image

বাঁশখালীর লিচু চাষীদের হাসি, হয়না কখনও বাসি : এবারও বাম্পার ফলন

image

লিচুর জন্য প্রসিদ্ধ বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর। বাগানে গাছে গাছে ঝুলছে মধুমাস জৈষ্ঠ্যের রসালো ফল লিচু। পাকনা লিচু বাগান ছাড়াও সোভা পাচ্ছে বাড়ীর ছাদ বাগানেও। কালীপুরের পূর্ব পাহাড়ী এলাকায় খুব কম বসতঘরই আছে যাদের তিন-চারটা লিচু গাছ নেই। মৌসুমী এ লিচু প্রকৃতিতে যেমন সৌন্দর্য বিলায় তেমনি চাষীদের মুখে হাসি ফোটায়। এবারে বাঁশখালীতে লিচুর ব্যাপক ফলন হয়েছে। সম্প্রতি বাঁশখালীর অভ্যন্তরিণ হাট-বাজারে উঠতে শুরু করেছে বছরের সেরা রসালো ফল বাঁশখালীর কালীপুরের লিচু। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও পোকামাকড়ের তেমন আক্রমণ না থাকায় বাঁশখালীতে লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে দাবী উপজেলা কৃষি অফিসের।

মৌসুমের শুরুতেই বাজারে আসতে শুরু করেছে লিচু। রমজান মাস হওয়ায় অপরদিকে করোনার প্রভাবে সৃষ্টসংকটে দাম ভালো না পাওয়ায় হতাশায়য় ভোগছে বাগান মালিকরা। উপজেলার লিচু বাগানগুলোতে গিয়ে দেখা যায় গাছে গাছে থোকায় থোকায় পাকা লিচু ঝুলছে। উপজেলার পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালিপুর হয়ে বৈলছড়ি পর্যন্ত ৪-৫ কিলোমিটার পাহাড়ি এলাকাজুড়ে সড়কের পাশে, বাড়ির আঙ্গিনায়, পাহাড় ও লোকালয়ের লিচু বাগানে এখন শুধু লিচু আর লিচু। চলতি বছরে লিচুর বাম্পার ফলনে শুধুমাত্র বাঁশখালীতেই ১০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা দেখছে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক। তবে চলতি বছর লিচুর বাম্পার ফলন হওয়ার সাথে পবিত্র রমজান মাস থাকায় লিচু বাগানিরা অধিক লাভের আশা করলেও করোনা সঙ্কটে লিচু বিক্রি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন এমনটি জানান ওই কৃষিকর্মকর্তা।

বাঁশখালীতে উৎপাদিত লিচু স্থানীয় বাজারে চাহিদা মিটিয়ে দখল করে নেয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজার। কালিপুরের লিচুর কদর সারাদেশেই। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কালিপুর লিচুর জন্য বিখ্যাত যুগ যুগ ধরে। বৈলছড়ি, গুণাগরি, পুকুরিয়া, জঙ্গল জলদি, জঙ্গল চাম্বল সহ প্রায় প্রত্যেক  ইউনিয়নেই পাহাড়ি এলাকায় একই সাথে সমতলে লিচুর চাষ হয়ে আসছে বহুকাল থেকেই। বাণিজ্যিক ও ঘরোয়াভাবে উৎপাদিত এই লিচুর কদর দেশ জুড়েই। উপজেলার এ লিচু সৌদি আরব, কাতার, ওমান, মালয়েশিয়া সহ মধ্যপ্রাচ্যের মতো দেশেও প্যাকেট করে যাচ্ছে। বাঁশখালীর প্রবাসীরা তাদের মালিকের জন্য,  নিজেদের জন্য কালীপুরের রসালো নিয়ে যায়। অনেকেই তাদের প্রবাসী ছেলেদের জন্য এ লিচু পাঠানোর ব্যবস্থা করে থাকে নানা ভাবে।

জানা গেছে, বাঁশখালীর কালিপুরের প্রায় সাড়ে ৩০০ হেক্টরসহ পুরো উপজেলায় সাড়ে ৬০০ হেক্টর বাগানে স্থানীয় জাতের লিচু উৎপন্ন হয়। এ ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামে বাঁশখালীর কালিপুরে স্থানীয় জাত ছাড়াও রাজশাহী বোম্বে, বারি- ১, ২, ৩ ও ৪ এবং চায়না- ৩ জাতের লিচু বাগানো রয়েছে। বাঁশখালী কালিপুরের লিচু অনেকটা দিনাজপুরের লিচুর মতো হলেও এটি আকারে একটু ছোট। কিন্তু স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। তাই চট্টগ্রামবাসীর কাছে কালীপুরের লিচু বেশ স্বাদের ও প্রিয়।

