image

আগ্রাবাদ বাস্তুহারা সড়ক :  বাস ট্রাক কাভার্ডভ্যানের পার্কিং জোন, বোনাস মিলে মাদক

image

চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন ২৭নং দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ড এলাকার একটি সড়ক। আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠের পূর্ব পাশ ঘেঁষে সোজা দক্ষিণে গিয়ে ৩৬ নাম্বার ওয়ার্ডে মিলেছে। সড়কটিতে আগ্রাবাদ সরকারী কার্যভবন-২, দুদক, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, কর কমিশনারের কার্যালয়, বিএসটিআই, গ্যাজেটেড অফিসার্স কলোনী, আগ্রাবাদ বয়েজ স্কুল, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের খামারবাড়ী, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর কার্যালয়, আমেরিকান হাসপাতাল, পোর্ট হেলথ কলোনী, মেডিকেল সাব ডিপো কলোনীসহ নানা সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের অবস্থান। সড়কটি পশ্চিমে ঘুরে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে পূর্ব পাশে সংযুক্ত হয়েছে। এখানে আছে শ্রম আদালত ভবন, ওষুধ প্রশাসনের ডিপোসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। পুরো সড়কটিই যেন তৈরী হয়েছে বাস, ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের গ্যারেজ আর পাকিং জোন হিসেবে। এ সড়কের বস্তিগুলোকে ঘিরে গড়ে ওঠেছে মাদকের আস্তানাও।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জাইকার অর্থায়নে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ২০কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি পুনঃনির্মাণ করেছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারীতে টেন্ডার হওয়ার পর ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাসেম কনন্ট্রাকশন। ইতোমধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারীর ১৫তারিখ সড়কটি ব্যবহারের জন্য এক পাশে উন্মুক্ত করে দেয়। সড়কটি জনগণের চলাচলের জন্য খুলে দিতে না দিতেই উভয় পাশ দখল করে নিয়েছে বাস, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, পিকআপসহ নানা গাড়ী। যেন এসব গাড়ীর পার্কিং এবং গ্যারেজের জন্যই সড়কটি প্রশস্থ করা হয়েছে। আগে একপাশে গাড়ী রাখলেও এখন সড়ক বড় হওয়ায় দু’পাশে গাড়ী রাখার সুযোগ পেয়েছে দখলকারীরা।

সড়ক পুনঃনির্মাণ ও প্রশস্থকরণ হওয়ায় জনসাধারণের মনে আশার সঞ্চার হলেও সড়কটি এভাবে অবৈধ দখলে চলে যাওয়ায় জনমনে চরম ক্ষোভ আর হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সরকারী দলের নেতাদের এবং পুলিশকে ম্যানেজ করেই গড়ে ওঠেছে এসব অবৈধ পাকিং। ফলে স্থানীয় সাধারণ জনগণ প্রতিবাদ করার সাহসও পান না। নিরবে সহ্য করে নিয়েই যান এবং জনগণকে চলাচল করতে হয় এ সড়কে।

দখলে বিরক্ত এলাকাবাসীর জন্য এ সড়কে বোনাস হিসেবে মিলে নানা ধরণের মাদক। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ এমন কোন মাদক নেই যা এখানে পাওয়া যায়না। বাস্তুহারা কলোনী উচ্ছেদ করা হলেও জাম্বুরী পার্কের পূর্বপাশে নালার ওপর গড়ে ওঠা ঝুপড়ি ঘরগুলোতে মিলে সবধরণের মাদক। সড়কের ওপর দাড়িয়ে নারী পুরুষ প্রকাশ্য দিবালোকে বিক্রি করেন নানাজাতের মাদক। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কিছুদিন আগে অভিযান চালিয়ে কয়েকজন গ্রেপ্তার করলে কিছুদিন বন্ধ ছিল মাদকের হাট। এখন আবারও পুরোদমে চলে এ অবৈধ মাদকের কারবার।

