিক চৌধুরী, বিতার্কিক ও কলাম লেখক।