১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই বিভীষিকা রাতে কি ঘটেছিল- স্বাভাবিকভাবেই পাঠকের মত আমারও আশা ছিল ২৬শে মার্চের পত্রিকা থেকে জানতে পারবো। কিন্তু ২৬শে মার্চের পত্রিকা পাওয়া যায় নি। ইত্তেফাক, আজাদ, সংবাদ ইত্যাদি পত্রিকা খোঁজা হয়েছে। কিন্তু ২৬শে মার্চ থেকে ৩১শে মার্চের পত্রিকা আরকাইভে পাওয়া যায় নি। তাই ১৯৭২ সালের ২৫শে মার্চের পত্রিকার স্মরণাপন্ন হতে হল। কি ঘটেছিল ২৫শে মার্চে তার স্মৃতিচারণমূলক তথ্য পেতে। দৈনিক বাংলায় ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ নিয়ে নিচের লেখাটি ছাপা হয়ঃ
সেই বিভীষিকাময় রাতঃ ঢাকার আকাশ যেদিন নৃশংসতার আগুনে জ্বলছিল
রাতের নিস্তদ্ধতা ভেঙ্গে খান খান করে গর্জে উঠলো মেশিনগান। একটি নয়। দুটি নয়। অসংখ্য। দেখতে দেখতে ঢাকার আকাশ লালে লাল হয়ে উঠলো আগুনের লেলিহান শিখায়। আগুন জ¦লছে রাজারবাগ, আগুন জ¦লছে পীলখানায়, আগুন জ¦লছে বস্তিতে বস্তিতে। হাজার হাজার নারী-পুরুষ শিশুর মর্মভেদী আর্তচিৎকারে ভরে উঠলো ঢাকার আকাশ বাতাস। শুধূ মেশিনগান নয়- আরো কত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গোলাগুলীর একটানা শব্দে বিষাক্ত হয়ে উঠলো রাজধানীর রাত। একাত্তুরের ২৫শে মার্চের রাত। বাঙালী জাতির জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় রাত। দানবিক নৃশংসতায় এই রাত্রে বর্বর পাকিস্তানী সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালীদের উপর।
অথচ বাঙালী আশা করেছিল এই দিন একটা কিছু সমঝোতা হবেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব তাজুদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, আর আলোচনা নয়- এবার সৃস্পষ্ট ঘোষণা চাই। দেশী-বিদেশী শত শত সাংবাদিকের ভীড়ে ভরেছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবন। এরই মধ্যে ইয়াহিয়ার সাথে বৈঠক সেরে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন ভ‚ট্টো। বললেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত আশংকাজনক। সাংবাদিক সম্মেলন শেষে সাংবাদিকরা দৌড়ে এলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। তাঁকে জানালেন ভ‚ট্টোর বক্তব্য। সব শুনে বঙ্গবন্ধুর সদা প্রফুল্ল চেহারায় ফুটে উঠলো গভীর গাম্ভীর্য। আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আলোচনার জন্য তিনি গিয়ে ঢুকলেন পাশের ঘরে। বাইরের আঙ্গিনায় সাংবাদিকদের ভীড় ক্রমেই বাড়ছিল। সবারই মনে উত্তেজনা- কি হবে? এর আগেই সবাই জেনেছেন মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।
এরই মধ্যে একজন দৌড়ে এসে খবর দিলেন চিড়িয়া ভেগেছে। কি ব্যাপার? সবারই দৃষ্টি গিয়ে পড়লো সাংবাদিক বন্ধুটির প্রতি। কি ব্যাপার? বন্ধুটি বললেন, ইয়াহিয়া এইমাত্র সাদা পোশাকে প্রেসিডেন্টভবন থেকে বেরিয়ে বিমান বন্দরের দিকে গেল। তার মানে? সবাই ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন।তার মানে কি ইয়াহিয়া চলে গেল? কে একজন বলে উঠলেন- না না হয়তো ক্যান্টনমেন্ট গেছে। কোন কিছু ফয়সালা না করে কি তাঁর পক্ষে যাওয়া সম্ভব?
