image

সাঈদ খোকন-তাপস দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কমিউনিটি সেন্টারের নামকরণ? 

image

সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন রেখেছিলেন তাকেই কেন বার বার টার্গেট করা হয়? কেন?  কেন? এই কেন কেন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাভাবে ট্রল হচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান ও সাবেক দুই মেয়রের দ্বন্দ্ব কেন? শুধুই কি মেয়রের পদ হারানোর প্রতিহিংসা  না এর নেপথ্যে অন্য কোন কারণ লুকিয়ে আছে ? এ বিষয়ে পুরান ঢাকাসহ দেশবাসীর মাঝেও নানা গুজবের ডালপালা মেলছে।একজন যখন কঠিন আক্রমনাত্মক ভাষায় চ্যালেন্জ ছুড়ে দিচ্ছেন আরেকজন তখন আইনের দোহাইয়ে বিচারাধীন বা তদন্তাধীন বলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন।

আসলেই কি শুধু দূর্নীতিই কারণ, না এর নেপথ্যে অন্য কোন রাজনীতি আছে যা কেউই ফাঁস করছেন না?

কেন সাবেক ও বর্তমান দুই মেয়রের মধ্যে এই আক্রমনাত্মক ভাষার লড়াই? শুধু কি একজনের জায়গা আরেকজন নিয়েছেন, এটাই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণ? দুজনইতো একই দল আওয়ামীলীগের প্রার্থী। তবে কেন এতো আক্রোশ বা ক্ষোভ? বর্তমান মেয়রই বা কেন বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বিচারাধীন বা তদন্তাধীন বিষয় বলছেন ?

তবে বর্তমান মেয়রের অনুসারীরা মনে করেন ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস জাতির জনকের নাতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাতিজা। তার পরিবারের সাথে রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জড়িত। তার সঙ্গে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের তুলনাই চলে না।

সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে সাঈদ খোকনের নানা ছিলেন ৭১এ শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মাজেদ সরদার। আর সাঈদ খোকনের দূর্নীতির কাহিনি ফাঁস করেছে মার্কেট সমিতির নেতারা। সাঈদ খোকনের দূর্নীতির তদন্ত করছে দুদক। দুদকের আবেদনে আদালতের আদেশে ব্যাংক একাউন্ট ফ্রীজ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এমন শতশত নেতা-সাবেক মন্ত্রীর একাউন্ট ফ্রীজ হচ্ছে। তাই এ নিয়ে সাঈদ খোকন যা করেছেন, তা বারাবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নয় বলে বর্তমান মেয়রের অনুসারীরা মনে করেন।

বর্তমান মেয়রের ঘনিষ্ঠ একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান মেয়র মার্কেটের উন্নয়ন খাতে যে ফাইলেই  হাত দেন সাঈদ খোকনের অনিয়ম বের হয়ে আসে। বর্তমান মেয়র সিটি কর্পোরেশনের দূর্নীতি অনিয়মের লিকেজ বন্ধ করতে চান। তিনি ব্যক্তিগত লাভবান নয়, সিটি কর্পোরেশনকে আর্থিকভাবে লাভবান করতে চান। তাই আগের মেয়রের দুর্নীতি বের হচ্ছে বলেই তার গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।

এদিকে গত সপ্তাহে  ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের পুরান ঢাকার বর্তমান ২২(সাবেক ৫৮)নং ওয়ার্ড হাজারীবাগের কমিউনিটি সেন্টারের নামকরণ পরিবর্তন নিয়ে হাইকোর্টে একটি রীট হয়েছে। রীটে হাজারীবাগের খলিল সরদার কমিউনিটি সেন্টারের নাম পরিবর্তন করে হাজারীবাগ থানা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হেদায়েতুল ইসলামের নামে নামকরণ কে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে আদালত রুল জারি করেছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই খলিল সরদার কমিউনিটি সেন্টারের নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করেই সাঈদ খোকন-তাপসের মধ্যে বিরোধের সূচনা।

