image

পবিত্র রমযান হোক করোনা থেকে পরিত্রাণের মাস

image

সুপ্রিয় এলাকাবাসী, 

সবার প্রতি রইল আমার সশ্রদ্ধ সালাম। আসসালামু আলাইকুম, মাহে রমজানের মোবারকবাদ। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে মাহে রমজান আমাদের সামনে রহমতের বাণী নিয়ে হাজির হয়েছে। মহান রবের দরবারে অশেষ শোকরিয়া। বিগত রমজানে একসাথে নামাজ, ইফতারসহ সকল ধর্মীয় আর সামজিক কাজে আমাদের সাথে ছিল এমন অনেক আপনজন আজ আমাদের মাঝে নাই। তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাগ যেন তাদের জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করেন - আমিন। সেই সাথে আমাদের কবরবাসী মা, বাবা, আত্মীয় স্বজনসহ সকল কবরবাসীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

ইসলামের মূলভিত্তির মধ্যে পবিত্র রমজান অনেক তাৎপর্যপূর্ণ এবং ধর্মীয় মহান একটি ভিত্তি। এ সম্পর্কে পবিত্র মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বর্ণিত আছে 'হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেমন ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর । যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।'

পবিত্র হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, 'রোজাদারের জন্য প্রতিদিন জান্নাতকে সজ্জিত করা হয়।'

বিশ্বব্যাপী করোনা সমস্যা আমাদের ব্যক্তি, অর্থনৈতিক, সামাজিক জীবনকে প্রায় বিপন্ন করে দিয়েছে। গতবছরের মার্চ মাস থেকে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের উপর দিয়ে এক অগ্নিপরীক্ষা বয়েই চলছে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে এই পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জিং করে আমাদের নীরব আহাজারির দিনাতিপাত হচ্ছে। বিগত কয়েকদিন থেকে হঠাৎ আমাদের দেশে এই করোনার প্রার্দুভাব ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। এই সময়ের করোনা ভাইরাসের সবচেয়ে কঠিন রূপ হলো দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট, যার প্রধান আত্মঘাতী ধরণ হলো করোনায় আক্রান্ত হওয়া মাত্র আমাদের শরীরের ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করা । যা সুস্থ মানুষ একবার চিন্তা করলেই পৃথিবীটা অমানিশার চাদরে ঢাকা। বিগত সময়ের  করোনার আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তির লক্ষণে জ্বর, সর্দি, কাশি থাকলেও বর্তমান সংক্রমণে সম্পূর্ণ আলাদা।

গবেষণায় বলা হচ্ছে,  দেশে বর্তমান আক্রান্ত রোগীর ধরণে ৭০% আফ্রিকান ভারিয়েন্ট পাওয়া যাচ্ছে। আর এ ভ্যারিয়েন্টের লক্ষণ দেখা দিয়েছে নতুনত্ব । এই সংক্রমণে সবচে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ। নতুন ভ্যারিয়েন্টের প্রধান লক্ষনসমূহ হলো  ডায়রিয়া, মাথাব্যথা, কনজিভাইটিভ ( চোখ লাল)  হওয়া ইত্যাদি। এমন ও হচ্ছে অধিকাংশ রোগীর শরীরে কোন লক্ষণ ছাড়া এ ভাইরাস সায়লেন্টলি  সংক্রমিত হচ্ছে এবং টেস্ট করার পর বুঝা যায় এই নীরব ভাইরাস ফুসফুসের ব্যাপক ক্ষতি করছে। পূর্বে রোগীর  ফুসফুস আক্রান্ত হলে যখন অক্সিজেন লেভেল কমে যেত এর মাধ্যমে বুঝতে সক্ষম হতো রোগী সঙ্কটাবস্থায় পতিত। কিন্তু এসময়ে সাইলেন্টলি ফুসফুস আক্রান্ত হচ্ছে এবং রোগী মৃত্যুমুখে ঢলে পড়ছে। এর কারনে এখন প্রায় রোগীরই ভেন্টিলেশনের দরকার হচ্ছে,  যা গতবার ছিল না। এর ফলে ICU সাপোর্ট দিতেও মেডিকেলগুলো হিমশিমে রয়েছে।  কারণ, আমাদের চাহিদার তুলনায়  ICU জোগান অনেক নগন্য।