বাঁশখালী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, 'প্রতি বছরই বাঁশখালীতে লিচুর ফলন বাড়ছে, পাহাড়ের ঝোপ পরিস্কার করে নতুন নতুন জায়গা সম্প্রসারণ করে গাছ লাগানো হচ্ছে। দিন দিন লিচু বাগানও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা উপজেলায় ২০১৫ সালে প্রায় ৫০ কোটি, ২০১৬ সালে ৬০ কোটি, ২০১৭ সালে ৭০ কোটি ২০১৮ সালে ৮০ কোটি টাকা, ২০১৯ সালে প্রায় ৯০ কোটি, ২০২০ সালে রেকর্ড সংখ্যক লিচু উৎপাদিত হয়েছে। এবার ১০০ কোটি টাকার উপরে লিচু বিক্রির সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

মৌসুমের একেবারে প্রথম দিকেই বাজারে পাওয়া যায় বলে কালিপুরের লিচুর খ্যাতির রেয়াজটাও কমেনা। এবার লিচু উৎপাদনে লক্ষ্য মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানান কালিপুরের লিচু চাষী মু. জমির উদ্দিন। সম্প্রতি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও রমজানের ফলে লিচুর দাম কম পাচ্ছে চাষীরা। ইদের পরেই আশানুরুপ দাম পাবে বলে ধারণা করছে চাষীরা। বর্তমানে খুচরা বাজারে শত প্রতি লিচু বিক্রি হচ্ছে ১৮০, ২০০, ২৫০ টাকা দরে। হাজারপ্রতি ১২শ লিচু পাইকারী বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২১শত থেকে ৩ হাজার টাকায়।

বাগান মালিক মিজানুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ' গত বছর উপজেলার চাঁদপুর থেকে জমি সহ ১০ গন্ডা পরিমান লিচু বাগান ৩০ লক্ষ টাকায় ক্রয় করি। এ বছর লিচুর ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে তুলেছি লিচু। সতেজ ও রসালো লিচুর জন্য বাঁশখালী বিখ্যাত। তবে তিনি করোনা সঙ্কটে লিচু বিক্রি নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন। বর্তমানে খুচরা বাজারে শত প্রতি লিচু বিক্রি হচ্ছে ১০০, ২০০, ২৫০ টাকা দরে। হাজারপ্রতি ১২শ লিচু পাইকারী বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২২শত থেকে ৩ হাজার টাকায়। বাঁশখালীতে বাজারে লিচু আসতে শুরু করছে কয়েকদিন হল।'

লিচুর পাইকারী ক্রেতা জমির উদ্দিন জানান, 'এখনো বাজারে বাণিজ্যিক লিচু পুরোদমে আসেনি। বাণিজ্যিক লিচু আসতে অন্তত ১ সপ্তাহ সময় লাগবে। তবে, শহরের পাইকারের সমাগম এখনো তেমন আসেনাই। করোনা সঙ্কটের কারণে লিচু বিক্রি নিয়ে বেশ সংশয়ে আছেন বাগান মালিকরা। করোনা ভাইরাসের কারণে আজ পর্যন্ত কোন পাইকার যোগাযোগ করেনি। ইদের পরপরই  পুরোপুরি লিচু বিক্রির ধুম পড়বে বলে জানান তিনি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু ছালেক প্রতিবেদককে বলেন, 'এবার চলতি মৌসুমের শুরু থেকে আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় মৌসুমি ফল আম, কাঁঠাল লিচুর ভালো ফলন হয়েছে। তবে মৌসুমী ফলের মধ্যে বাঁশখালীর কালীপুরের লিচু স্পেশাল একটি ফল। এখানে বাণিজ্যিকভাবে লিচুর চাষাবাদ হয়। এ বছর সাড়ে ৭ শত হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে লিচুর উৎপাদন ভালো হয়েছে। স্থানীয় বাজারে লিচু আসতে শুরু করেছে। তবে বাণিজ্যিক লিচু বাজারে আসতে সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। কালো বৈশখীর প্রভাব না পড়লে, বৃষ্টি না হলে লিচু ব্যবসায়ীরা প্রাকৃতিক সংকট কাটাতে পারবে। এতে বাগান মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। করোনা সঙ্কটকালে বাঁশখালী কালিপুরের লিচু পরিবহন ও বিপণন প্রসঙ্গে তিনি জানান, কৃষিজাত পণ্য পরিবহনে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কাজেই লিচু বিক্রি নিয়ে তেমন সমস্যা হবে না।'