কথা তার শেষ না হতেই বিমান বন্দর থেকে থেকে একটি বোয়িং উড়লো। বঙ্গবন্ধুর বাড়ীর ওপর দিয়েই উড়ে সেটা মিলিয়ে গেল পশ্চিম আকাশে। তবে কি সত্যিই? ইয়াহিয়া কি সত্যিই চলে গেল? কিন্তু কি দিয়ে গেল সে দেশবাসীকে? এমন গোপনে চলে যাবার অর্থ কি? এর অর্থ বুঝতে বেশি সময় লাগে নি। দেশবাসীর জন্য ইয়াহিয়ার অবদান মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই এদেশের মানুষকে বুক পেতে নিতে হয়েছিল।
ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু একটি বিবৃতি দিলেন। তাঁর প্রেস সেক্রেটারী সেটি পড়ে পড়লেন সাংবাদিকদের সামনে। এই বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদ জানালেন চট্টগ্রাম, রংপুর আর জয়দেবপুরের সাধারণ মানুষের ওপর সেনাবাহিনীর বর্বর হামলার। বললেন এই অবস্থাকে এভাবে চলতে দেওয়া যেতে পাওে না। চট্টগ্রাম থেকে তখন যে খবর এসে রাজধানীতে পৌঁছিয়াছিল তা যেমনই ভয়াবহ তেমনি উদ্বেগজনক। সোয়াত জাহাজ বোঝাই হয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসেছে অস্ত্র। সে অস্ত্র চট্টগ্রামবাসীরা নামাতে দেবে না তাদের মাটিতে। রাস্তায় রাস্তায় গড়ে উঠেছে ব্যারিকেড। প্রতিরোধ ভাঙ্গতে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেনাবাহিনী।
রাত তখন আটটার কিছু বেশী। বঙ্গবন্ধু বাইরের ঘরে বসে আলোচনায় ব্যস্ত। কোন জরুরী খবর নিয়ে ছুটে এলেন কর্নেল (বর্তমানে জেনারেল) ওসমানী, বঙ্গবন্ধু তাঁর সাথে কি আলোচনা করলেন। সারা মুখ তাঁর থমথমে হয়ে উঠলো। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানও তখন তাঁর পাশে। আলাপ সেরেই তাঁরা দ্রæত বেরিয়ে গেলেন। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়ী ফাঁকা হতে শুরু করেছে। সাংবাদিকরাও যে যার কাজে ছুটে গেছেন। রাত তখন নয়টার কিছু ওপরে। হাইকোর্টের মোড় এবং আরো কয়েকটি স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু গুলিগোলার শব্দ শোনা গেল। ঘনঘন টেলিফোন আসতে লাগলো সংবাদপত্র অফিসগুলিতে। সবারই একই প্রশ্ন সেনাবাহিনী নাকি বেরিয়ে পড়েছে? পাড়ায় পাড়ায় তখন শুরু হয়েছে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টির পালা। সর্বত্র এক আতংকিত জনরব- সেনাবাহিনী বেরিয়ে পড়েছে।
কে একজন টেলিফোনে জানালেন, সর্বাধিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ৯৬ গাড়ী ট্রাক ফোর্স ক্যান্টনমেন্ট থেকে শহরে ঢুকেছে। এর পরই টেলিফোন হয়ে গেল বিচ্ছিন্ন। সব যোগাযোগ বিছিন্ন।
রাত তখন বারোটা বাজে নি। হঠাৎ রাতের নিস্তদ্ধতা খান খান করে দিয়ে গর্জে উঠলেঅ মেশিনগান। আগুনে আগুনে লাল হয়ে গেল সারা আকাশ। চারদিক আলোকিত করে ছুটলো হানাদারদের রং-বেরঙের ম্যাগনিশিয়াম ফ্লাশ। ঘরে ঘরে উঠলেঅ হাহাকার। রাস্তায় রাস্তায় জমে উঠলো লাশের স্তুপ।
কিন্তু এর মধ্যেও গড়ে উঠলো প্রতিরোধ। হানাদারদের প্রতিরোধ করা হোল রাজারবাগে, পীলখানায়। ফলে রাজারবাগে পুলিস ব্যারাকে জ¦লে উঠলেঅ আগুন। সম্পূর্ণ ব্যারাকটিকে ছাই করে দিয়ে ভোর পর্যন্ত জ¦ললো সে আগুন। আগুন জ¦ললো বস্তিতে বস্তিতে।
এই রাতেই ওরা হানা দিল বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে। গোলার আঘাতে ক্ষতি সাধন করলো বাড়ীর। গ্রেফতার করলো বঙ্গবন্ধুকে।
সারারাত গোলাগুলীর শব্দের মধ্যে এক সময় পূর্বের আকাশ ফর্সা হয়ে এল। বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে ভেসে এল আজানের ধ্বনি। কিন্তু আজানের সে ধ্বনিকেও ছাপিয়ে উঠলো মেশিনগানের শব্দ। পঁচিশের বিভীষিকাময় রাত শেষ হোল। শুরু হলো ২৬শে মার্চের দিন। কিন্তু গুলিগোলার বিরাম নেই। সারা শহর তখন খা খা করছে। রাস্তায় সেনাবাহিনীর গাড়ী ছাড়া আর কিছু নেই। শোনা গেল সারা শহরে জারী করা হয়েছে কারফিউ।
লেখকঃ মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান, প্রকল্প পরিচালক, গণযোগাযোগ অধিদপ্তর।
Developed By Muktodhara Technology Limited