বিগত কয়েকদিনে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আর সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখলাম,  একদিকে সরকারি /বেসরকারি মেডিকেলগুলোতে এক নীরব মৃত্যুর মিছিল চলছে, অন্যদিকে গোরস্থানে গণকবর খোঁড়া শুরু হয়েছে।  অঢেল টাকা পয়সার মালিক হয়েও রোগীর জন্য একটা ICU ম্যানেজ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মেডিকেলগুলোতে ICU বেড খালি নেই৷ নেই কোন রোগী ধারণের সক্ষমতা। সুতরাং এই বিষয়গুলো আমাদের অনুধাবন করে সচেতন হওয়াটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। 

বিগত রমজানেও আমাদের দেশে লকডাউন ছিল, ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। এই রমজানেও আমাদের সামনে একই পরিস্থিতি মুখোমুখি করতে হচ্ছে।  গতবারের চেয়ে এই সময়ের পরিস্থিতি নাজুক,  হয়তো এই কারণে এই লকডাউনে আমাদের কঠিন জীবনযাপন করতে হবে। তবে আমাদের জীবন ও জীবিকা তো করোনা ভাইরাসের দুঃখ বুঝবেনা। আমরা কৃষিপ্রধান এলাকার মানুষ, সাথে কমবেশি সবাই মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করা আশরাফুল মাখলুকাত।

আমার জানা মতে, গতবছর আমাদের ইউনুছখালী - মাইজপাড়ার লকডাউন সবচেয়ে বেশি শান্তি আর সহযোগিতার মাধ্যমে পালিত হয়েছে। যা আমাদের ভ্রাতৃত্বের এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সজাগ করেছে। আশা করছি এইবারেও এই ধরণের পরিবেশ বজায় থাকবে। । এই প্রেক্ষাপটে অামার ব্যক্তিগত কিছু অভিমত সকলের কল্যাণার্থে তুলে ধরলাম। আপনাদের পরামর্শ বা আদেশ করার যোগ্যতা বা ধৃষ্টতা এখনো অামি অধমের হয়নি৷ তাই ব্যক্তিগত কিছু অভিমত তুলে ধরলাম।

১. সর্বপ্রথমে অনুরোধ করবো কিছু অপসংস্কৃতি হতে বের হয়ে আসতে হবে। যেমন :  করোনা ভাইরাস মুসলমান, গরিব, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর  উপর আক্রমণ করবে না - এই অন্ধবিশ্বাস থেকে বের হয়ে আসতে হবে। একবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি মেডিকেলের সামনে সময় কাটিয়ে আসেন, তখন বুঝা যাবে আসলেই করোনার প্রভাব কোথায়।

২. এই করোনা মোকাবিলায় সরকার যে নিয়মকানুন আমাদের উপর জারি করেছে, এই বিষয়গুলোতে সবাইলে শ্রদ্ধাশীল  হতে হবে। বিশেষকরে মাস্ক পরিধানে কেউ অবহেলা করবেন না। জীবন ও জীবিকার তাগিদে জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হলেও অবশ্যই সার্জিক্যাল মাস্ক পরিধান করবেন। 

৩. অযথা বাইরে ঘুরাফেরা থেকে শতভাগ বিরত থাকুন। চলাফেরায় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন। ১মিঃ দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করুন। স্বাস্থ বিশেষজ্ঞদের মতে, জটলা হয়ে বা অন্যকারো সংস্পর্শে ১০ মিনিট  মুখোমুখি থাকলে করোনায় অাক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা বেশি।

৪. হাঁচি, কাশি দেওয়ার সময় অবশ্যই শিষ্টাচার (কনুই দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা,  টিস্যু বা রোমালে হাঁচি কাশি দেওয়ার পর নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা) মানতে হবে৷ প্রতিবার বাসায় ঢুকার আগে সেনিটাইজ করা অথবা সাবান দিয়ে হাত ধোঁয়া অতীব জরুরি। হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করার জন্য সচেতনমহল সহ জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব নেওয়া দরকার।

৫. এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধর্মীয় গুরুদের দায়িত্ব অনেকবেশি। মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোড়ায় পূঙ্খানুপুঙ্খভাবে করোনা সচেতনায় ডিকলারেশন দরকার।  জুমার খুতবায় করোনা সচেতনতা সহ সবকিছু বিষয়ে মুসল্লীদের এ বিষয়ে এলার্ম দিতে হবে।ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি বাংলাদেশের প্রত্যেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে। মসজিদে অবশ্যই সার্জিক্যাল মাস্ক এবং ব্যক্তিগত জায়নামাজ নিয়ে যাবেন। 