সড়কে অবস্থিত আগ্রাবাদ বয়েজ স্কুলের শিক্ষার্থী এবং গেজেটেড অফিসার্স কলোনী, পোর্ট হেলথ কলোনীর বাসিন্দা, কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে (আমেরিকান) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের চরম নিরাপত্তহীণতার মধ্য দিয়ে এ সড়কে চলাচল করতে হয়। তাছাড়া এ সড়কে সরকারী নানা অফিসে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সেবাপ্রার্থী জনসাধারণকেও দূর্ভোগে পোহাতে হয় নিয়মিত। মাদকের অতি সহজলভ্যতায় এলাকার ছাত্র ও যুবসমাজের মধ্যে মাদকের প্রতি আসক্তি তৈরী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে এ সড়কের উভয় পাশে গড়ে ওঠা মাদকের আস্তানাগুলো। ফলে অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠা আর শঙ্কা পরিলক্ষিত। সবচেয়ে বড় সমস্যা নগরীর দৃষ্টিনন্দন জাম্বুরী পার্কে ঘুরতে আসা দর্শণার্থীদের। তীব্র যট আর বখাটে মাদকের ওপেন সিক্রেট লেনদেনে সবাই একধরণের শঙ্কায় ভোগেন।

পার্কিং করা বাস ট্রাকগুলোতে স্থানীয় ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসীরা দিব্যি লুকিয়ে থাকার সুযোগ পান। রাতের আঁধারে এ সড়কে চলাচলকারী রিক্সা ও সিএনজি’র গতিরোধ করে প্রায়সময়ই ছিনতাইয়ের ঘটনাও সংগঠিত হয়। হঠাৎ করেই গাড়ী থেকে নেমে ছিনতাইকারীরা সর্বস্ব লুটে নিয়ে উধাও হয়ে যায়। এসব গাড়ীগুলোতে বসে অনেককে মাদক সেবন করতেও দেখা যায়।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এ সড়কে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করলেও আবারও তা দখলে নিয়েছে মাদক ও চোরাকারবারীর দল। খোদ সরকারী কার্যভবনের সামনে (দুদক গেইট/১০তলা) ফুটপাতের ওপর দোকানের পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছেন হকার নামীয় মাদক কারবারীরা। তাদের উচ্ছেদ করলে কয়েকদিন ফুটপাত উন্মুক্ত ছিল কিন্তু আবারও সেখানে চেয়ার টেবিল বসিয়ে ওপরে ছাউনি দিয়ে দিব্যি হোটেল ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে দখলকারীরা। যেন দেখার কেউ নেই। মানুষ বাধ্য হয়েই ফুটপাত ছেড়ে সড়কের ওপর দিয়ে চলাফেরা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আগ্রাবাদ সরকারী কলোনী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাস-ট্রাক রাখার ফলে আমাদের স্কুলটি দেখা পর্যন্ত যায়না। তাছাড়া স্কুল খোলা অবস্থায় শিক্ষার্থীর চলাচলে এসব পার্কিং করা গাড়ী বিঘœ সৃষ্টি করে। আমি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চলাফেরা নিয়ে সবসময় শঙ্কিত থাকি।

পোর্ট হেলথ কলোনীর এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের কলোনীর মুখেইতো ট্রাক-কাভার্ডভ্যানগুলো আড়াআড়িভাবে পার্কিং করে রাখা হয়। আমাদের গেটটা পর্যন্ত দেখা যায়না গাড়ীর জন্য। বাচ্চাদের বাইরে বের হওয়ারও কোন সুযোগ নেই। 

আসন্ন চসিক নির্বাচনে ২৭নং দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগ মনোনীত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী জাফরুল হায়দার চৌধুরী সবুজের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পার্কিং দখলসহ এ সড়কে আরও নানা সমস্যা আছে। এখন এসব বিষয় নিয়ে আমি কথা বলতে চাইনা। নির্বাচিত হলে ইনশাল্লাহ দেখতে পাবেন আমি কি ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করব। এখন আমি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি।

সড়ক দখল এবং মাদকমুক্ত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবী করেন এলাকাবাসী। তাদের অভিমত এমন সুন্দর মনোরম এলাকা এভাবে দখল আর মাদকের আখড়ায় পরিণত হলে যুব সমাজের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।