image

শেখ মুজিবের উপর ভরসা রাখুন, অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন

image

১৯৭১ সালের ১৪ই মার্চের পত্রিকায় দেখা যায় দুটি দল ছাড়া পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক দল ইয়াহিয়াকে বঙ্গবন্ধুর চার-দফা মেনে নেওয়ার আহবান জানান। দেশের অভ্যন্তরে সর্বজনমান্য মওলানা ভাসানীও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মানার জন্য সাধারণ জনগণকে অনুরোধ করেন। দেশের বিভিন্ন জেলখানা থেকে একের পর এক কয়েদিরা পালিয়ে যাচ্ছে, সাধারণ জনগণ সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছে, পাশাপাশি কর্মবিরতি পালন করছে। উপায়ন্তর না পেয়ে সামরিক সরকার আবার ফরমান জারি করেন। অথচ বঙ্গবন্ধু পূর্বের ফরমানেরই তীব্র বিরোধিতা করেন। পশ্চিম বাংলার সকল রাজনৈতিক দল বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী জানান। এদিকে ব্যাঙ্কিং সেক্টরে চলে চরম নৈরাজ্যমূলক অবস্থা। কার্যত তখন পূর্ব বাংলায় সামরিক সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণই ছিলনা।

উস্কানীমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করুন
সামরিক কর্তৃপক্ষের নয়া নির্দেশের জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল গভীর রাত্রে সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন : সামরিক আইনের আর একটি আদেশ জারি হইয়াছে জানিতে পারিয়া আমি বিস্মিত হইয়াছি। আজ যখন খোদ সামরিক আইন প্রত্যাহারের জন্য ইতিমধ্যে বাংলার সমগ্র গণমানসের প্রচন্ড দাবীর কথা আমরা ঘোষণা করিয়াছি তখন নতুন করিয়া এরূপ আদেশ জারি করা জনসাধারণকে উস্কানীদানেরই সামিল। এই ধরণের আদেশ যাহারা জারি করিতেছেনতাহাদের এই সত্যটি উপলব্ধি করা উচিত যে, আজ জনসাধারণ তাহাদের ইস্পাতকঠিন সংকল্পে ঐক্যবদ্ধ। এই ধরণের ভীতি প্রদর্শনের মুখে তাহারা কিছুতেই নতি স্বীকার করিবে না। সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমি এই ধরণের উস্কানীমূলক তৎপরতা হইতে বিরত তাকার আহŸান জানাইতেছি। জনসাধারণকে বীতি প্রদর্শনের এই দরণের প্রচেষ্টা সত্বেও তাহারা তাহাদের সংগ্রাম চালাইয়া যাইবে। কারণ তাহারা জানে যে, ঐক্যবদ্ধ মানুষের এই শক্তির বিরুদ্ধে কোন কিছুরই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ক্ষমতা নাই।

‘শেখ মুজিবের উপর ভরসা রাখুন’-৭ কোটি বাঙালীর প্রতি মওলানা ভাসানীর আহবান
আজ সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ ময়দানে এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতাকালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ৭ কোটি বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমানেরপ্রতি তাঁহার পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। তিনি শেখ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী না হইয়া মুক্তি সংগ্রামের অগ্রনায়ক হওয়ার আহবান জানান। সারা বাংলাদেশ কৃষক সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত এই সভায় বক্তৃতাকালে মওলানা ভাসানী বলেন, আমি জানি, শেখ মুজিব জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিতে পারে না। তিনি শেখ সাহেবের উপর ভরসা রাখার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানান। 
বৃদ্ধ মওলানা বলেন, নিজেদের মুক্তি অর্জনের জন্য একটি দেশের জনগণের মধ্যে এমনতরো ঐক্য তিনি আর কখনো দেখেন নাই। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল নেতাদের প্রতি আল্লাহর ওয়াস্তে বাঙালীদের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার আহবান জানান।  

ভূট্টো-কাইয়ুমের দল ছাড়া পশ্চিমা লেরও সব দলেরই এক কথা-
বেতারসূত্রে প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, গতকাল লাহোরে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঁচটি পার্লামেন্টারী পার্টি নেতাদের সভায় দেশ হইতে সামরিক শাসন প্রত্যাহার, নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট দেশের শাসন ক্ষমতা হস্তান্তর ও বাংলা দেশের সশস্ত্র বাহিনীর গুলী বর্ষণের তদন্তের দাবী জানান হইয়াছে। জমিয়তে ওলামায়ে পাকিস্তানের নেতা মওলানা মুফতি মাহমুদ পার্লামেন্টারী পার্টির নেতাদের সভায় সভাপতিত্ব করেন। কাউন্সিল মুসলিম লীগ, কনভেনশন লীগ, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও জমিয়তে ওলামায়ে পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ উক্ত সভায় যোগদান করেন। সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিস্তারিত আলোচনার পর প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে অবিলম্বে বাংলা দেশে যাইয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার সহিত আলোচনা করিয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও বর্তমান অচলাবস্থা দূরীকরণের পন্থা উদ্ভাবনের জন্য অনুরোধ জানান হয়। 

ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রে বর্তমান অসুবিধার মূলে কতিপয় পশ্চিম পাকিস্তানী ব্যাঙ্কের ভূমিকা 
কতিপয় পশ্চিম পাকিস্তানী ব্যাঙ্ক ক্লিয়ারিং হাউজ চেক পরিশোধ করিতে পারিতেছে না বলিয়া গত ৩ দিন যাবৎ কোন ক্লিয়ারিং হাউজ বসিতে পারিতেছে না। সোমবার পর্যন্ত কোন ক্লিয়ারিং হাউজ বসিবে না বলিয়া সংশ্লিষ্ট মহল হইতে জানা গিয়াছে।
বাংলাদেশে কার্যরত বিভিন্ন ব্যাঙ্কে মোট মজুদ টাকার তিন-চতুর্থাংশ উপরোক্ত তিনটি পশ্চিম পাকিস্তানী ব্যাঙ্কে জমা রহিয়াছে। বাংলা দেশে এইসব ব্যাঙ্কে যে পরিমাণ টাকা জমা আছে, তুলনামূলকভাবে সেই পরিমাণ টাকা বাংলা দেশে লগ্নি না করিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করার দরুন এই অবস্থার উদ্ভব হয় বলিয়া অভিযোগ পাওয়া যায়।

দেশরক্ষা খাতের বেতনভ‚ক বে-সামরিক কর্মচারী সামরিক আদেশবলে সোমবারে কাজে যোগদানের নির্দেশ
গতকাল (শনিবার) ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসকের সদর দফতর হইতে ১১৫ নং সামরিক আইন নির্দেশ জারি করা হয়। উহাতে প্রতিরক্ষা খাতের বেতনভ‚ক বেসামরিক কর্মচারীদের আগামীকাল (সোমবার) সকালে কার্যে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে এবং বলা হইয়াছে যে, যাহারা উক্ত তারিখে কার্যে যোগদানে ব্যর্থ হইবেন, তাহাদের চাকুরী হইতে ছাটাই করা যাইতে পারে এবং পলাতক হিসাবে সামরিক আদালতে তাহাদের বিচারও করা যাইতে পারে। সামরিক নির্দেশে বলা হয়, দেশরক্ষা বিভাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন এম. ই. এস. কম্বাইন্ড ওয়ার্কশপ, অস্ত্রাগার, সি. এম. এ. , এল. এ. ও. , সি. এস. ডি. , পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সকর বেসামরিক কর্মচারী যাহারা প্রতিরক্ষা খাত হইতে বেতন পাইযা থাকেন তাহাদের ১৫ই মার্চের সকাল ১০টার মধ্যে স্ব স্ব বিভাগের নিকট কার্যে যোগদানের ব্যাপারে রিপোর্ট করিতে হইবে।
যদি কেহ উক্ত নির্ধারিত সময় ও স্থানে কার্যে যোগদানের রিপোর্ট দিতে ব্যর্থ হন, তবে তাহাকে চাকুরী হইতে ছাটাই করা যাইতে পারে এবং এইরূপ ব্যক্তিকে পলাতক বলিয়া বিবেচনা করিয়া সামরিক আদালতে তাহার বিচারও করা যাইতে পারে। এই নির্দেশ মানিতে ব্যর্থ হইলে সামরিক আইনের ২৫ নম্বর বিধি মোতাবেক সর্বোচ্চ দশ বৎসরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া যাইতে পারে।

সাবেক এম. এন. এ. আফাজউদ্দীন বলেন- ‘লেটার অব অথরিটির’ মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন
সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য জনাব আফাজউদ্দীন ফকির গতকাল সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে অভিমত প্রকাশ করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পিপল্স পার্টির চেয়ারম্যান জনাব জুলফিকার আলী ভূট্টোর সহিত আলোচনা অনুষ্ঠানের সকল গুরুত্বই তিরোহিত হইয়া গিয়াছে এবং এক্ষণে এইরূপ আলোচনা একটি মীমাংসাকে বিলম্বিতই করিবে যাহার ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয়ক্ষেত্রেই অধিকতর সংকট সৃষ্টি হইতে পারে।
----। জনাব ফকির উল্লেখ করেন যে, ভারত বিভক্তির পূর্ববর্তী পর্যায়ে উগ্র হিন্দু কংগ্রেস নেতাদের দায়িত্বহীন মনোভাবের ফলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছিল, আজও যেন পরিস্থিতিকে সেই দিকে ঠেলিয়া দেওয়া হইতেছে।
তিনি বলেন, এই ক্ষমতা কিভাবে দেওয়া যাইতে পারে সে সম্পর্কে প্রশ্ন উঠিতে পারে। কিন্তু উহার উত্তর খুবই সহজ। আইয়ুব খান যেভাবে একটি ‘লেটার অব অথরিটির’ মাধ্যমে জেনারেল এ. এম. ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করিয়াছিলেন, সেইভাবে উহা করা যাইতে পারে। কারণ, আইয়ুব খান তাঁর নিজের তৈরি শাসনতন্ত্রের ব্যাপারে কোন কিছু উল্লেখ না করিয়াই উক্ত পত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করিয়াছিলেন।...।

লেখকঃ মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান, পরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)।