image

৫২তম জন্মদিনে আপনার সব চাইতে বড় ও পবিত্র কামনা কি? বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি

image

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ১৭ই মার্চের জন্মদিন কেমন ছিল? 
১৬ই মার্চ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণী মুজিব-ইয়াহিয়া রূদ্ধদ্বার আলোচনা শুরু হয়। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন ‘আলোচনা চলবে।’ ১৭ই মার্চ ২য় দিনের আলোচনা। খুব সহজেই অনুমান করা যায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের তখন মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ে বিরাজিত ছিল। ১৭ই মার্চ নগর আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। ওইদিন বঙ্গবন্ধুকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেনÑ আপনার ৫২তম জন্মদিনে আপনার সব চাইতে বড় ও পবিত্র কামনা কি? বঞ্চিত গণমানুষের অবিসংবাদী নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সংক্ষেপে জবাব দেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।’ নিজের বাসভবনের সামনে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের একজন বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। জবাবে শেখ মুজিব বেদনার্ত স্বরে বলেন, আমি জন্মদিন পালন করি নাÑ আমার জন্ম দিনে মোমের বাতি জ্বলে না, কেকও কাটি না। এদেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নাই। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে শেখ সাহেব বলেন, আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যে কোন মুহুর্তে তাদের মৃত্যু হইতে পারে। তিনি বলেন, আমি জনগণেরই একজন। আমার জন্মদিনই কি, আর মৃত্যুদিনই কি? আমার জনগণের জন্যই আমার জীবন ও মৃত্যু। বঙ্গবন্ধুর বাসায় অনাড়ম্বরভাবেই তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়। আজ ১৭ই মার্চ, ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে প্রিয় নেতার প্রতি বিনম্্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

মুজিব-ইয়াহিয়ার মধ্যে জাতির ভাগ্য নির্ধারণী আলোচনা শুরু
বাংলার মুক্তিকামী জনতার সর্বাত্মক অহিংস আন্দোলনের পটভ‚মিতে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ও জাতীয় পলিষদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে জাতির ভাগ্য নির্ধারণী আলোচনা শুরু হয়। দীর্ঘ আড়াইঘন্টাব্যাপী আলোচনাশেষে বাহিরে আসিয়া সমবেত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ সাহেব জানান যে, আজ সকাল ১০টায় তাঁহারা পুনরায় বৈঠকে মিলিত হবেন। পাকিস্তানের সর্বশেষ বিস্ফোরনোম্মুখ রাজনৈতিক পরিস্থিতির পটভ‚মিতে দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আগ্রহব্যাকুল প্রতীক্ষার পাশাপাশি সারা বিশ্বের দৃষ্টি যে বৈঠকের দিকে নিবন্ধ, গতকাল ঢাকায় যখন সে বৈঠক শুরু হয় তখন একদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দন্ডধারী প্রেসিডেন্টের ঢাকাস্থ বাসভবন শীর্ষে জাতীয় পতাকা ও অপরদিকে জনগণের প্রদত্ত পার্লামেন্টারী ক্ষমতার অধিকারী শেখ মুজিবের গাড়ীর অগ্রভাগে বাংলার আপামর মানুষের শোকের প্রতীক কৃষ্ণপতাকা পতপত করিয়া উড়িতে থাকে।
প্রেসিডেন্ট ভবনে রূদ্ধদ্বার কক্ষে জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে আড়াইঘন্টা আলোচনাশেষে শেখ মুজিব উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান যে, প্রেসিডেন্টের সাথে রাজনৈতিক ও অন্যান্য সমস্যা সম্পর্কে তাঁহার আলোচনা হইয়াছে এবং আরও আলোচনা হইবে। তিনি বলেন, ইহা সময়-সাপেক্ষ ব্যাপারÑ দুই এক মিনিটের কাজ নয়। তাঁহার কথা হইতে আলোচনার গতিধারা সম্পর্কে কিছু আঁচ করা সম্ভব হয় না। গতকাল সকাল ১১টায় কড়া সামরিক প্রহরাধীন প্রেসিডেন্ট ভবনে জেনারেল ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবের মধ্যে রূদ্ধদ্বার কক্ষে এই বৈঠক শুরু হয় এবং উহার প্রথম দফায় আড়াইঘন্টা স্থায়ী ঐ বৈঠকে কোন তৃতীয় ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন না। বৈঠকশেষে ঠিক বেলা দেড়টায় প্রেসিডেন্ট ভবনের প্রধান ফটকের কাছে গাড়ী হইতে নামিয়া শেখ সাহেব অপেক্ষমান সাংবাদিকদের জানান যে, আলোচনা অব্যাহত থাকিবে এবং তিনি আজ সকালে আবার প্রেসিডেন্টের সহিত মিলিত হইবেন। গাড়ী হইতে অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে একÑঝাঁক দেশী-বিদেশী সাংবাদিক এবং আলোকচিত্র শিল্পী বঙ্গবন্ধুকে ঘিরিয়া ধরেন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় তিনি খুশী হইয়াছেন কি াসন্তষ্ট হইয়াছেন, এই সময় তাঁহার মুখ দেখিয়া উহা অনুমান করা সম্ভব ছিল না। , তিনি বলেন, আমি রাজনৈতিক ও অন্যান্য সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করিতেছি। আরও আলোচনা হইবে। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় কতদূর অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে জানিতে চাহিলে শেখ সাহেব বলেন, আলোচনা চলিতেছে, আরও আলোচনা হইবে। ‘হইহার চাইতে বেশি কিছু আমার বলার নাই।’ শেখ সাহেব সাংবাদিকদের প্রশ্নাবলী সতর্কতার সঙ্গে এড়াইয়া যাইতেছেন বুঝিতে পারিয়াও জনৈক বিদেশী সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘আলোচনার পরিবেশ কি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল?’ জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আর কোন প্রশ্ন করিবেন না। আলোচনা চলিবে এজন্য সময়ের দরকারÑ ইহা দু-এক মিনিটের ব্যাপর নয়।’
শেখ সাহেব প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়া পৌছিলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভবনের দ্বারে তাঁকে স্বাগত জানান। আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট ভবনের পারাপার সিঁড়ি পর্যন্ত আসিয়া শেখ সাজেবকে বিদায় শুভেচ্ছা জানান।
আলোচনা চলাকালে ‘খ’ এলাকার সামরিক আইন প্রশাসক লে: জে: টিক্কা খাঁন, মেজর জেনারেল ওমর এবং মেজর জেনারেল গুল হাসান প্রেসিডেন্ট ভবনের কক্ষান্তরে উপস্থিত ছিলেন এবং শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকের আগে প্রেসিডেন্ট তাঁহাদের সঙ্গে আলাপ করেন বলিয়া প্রকাশ।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনাকল্পে স্বীয় বাসভবন ত্যাগের পূর্বে তিনি স্বল্পকালের জন্য দলের বিশিষ্ট নেতৃবর্গের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। প্রেসিডেন্ট ভবন হইতে ফিরিয়া তিনি দলীয় শীর্ষস্থানীয় সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হন। রাত্রি ৮টা হইতে তাঁহারা পুনরায় আলোচনায় বসেন এবং গভীর রাত্রি পর্যন্ত আলোচনা চলিতে থাকে।

