জীবনের পুরো সময়টা কাটিয়েছিলেন প্রবাসে। সুখ নামক সোনার হরিণ ধরা হয়নি ওমানের তপ্ত রোদে ১৮ বছরের বেশি সময় হাঁড়ভাঙা পরিশ্রম করেও। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন দেশে। ততদিনে বড় হয়েছে পরিবার। দুই ছেলে ও এক কন্যা সন্তানের বাবা তিনি। সংসারের চাকা ঘুরতে হলে অর্থ উপার্জনের বিকল্প নেই। আবার নামলেন জীবনযুদ্ধে। শিল্প প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমে শ্রমিকের কাজ নিলেন। উপার্জিত অর্থে বেশ ভালোই চলছিল সংসার। পরিশ্রম করে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করাচ্ছিলেন। বড় ছেলে সদ্য প্রকাশিত মাধ্যমিক পরিক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে। মনে মনে ভেবেছিলেন, আরতো কয়টা বছর। ছেলেটার একটা গতি হলেই আমার অবসর! কিন্তু ছেলের আর গতি হয়নি। তবে অবসরে গিয়েছেন আবুল কাশেম। চির অবসরে। শনিবার মিরসরাইয়ের বিএসআরএম কারখানায় ফার্নেস বিস্ফোরণে নিহত হন তিনি।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের পূর্ব দিক থেকে আসছিল চাপা কান্নার শব্দ। সেখানে গাছের নিচে বসে কাঁদছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহেদুল ইসলাম রানা। নিহত আবুল কাশেমের শ্যালক পরিচয় দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘দুলাভাই সব সময় স্বপ্ন দেখতেন তার ছেলে পড়ালেখা শিখে একদিন পরিবারের দুঃখ-কষ্ট দূর করবে। পরিবারে দায়িত্ব নিয়ে সত্যিকার অর্থে বড় ছেলের দায়িত্ব পালন করবে। সেজন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন। সদ্য প্রকাশিত মাধ্যমিক পরীক্ষায় সরকারহাট এন আর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ভালো ফলাফল করে আমার ভাগিনা।’
তিনি আরো বলেন, দুলাভাই আমাকে ফোনে জানিয়েছেন আগামীকাল (রোববার) বাড়িতে আসবেন। আমার সাথে ছেলের ভর্তি নিয়ে কথা বলবেন। তিনি ঠিকই বাড়িতে যান, তবে লাশ হয়ে! ছেলের ভর্তি নিয়ে কথাও হবে না। ছেলেকে ভর্তি করার স্বপ্নও পূরণ হবে না!
আবুল কাশেমের বাড়ি উপজেলার ১৪ নম্বর হাইতকান্দি ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামে। ভালো মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। তার মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। শিশু সন্তান সাইদুর রহমান ইফাতকে বুকে নিয়ে নিথর আবুল কাশেমের স্ত্রী সাহিনুর আক্তার। বিলাপ করতে করতে জ্ঞান হারান, জ্ঞান ফিরলে আবার বিলাপ..।
ছেলে তানভীর আহমেদ ইমন আর মেয়ে সাদিয়া আফরিন ইভাকে শান্ত¡না দিয়েও আটকাতে পারছেন না প্রতিবেশীরা। বারবার বাবাকে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়ে বিলাপ করছেন তারা।
পরিবারে একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে শোকাহত পরিবারটির সামনে এখন ভয়াবহ বাস্তবতা।
নিহতের শালা জাহেদুল ইসলাম রানা বলেন, আমার দুলাভাই জীবনে যা উপার্জন করেছেন সব পরিবারে জন্য ব্যয় করেছেন। কোথাও কিছু জমা নেই যে পরিবারটি চলবে। এখন ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন! আশা করছি বিএসআরএম অসহায় পরিবারটির দিকে খেয়াল রাখবেন।
Developed By Muktodhara Technology Limited