৬. করোনার ঢেউ যেহেতু যাচ্ছে,  যেকোনো ব্যক্তি আক্রমণ হতে পারে। আপনার স্বাভাবিক দিনকাল যদি অস্বাভাবিক হয় অর্থাৎ উপরোক্ত কোন অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা গেলে   অবহেলা না করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি দেওয়া নাম্বারে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ট্রিটমেন্ট নিবেন এবং ডাক্তার যদি স্যাম্পল দেওয়ার জন্য রেফার করে অনায়সে স্যাম্পল দেবেন।

৭. এলাকায় কেউ যদি করোনায় আক্রান্ত হয় সামাজিকভাবে তাকে অবহেলা বা কুৎসা রটনা করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকবেন। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তার জন্য ডাক্তারী সেবা সহ যা কিছু প্রয়োজন পাশে দাঁড়াবেন। 

৮. গতবছর পুরো ইউনিয়নব্যাপী অনেক স্বেচ্ছাসেবক ভাইয়েরা সচেতনতামূলক কাজে  মাঠে ছিল। মাস্ক বিতরণ, মাইকিং ভাইরাস বিধ্বংসী স্প্রে ছিটিয়েছিল - যা ভূয়সী প্রশংসার দাবিদার।  এইবারে যদি কোন স্বেচ্ছাসেবক মাঠ পর্যায়ে কাজ করে তাদের প্রতি সহনশীল আচরণ করবেন। মনে রাখবেন তারা কোনরকম আর্থিক সম্মানী বা শর্ত ছাড়াই এলাকার স্বার্থে কাজ করে। নিজে বেশি সেরা মনে করে তাদের সমালোচনা বা রোষানলে ফেলবেন না। ব্যক্তির বাজে মন্তব্য যেমন স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে নিরুৎসাহিত করবে  ঠিক তেমনি এলাকা ঝুঁকিতে পড়বে। স্বেচ্ছাসেবকের কাজ আপনার বিরক্তিকর মনে হলে তাদের শলাপরামর্শ দিবেন, প্রয়োজনে আপনিসহ তাদের সাথে কাজ করবেন। স্বশরীরে কাজ করলেই বুঝতে পারবেন একাজের মানসিক শান্তি কতটুকু সেটা।

৯. গত রমজানে আমাদের এলাকায় সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করেছিল। কমবেশি সবাই একে-অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এলাকার বিত্তবানরা সমাজের  উর্পাজনক্ষম পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিল। যা আমাদের নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছিল। আশা করছি এইবার ও সাধ্যমতো সবাই এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগণের পাশে দাঁড়াবেন।  হোক সে সহযোগিতা গোপনে বা প্রকাশ্যে। সাদকায়ে জারিয়ায় যারা নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন, মহান আল্লাহ তার প্রতি সদয় হবেন।  তাই জনপ্রতিনিধি,  বিত্তবান, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সামাজিক - রাজনৈতিক সংগঠনের সবাইকে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহবান করছি।

১০. ত্রাণের সুষম বণ্টনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। প্রকৃত অসহায়, দারিদ্র্য, এতিম, কর্মহীন, বিধবা, শারীরিক প্রতিবন্ধী, উপার্জনক্ষম শ্রেণীর প্রতি আমাদের বিশেষ নজর রাখতে হবে৷ এ বিষয়ে প্রশাসনিক দায়িত্বশীল সমাজ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সচেতন সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আশা করছি সুষম বণ্টনের মাধ্যমে এই স্থবিরতা স্বাভাবিক জীবনযাপনে আমাদের নতুন জীবনের সন্ধান দিবে।

সর্বশেষ এলাকাকে কিভাবে নিরাপদ, শান্তিপ্রিয় এবং সকলের স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপযোগী করা যায় সে বিষয়ে গুণীজন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষিত সমাজকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এলাকার কোন পরিবার যেন নীরব আহাজারিতে দিনাতিপাত না করে সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে। ইনশাআল্লাহ আমাদের পারস্পরিক সহানুভূতি, দায়বদ্ধতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে এই করোনার প্রকট ঢেউ আমরা মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। সকলের সুস্বাস্থ্য আর নিরাপদ জীবন কামনা করছি। মাস্ক পরুন, নিরাপদ থাকুন।

লেখক : এম. মনসুর আবেদীন, প্রচার সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।