আনোয়ারা প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলমের বিশেষ প্রতিবেদন : ছাত্রত্ব চলে গেছে অনেক আগে, বিবাহিত, বর্তমানে কয়েক সন্তানের জনক , মূল সংগঠন বিএনপি’র ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক এমন ব্যক্তিদের দিয়েই চলছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অঙ্গ সংগঠন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এছাড়া চলমান কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নেতৃত্বে আসার জন্য যারা নতুন করে নমিনেশন জমা দিয়েছেন তাদেরও অধিকাংশেরই ছাত্রত্ব নেই বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
২০১৮ সালে কেন্দ্র ঘোষিত ৫ সদস্যের কমিটির মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২ জনকে দেয়া হয়েছে অব্যাহতি। বাকী ৩ জনের ১ জন নিজ মা-বোনকে মারধর ও চুরির মামলায় আছে জেলে। ৮ মাস ধরে ৮ উপজেলায় নেই কোন কমিটি। অর্থ কেলেংকারির অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এসব বিষয় নিয়ে ত্রিণমূলের নেতা-কর্মীদের মাঝে চলছে ক্ষোভ। তবে জেলা সাধারণ সম্পাদকের দাবী গঠনতন্ত্র মতেই সব কিছু চলছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় ছাত্রদল জেলা মহানগর কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলের সদস্যের বয়স সর্বশেষ ২০০৩ সালে এসএসসি নির্ধারণ করেছে। একই সাথে অবিবাহিত ও ছাত্রত্ব থাকা বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু ২০১৮ সালের ১ আগষ্টে গঠিত চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের ৫ সদস্য কমিটির কারোই ছাত্রত্ব নেই। ৫ সদস্য কমিটিতে শহিদুল আলম শহিদকে সভাপতি, ইকবাল হায়দার চৌধুরীকে সিনিয়র সহ-সভাপতি, মোহাম্মদ মহসিনকে সাধারণ সম্পাদক, কে.এম. আব্বাসকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জমির উদ্দিন মানিককে সাংগঠনিক সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। গঠিত কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হায়দার চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক জমির উদ্দিনকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙের অভিযোগে পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। পাশাপাশি চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারী কেন্দ্র থেকে দক্ষিণ জেলার ৮ উপজেলা, ৫ পৌরসভা ও ২৪ টি কলেজের সাংগঠনিক কমিটিসমুহ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এর পর কোন কমিটি গঠন করা হয়নি।
এদিকে দক্ষিণ জেলা কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কে.এম. আব্বাস গত ৫ জুলাই নিজ মা-বোনকে মারধর এবং চুরির মামলায় বর্তমানে জেলে রয়েছে। এছাড়া বর্তমান সভাপতি শহিদুল আলম শহিদ ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহসিনের কোন ছাত্রত্ব নেই এবং একজন তিন সন্তানের জনক অপরজন এক কন্যা সন্তানের জনক বলে জানা যায়। এছাড়া বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহসিন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সহ-ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক বলেও অভিযোগ ওঠে।
দলীয় কর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কেন্দ্র ঘোষিত দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের এ কমিটি গঠনের পর থেকে ত্রিণমূলের সাংগঠনিক ইউনিটের সাথে কোন ধরণের যোগাযোগ নেই। কেন্দ্রের সাথে সমন্বয় করে কোন কর্মসূচিও পালন করেনি তারা। এসব বিষয় নিয়ে ৮ উপজেলা, ২৪ কলেজ শাখা ও ৫ পৌরসভার সভাপতি-সম্পাদকেরা এই কমিটির বিরুদ্ধে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল জেলার সব ইউনিট কমিটি বাতিল করে দিলে নেতা কর্মীদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। তারা কমিটির বিরুদ্ধে মিটিং মিছিল ছাড়াও দলীয় অফিসে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটায়।
