image

পটিয়া হাইদগাঁও গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ আলী আহামদ পরিবারের মানবেতর জীবন যাপন

image

চট্টগ্রামের পটিয়ার হাইদগাঁও ইউনিয়নের শহীদ আলী আহামদ একজন মুক্তিযোদ্ধা। প্রাণও গেছে দেশের স্বার্থে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছরেও এ পরিবার পায়নি কোন রাষ্ট্রীয় সাহায্য সহযোগিতা কিংবা সুবিধা। আর কত অপক্ষোর প্রহর গুনতে হবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলী আহামদের পরিবারের। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে অদ্যাবদি পর্যন্ত যখন তার সহযোদ্ধারা বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিসহ নানা সুবিধাদি পেলেও বঞ্চিত রয়েছে এ পরিবারটি।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যতটুকু প্রমাণ থাকলে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া যায় তার সম্পূর্ণটাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর পরও কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তার চোখের সামনে দিয়ে পটিয়া উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন অনেকেই। অথচ ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনে পাকিস্তানী হানাদার, রাজাকার, আলবদর বাহিনীদের মুর্তিমান আতংক আলী আহমদ বার বার হচ্ছেন বঞ্চিত। ফলে আলী আহামদের রেখে যাওয়া সন্তানদের প্রশ্ন আমার বাবার কি প্রাপ্য সম্মানটুকু পাব না?

তার পুরো নাম আলী আহমদ। তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের মৃত হামিদ আলীর সন্তান। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক সাময়িক সনদ, বেসামরিক গেজেটে তথ্য থাকা সত্ত্বেও মিলেনি এ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও প্রাপ্য সম্মানটুকুও। এ নিয়ে সবার মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সুত্রে জানা যায়, উপজেলা ভিত্তিক মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় পটিয়া হাইদগাঁও ইউনিয়নে ১১ নং ক্রমিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আলী আহামদ এর নাম রয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে ১নং সেক্টরে অংশ গ্রহন করেন। যার সনদ নং:ম-৭৮৮৫৩। স্মারক নং:মু.বি.ম/সা/চট্টগ্রাম, প্র:৩/১৮/২০০২/২১৫১ তারিখ ০৭/০৩/২০০৫ ইংরেজী। লাল মুক্তিবার্তার ক্রমিক নং-২০২০৪০১৮৪, গেজেটের পৃষ্টা ও তারিখ:১০২৮৭, নভেম্বর ২২, ২০০৫। গেজেট নং-২৮৫১। তার জন্ম তারিখ-০৪/০৩/১৯৪৩ইং। স্মরনিকা-৭১ এর ক্রমিক নং ১৮৪ তে আলী আহামদ এর নাম আছে। এছাড়াও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কেন্দ্রীয় সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আলী আহামদের নাম রয়েছে। যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ৯ই নভেম্বর তিনি পাক হানাদার বাহিনীদের কাছে শহীদ হন। সবকিছু থাকার পরও কোন লাভ হয়নি। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সকল ডকুমেন্ট পৌঁছে দেয়ার পরও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি আলী আহামদের। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও কোন ধরনের সুবিধা পাননি তার পরিবার। মুক্তিযোদ্ধা আলী আহামদ তার জীবদ্দশায় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পায়নি। তাঁর স্ত্রী শহরবানু গত তিন বছর আগে তার স্বামী একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও স্বীকৃতি না পাওয়ার শোকে মাতম হয়ে মারা যান। বর্তমানে তার রেখে যাওয়া সন্তানরা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছে। ভাংগা বেড়ার ছোট্ট একটি ঘরে বসবাস করেন তার সন্তানেরা।

