শিরোনাম
মোঃ কামরুল ইসলাম মোস্তফা, চন্দনাইশ প্রতিনিধি | ১৬:৩৪, জুন ৩০, ২০২১
মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন আশ্রয়ণ প্রকল্প ২-এর আওতায় হতদরিদ্র, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে গৃহায়ণ নিশ্চিত করার লক্ষে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে ''আশ্রয়ণের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার" এই শ্লোগানে গত ২৩ জানুয়ারি সারা দেশে ৬৯ হাজার ৮শ ৪টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ পাকা ঘর উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সারা দেশের সঙ্গে চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্ভোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গত ২৩ জানুয়ারি (শনিবার) সকালে চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে উপকারভোগীদের কাছে ঘরের চাবি হস্তান্তরের মাধ্যমে মালিকানা বুঝিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ঘরের চাবি ও কাগজপত্র নেয়ার পর অধিকাংশ পরিবারই আর সেখানে ওঠেননি। কেউ কেউ উঠলেও কিছুদিন থাকার পর আবার চলে গেছেন। কেউ কেউ আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিয়মিত আসা-যাওয়া করলেও পরিবার নিয়ে রাত্রিযাপন করেন না।
মঙ্গলবার (২৯জুন) বিকালে হাশিমপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, ১৪ টি ব্যারাকের ৭০ টি ঘরের মধ্যে ৪০টি ঘরে মানুষ বসবাস করছেন। বাকি ৩০টি ঘরেই ঝুলছে তালা। প্রতিটি ব্যারাকে ৫টি ঘর। এর মধ্যে ১নম্বর ব্যারাকে ১টি, ২নম্বর ব্যারাকে ১টি, ৩নম্বর ব্যারাকে ৩টি, ৪নম্বর ব্যারাকে ৩টি, ৫নম্বর ব্যারাকে ২টি, ৬নম্বর ব্যারাকে ১টি, ৭নম্বর ব্যারাকে ২টি, ৮নম্বর ব্যারাকে ৩টি, ৯নম্বর ব্যারাকে ১টি, ১০নম্বর ব্যারাকে ২টি, ১১নম্বর ব্যারাকে ২টি, ১২নম্বর ব্যারাকে ২টি, ১৩নম্বর ব্যারাকে ৪টি, ১৪নম্বর ব্যারাকে ৩টি ঘর তালাবদ্ধ দেখা গেছে। তালাবদ্ধ ঘরগুলোর নম্বর যথাক্রমে- ২, ৭, ১১, ১২, ১৩, ১৫, ১৬, ১৭, ২১, ২৪, ৩০, ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৯, ৪৩, ৪৯, ৫০, ৫৩, ৫৫, ৫৭, ৬০, ৬১, ৬৩, ৬৪, ৬৫, ৬৭, ৬৮, ৭০। খোলা থাকা ৪০টি ঘরের মধ্যে কয়েকটি ঘরে নামমাত্র আসবাবপত্র দেখা গেলেও রান্নাকরার হাড়ি-পাতিল ও থালাবাসন দেখা যায়নি।
ঘর বরাদ্দ পেয়েও বসবাস না করা সম্পর্কে তালাবদ্ধ ঘরগুলোর উপকারভোগী বেশ কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান হাশিমপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আশেপাশে কাজের কোনো সুযোগ নেই। যাতায়াতের ব্যবস্থাও নাজুক। ছয় মাসেও দেয়া হয়নি বিদ্যুৎ সংযোগ। সুপেয় পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশন, চোরের উপদ্রবসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে তারা তালা ঝুলিয়ে চলে গেছেন তাদের আগের বাসস্থানে।
এরমধ্যে ৭নম্বর ব্যারাকে ৩৫ নম্বর ঘরের উপকারভোগী দোহাজারী পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের মহাজন বাড়ির মৃত উপেন্দ্র মল্লিকের ছেলে বয়োবৃদ্ধ সুকুমার মল্লিক বলেছেন, "৭০ টি ঘরের মধ্যে ৬৯টি ঘরের বাসিন্দা মুসলিম। হিন্দু ধর্মাবলম্বী একমাত্র পরিবার হওয়ায় তিনি ওই আশ্রয়ণে থাকবেন না। ঘর বাতিলের জন্য তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে আবেদন করেছেন জানিয়েছেন তিনি। অপরদিকে ৩নম্বর ব্যারাকে ১৩নম্বর ঘরের উপকারভোগী বরকল আব্বাস ফকির বাড়ির মাদ্রাসা শিক্ষক আহাম্মদ হোসেন বলেন, ''আমি ভেবেছিলাম বরকলে যে পাঁচটি ঘর তৈরী হচ্ছে আমাকে সেখানে ঘর বরাদ্দ দেয়া হবে। হাশিমপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে যৌথ টয়লেট ও গোসলখানা হওয়ায় আমার পর্দানশিন স্ত্রী ও মেয়েদের পর্দার খেলাপ হবে তাই আমি সেখানে যাইনি।"