জনগণ আমাকেই ক্ষমতায় বসাইতে চায়- ভূট্টো
পিপল্স পার্টির চেয়ারম্যান জনাব জুলফিকার আলী ভ‚ট্টো করাচীতে সুস্পষ্ট অভিমত প্রকাশ করেন যে, কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও পিপল্স পার্টি সমবায়ে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠিত হওয়া উচিত। জনাব ভ‚ট্টো এক সাংবাদিক সম্মেলনে গতকালের জনসভায় প্রদত্ত বক্তৃতার ব্যাখ্যা দানকালে এক প্রশ্নের জবাবে উক্ত অভিমত প্রকাশ করেন।
জনাব ভ‚ট্টোর মতে, তাঁহার গতকালের বক্তৃতা সকল সংবাদপত্রই ভুল বুঝিয়াছে। জনাব ভ‚ট্টো বলেন যে, তিনি ক্ষমতালিপ্সু নহেন, বরং পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণই তাঁহাকে ক্ষমতায় বসাইতে চাহে যাহাতে তিনি তাহাদের আশা-আকাংখার প্রতিনিধিত্ব করিতে পারেন। শেখ মুজিবুর রহমান যদি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দলগুলির সহিত মিলিয়া কেন্দ্রে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন তাহা হইলে অবস্থা কি দাঁড়াইবে, জিজ্ঞাসা করা হইলে জনাব ভ‚ট্টো বলেন যে, উহা কার্যোপযোগী হইবে না, কারণ তাঁহার মতে পিপল্স পার্টি ছাড়া অন্য কোন দলই পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের আশা-আকাংখার প্রতিনিধিত্ব করে না।
দেশের জন্য অত্যাবশ্যক একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের নেতার ভ‚মিকা গ্রহণ করিতে চাহেন না কেন জিজ্ঞাসা করা হইলে জনাব ভ‚ট্টো বলেন, “দেশের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে পশ্চিম পাকিস্তান সর্বদাই পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে উহার দ্বারা শাসিত হইতে থাকিবে।” পূর্ব পাকিস্তান হইতে সব সময়ই একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লইয়া আসিবে এমন কোন কথা নাই এবং জনাব ভ‚ট্টো দেশের উভয় অংশেই তাঁহার দলকে সুসংগঠিত করিয়া লইতে পারেন বলিয়া দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইলে পি.পি.পি প্রধান বলেন, “অদূর ভবিষ্যতে তেমন কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হইবে বলিয়া আমি মনে করি না; আর যদি তেমন অবস্থার সৃষ্টি হয় তবে সমস্যার সমাধান আপনা আপনিই হইয়া যাইবে।” শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রিসভায় পিপল্স পার্টিকে অন্তর্ভূক্ত করিতে রাজী না হইলে জনাব ভ‚ট্টো কি করিবেন ইত্তেফাক প্রতিনিধির এই প্রশ্নে পি.পি.পি প্রধান কিছুটা বিরক্তিকর ভাব প্রকাশ করিয়া বলেন, “ইহা একটি অবমাননাকর প্রশ্ন।” তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি শেখ মুজিবের সহিত ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্নটি আলোচনা করিয়াছেন, তবে তাঁহাদের আলোচনায় কেবল একটি বিষয়ই যে স্থান পাইয়াছে ইহা তিনি অস্বীকার করেন।
জনাব ভ‚ট্টো বলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সহযোগিতা ছাড়া বর্তমান অবস্থার অচলাবস্থার অবসান ঘটান যাইবে না এবং তিনি তাই পুনরায় আলোচনা শুরু করিতে রাজী হইয়াছেন।

লেখকঃ মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান, পরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)।