জানা যায়, আলী আহামদের এক স্ত্রী চার ছেলে ও এক মেয়ে। ১০ বছর পূর্বে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলী আহামদের স্ত্রী মারা যান। বর্তমানে বড় ছেলে শামশুল আলম কৃষি কাজ করে, নুরুল আলম পানের দোকান করে, মাহবুবুল আলম বনের কাট কেটে, ছোট ছেলে আবু আলম মজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। ছোট মেয়ে ছেনোয়ারা বেগমকে একই এলাকায় বিয়ে দেন। আলী আহামদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি না পাওয়ায় সরকারী সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে পরিবারটি আজ অনাহারে অর্দাহারে জীবন কাটাচ্ছে। শুধুমাত্র জাতীয় দিবসগুলোতে সংবর্ধনা নিয়েই তাদের শান্ত থাকতে হয়।

ছোট ছেলে আবু আলম বলেন, আমার বাবা পটিয়া উপজেলার তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আ.কম. শামসুজ্জমান চৌধুরীর নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহন করে ভারত সীমান্তের নাপাতন নামক স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে নিহত হন। আমরা সকল দপ্তরে কাগজপত্রগুলো জমা দিয়েছি। আমাদের ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মহিউদ্দীন চৌধুরীর কাছে বারবার ধরণা দিয়েছি। তিনি আমাদের কাছে টাকা দাবি করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯২ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলী আহামদের পরিবার হিসেবে হাইদগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুদ্দিন খালেদ বাবুলসহ নেতৃবৃন্দ ২৬ই মার্চ ও ২১ই ফেব্রুয়ারী এবং ১৬ই ডিসেম্ভর জাতীয় দিবসগুলোতে তার স্ত্রী শহর বানুকে হাইদগাঁও স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সম্মাননাসহ নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় পটিয়ার এমপি হুইপ সামশুল হক চৌধুরী সরকারী অর্থায়নে উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন নির্মিত স্মৃতিসৌধের নাম ফলকেও দেখা যায় শহীদ আলী আহামদের নাম। ৫ বছর পূর্বে হাইদগাঁও মাইজপাড়ায় একটি অনুষ্ঠানে গেলে ঐ সময় স্থানীয় এলাকাবাসী শহীদ আলী আহামদের বিষয়টি জানালে মাইজপাড়া আইয়ুব আলীর সড়কটির নাম পরিবর্তন করে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলী আহামদের নামে নামকরণের জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। কিন্তু এ নির্দেশনা এখনো পর্যন্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধা বান্ধব সরকার হলেও একটি কুচক্রি মহলের তৎপরতায় তার পরিবারের সদস্যরা সরকারী সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান।

বড় ছেলে শামশুল আলম ক্ষোভের সাথে জানান, ১৯৭১ সালে দেশ মাতৃকার টানে ৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষন শোনার পর নানান বাধা পায়ে ঠেলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও আমার বাবা যুদ্ধে চলে যায়। আমার বাবার যৌবনের সবটুকু দিয়ে যুদ্ধ করেছেন স্বাধীনতার জন্য। আমরা তার পুরো পরিবার আজ খেয়ে না খেয়ে একটি ভাঙ্গা ছোট্ট ঘরে বাস করছি। ঘরটি যেকোন মূহুর্তে ভেংগে পড়তে পারে। টাকার অভাবে ভাঙ্গা ঘর মেরামত করতে পারছি না। আমরা মুক্তিযোদ্ধা বাবার সন্তান হিসেবে সরকারের কাছে আমাদের একটায় দাবি আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যেন স্বীকৃতি পায়।

এবিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা গোলাম কিবরিয়া বাবুলের সাথে কথা হলে তিনি জানান, আলী আহামদ একজন প্রকৃত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু তাঁর পরিবার কেন সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত তা আমার জানা নেই। এব্যাপারে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলী আহামদের মুক্তিযোদ্ধা চলাকালীন গ্রুপ কমান্ডার পটিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আ.ক.ম শামসুজ্জমান চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আলী আহামদ আমার গ্রুপে থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল। সেএকজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধক্ষেত্রেই তিনি শহীদ হন।