জানা গেছে, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য থাকাকালীন সাঈদ খোকন মেয়রের দায়িত্ব নেয়ার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান ২২নং ওয়ার্ডের হাজারীবাগ পার্ক সংলগ্ন খলিল সরদার কমিউনিটি সেন্টারের নাম পরিবর্তনে ডিও দেন। তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারিকুল ইসলাম সজিবের মাধ্যমে। ওয়ার্ড কাউন্সিলর সচিবের পিতা হেদায়েতুল ইসলাম হাজারীবাগ থানা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ওই সময় মেয়র সাঈদ খোকন সেন্টারের নাম পরিবর্তন করা যাবে না বলে জানিয়ে দেন এবং একনেকের প্রেরিত সিটি কর্পোরেশনের ফাইলে খলিল সরদার কমিউনিটি সেন্টার নাম রেখেই কমিউনিটি সেন্টারটি বহুতল ভবনের আধুনিকায়নের প্রকল্প একনেকের সভায় অনুমোদন করা হয়। এ-ও শোনা যায়, সাঈদ খোকন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার তাপসের ডিওর মূল্যায়ন না করে মন্তব্য করেছিলেন তিনি ঢাকার আট এমপির মেয়র। তাপসের উদ্দেশ্যে সাঈদ খোকন মন্তব্য করেছিলেন তিনিতো একটি এলাকার এমপি। এই বার্তাটি ততকালীন ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের কাছে পৌঁছে যায়। ওই সময় তাপস বিষয়টি নিয়ে কোন প্রতিক্রিয়াও দেখাননি। তবে সময়ের ব্যবধানে ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এখন ঢাকার মেয়র। তাও আবার সাঈদ খোকনকে হটিয়ে। তাই মেয়রের দায়িত্ব গ্রহনের পর ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস হাজারীবাগের খলিল সরদার কমিউনিটি সেন্টারের নাম পরিবর্তন করেন সিটি কর্পোরেশনের বোর্ড সভার মাধ্যমে। আদালতের রীটেও তা উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকাবাসীদের অনেকেই ধারণা করছেন, তিনি আট এমপি"র মেয়র আর তাপস একটি আসনের এমপি সাঈদ খোকনের এমন উক্তির জবাব তার আমলের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বর্তমান মেয়র ঢাকাবাসীর কাছে সাঈদ খোকনকে একজন দূর্নীতিবাজ হিসেবেই আইনী প্রক্রিয়ায় উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। যদিও এবিষয়ে কোন মেয়রই মন্তব্য করতে রাজী নন। সাঈদ খোকনের দাম্ভিকতা পূর্ণ আচরণ সংবাদ সম্মেলনে তার বডিল্যাংগুয়েজেও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে ঢাকাবাসীদের অনেকেই মনে করেন। তবে সিটি কর্পোরেশন ও পুরান ঢাকায় বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। তাই দুই মেয়র একই দল আওয়ামীলীগের হওয়া সত্বেও বিদায়ী মেয়র বর্তমান মেয়রেকে আক্রমনাত্মক ভাষায় প্রশ্ন তোলছেন, “কেন কেন শুধু তাকেই তাকেই টার্গেট করা হচ্ছে?“  তাই বর্তমান ও সাবেক মেয়রের ইগো প্রবলেমই দূর্নীতির পর্দা ফাঁসের আঙ্গুল একে অপরের দিকে। সাবেক সরব হলেও বর্তমান নিরব।

খলিল সর্দার কমিউনিটি সেন্টারের নাম পরিবর্তন প্রশ্নে হাইকোর্টের রুল : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরশেন(ডিএসসিসি) কর্তৃক রাজধানীর হাজারীবাগের ‘খলিল সর্দার কমিউনিটি সেন্টার’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘হাজী হেদায়েতুল ইসলাম সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র’ নামকরণ করা কেন বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। ডিএসসিসি’র মেয়রসহ ৭জনকে তিন সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। বিচারপতি এম.ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ ৩০জুন বুধবার এ আদেশ দিয়েছেন।

পুরান ঢাকার অন্যতম সর্দার, খলিল সর্দারের পুত্র ডিএসসিসি’র ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবকে কাউন্সিলর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবর রহমান মঞ্জুর করা এক রিট আবেদনে এ আদেশ দেন আদালত।

রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও অ্যাডভোকেট নুসরাত ইয়াসমিন সুমাইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।

রিট আবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে ওই কমিউনিটি সেন্টারটি ‘খলিল সর্দার কমিউনিটি সেন্টার’ নামেই পরিচিত ছিল। কিন্তু চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আগের নাম পরিবর্তন করে হাজারীবাগ আওয়ামীলীগের প্রথম সভাপতি ‘হাজী হেদায়েতুল ইসলামের নামে নামকরণ করা হয়।

এদিকে পুরান ঢাকার হাজারীবাগের খলিল সরদার কমিউনিটি সেন্টারের নাম পরিবর্তন নিয়ে ঢাকাবাসীর মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, বৃটিশ শাসনামল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত পুরান ঢাকায় বহু সরদারদের নামে রাস্তা, পার্ক, কমিউনিটি সেন্টার, মাতৃসদন কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বহু স্থাপনার নাম রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ঢাকার উন্নয়ন, সামাজিক অবদানে তাদের নামে এই স্থাপনাগুলোর নামকরণ করা হয় সিটি কর্পোরেশনের বোর্ড সভার মাধ্যমেই। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা নেই।

ঢাকাবাসীর মতে হাজারীবাগের এই কমিউনিটি সেন্টারটি ১৯৬৪ সালে নির্মিত। ওই সময় খলিল সরদার হাজারীবাগের চেয়ারম্যান থাকাকালেই এই এলাকায় এই কমিউনিটি সেন্টারটি নির্মাণ করা হলেও এরশাদ সরকারের শাসনামলে এই সেন্টারের নাম “খলিল সরদার কমিউনিটি সেন্টার“ রাখা হয়। এরপর থেকে হাজারীবাগ খলিল সরদার কমিউনিটি সেন্টার হিসেবেই পরিচিতি পেয়ে আসছিলো।

সরদার পরিবারের পুরনো বাড়ি মনেশ্বর রোডে খলিল সরদারের নামে একটি মসজিদ আছে। ঢাকায় পাকিস্তান আমল থেকেই মসজিদটি খলিল সরদার মসজিদ নামে পরিচিত। এই মসজিদটি সরদার পরিবারের সদস্যরা পারিবারিক ভাবেই প্রতিষ্ঠা করেছেন।স্থানীয় এলাকাবাসীর মতে, হাজারীবাগে আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা হেদায়েতুল ইসলামের নামে প্রয়োজনে কালু নগরে আরও একটি নতুন কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হলে নাম নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হতো না।