বোয়ালখালী উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক মহসিন খোকন জানান, গঠনতন্ত্র বিরোধী অছাত্র ও বিবাতিদের নিয়ে দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলে কমিটি গঠনের পর কমিটি বাতিলের দাবীতে আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। আমাদের অভিভাবক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশনেতা তারেক রহমান বরাবর লিখিত অভিযোগও করেছি। এখন গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্র যা সিদ্ধান্ত দেবে সেটা মেনে নেব।
বর্তমান কমিটির অব্যাহতি প্রাপ্ত সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হায়দার চৌধুরী জানায়, সম্পন্ন গঠনতন্ত্রকে উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল টাকার বিনিময়ে বিবাহিত, অছাত্র ও অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিদের দিয়ে দক্ষিণ জেলা কমিটি গঠন করেছে। আর এই কমিটি নিজেদের পদ ধরে রাখতে দক্ষিণ জেলার সকল সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি কেন্দ্রের মাধ্যমে বিলুপ্ত করে দেয়, যা সম্পন্ন গঠনতন্ত্র বিরোধী। এই কমিটির মেয়াদ ২ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন কিংবা দক্ষিণ জেলার কোন ইউনিট কমিটি গঠন করতে পারেনি। দলের স্বার্থে আমাদের অভিভাবক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশনেতা তারেক রহমান যা সিদ্ধান্ত দেবে সেটাই মেনে নেব।
দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহসিন বলেন, দলের গঠনতন্ত্র মোতাবেক সব কিছু চলছে। অনেকে দলীয় পদ না পেয়ে ব্যক্তিগত আক্রোশে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। তাদের জানা উচিত, কেন্দ্র থেকে যে সিদ্ধান্ত আসে সেটা আমরা বাস্তবায়ন করি।
ছাত্রদলের বয়স নির্ধারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, জেলা ছাত্রদলের ক্ষেত্রে ২০০০ সালে যারা এসএসসি দিয়েছেন আর উপজেলার ক্ষেত্রে ২০০৩ সালের এসএসসি সনদের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আগামী ২৫ তারিখের মধ্যে দক্ষিণ জেলার ৮ উপজেলা, ৫ পৌরসভা ও ২৪ কলেজের ইউনিট কমিটিগুলো ঘোষণা করা হবে। এ জন্য পদ প্রত্যাশীরা জীবণ বৃত্তান্তসহ ১১ শ ফরম জমা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. আবদুস সাত্তার পাঠোয়ারীর সাথে মোঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সংশোধিত গঠনতন্ত্রানুযায়ী বয়স নির্ধারণে জেলার ক্ষেত্রে এসএসসি ২০০৩ এবং উপজেলার ক্ষেত্রে ২০০৫ সালের ব্যাচ নির্ধারণ করা হয়।
বর্তমান কমিটিতে বিবাহিতদের সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা ২ বছর আগের কমিটি। শিঘ্রই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। ছাত্রত্ব ছাড়া কেউ কমিটিতে স্থান পাবেনা। কমিটি গঠনে যাছাই-বাছাইয়ের জন্য কেন্দ্রে একটি সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়েছে।
এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের বয়স নির্ধারণের সময় সীমাকে হঠকারী সিন্ধান্ত বলছেন নিয়মিত ছাত্ররা। তারা বলছেন, ২০০৩ সালে এসএসসি পাশের পর ১৭ বছর ছাত্রত্ব ধরে রাখার কোন জাদুর কাঠি আবিষ্কার হয়নি। এটা অযোক্তিক ও গাঁজাখুরি সিন্ধান্ত। ২০০৩ সালে এসএসসি পাশ করে কোন সাধারণ ছাত্র এখনও ছাত্রত্ব আছে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত আছে এমন বিরল উদাহরণ একটিও নেই বলে তাদের দাবী। এটা বয়স্কদের নেতৃত্বে আনার একটি অপকৌশলমাত্র।
বয়সের এ ফারাকজনিত কারণে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের দলে টানতে ব্যর্থ হচ্ছেন বলে সাধারণ দলীয় কর্মীরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক কর্মী প্রতিবেদককে জানান।
Developed By Muktodhara Technology Limited