''ঘর বরাদ্দ পেয়েও আশ্রয়ণ প্রকল্পে না থাকা প্রসঙ্গে ১৪ নম্বর ব্যারাকে ৭০নম্বর ঘরের উপকারভোগী ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের পূর্ব ধোপাছড়ি এলাকার আবু তাহেরের ছেলে আবু তৈয়্যব বলেন, "আমি কোরবান উপলক্ষে গরু লালন-পালন করছি। গরু বিক্রি করা শেষে কোরবানের পর থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করবো।"
১২নম্বর ব্যারাকে ৬০ নম্বর ঘরের উপকারভোগী হাশিমপুর ৩নং ওয়ার্ডের মধ্যম হাশিমপুর এলাকার মৃত মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর মেয়ে তালাকপ্রাপ্তা আফরোজা বায়তুন নূর চৌধুরী বলেন, "বিদ্যুৎ না থাকায় বখাটেরা উত্যক্ত করার ফলে ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুই দিন অবস্থান করে চলে এসেছি। বিষয়টি তৎকালীন এসিল্যান্ডকে জানিয়েছি।"
৪নম্বর ব্যারাকে ১৬নম্বর ঘরের উপকারভোগী চন্দনাইশ পৌরসভার গাছবাড়িয়া এলাকার মৃত আব্দুল মুবিনের ছেলে মো. আবুল কাশেম বলেন, ''আমার স্ত্রী হার্টের রোগী। আশ্রয়ণ প্রকল্পে বিদ্যুৎ না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। বর্তমানে ভাড়া বাসায় থাকি। বিদ্যুৎ সংযোগ দিলে সেখানে চলে যাবো।"
৯নম্বর ব্যারাকের ৪৩নম্বর ঘরের উপকারভোগী হাশিমপুর ৭নং ওয়ার্ডের আদর্শগ্রাম এলাকার কামরু নাহারের স্বামী মো. বাছা মিয়া বলেন, ''কোরবান উপলক্ষে গরু লালন-পালন করছি। আশ্রয়ণ প্রকল্পে গরু পালনের সুযোগ না থাকায় আদর্শ গ্রামে শ্বশুর বাড়িতে থাকি। কোরবানির গরু বিক্রি করে ঈদের পর আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাবো।''
৮নম্বর ব্যারাকে ৩৯ নম্বর ঘরের উপকারভোগী হাশিমপুর ৭নং ওয়ার্ডের মৃত মনশি মিয়ার ছেলে ছগির আহমদ বলেন, ''আমার ৭জন মেয়ের মধ্যে ৪জনকে বিয়ে দিছি। বর্তমানে তিনটা মেয়ে বিবাহের উপযুক্ত এবং লেখাপড়া করছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিরাপত্তা না থাকায় সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করছি না। তবে নিয়মিত সেখানে আসা-যাওয়া করি। বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হলে সেখানে থাকবো।"
১নম্বর ব্যারাকে ২নম্বর ঘরের উপকারভোগী কাঞ্চননগর ৭নং ওয়ার্ডের সেলিনা আক্তারের স্বামী মো. হোসেন বলেন, ''গত রমজান মাসে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ছিলাম। বিদ্যুৎ না থাকায় খুব কষ্টে বসবাস করেছি। বর্তমানে পেয়ারা ও কাঁঠাল বাগান দেখা-শোনা করছি। পেয়ারা ও কাঁঠাল বিক্রি শেষ হলে পুনরায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করবো।"
৬নম্বর ব্যারাকে ৩০ নম্বর ঘরের উপকারভোগী সাতবাড়িয়া ৪নং ওয়ার্ডের ফজল আহমদের ছেলে আনোয়ার মিয়া বলেন, "আমার ছেলের অসুস্থতার কারনে তাকে নিয়ে প্রায় দুই মাস মেডিকেলে আসা-যাওয়া করছি। তাছাড়া তিনটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। দুইটার ঋণ পরিশোধ করলেও কারিতাসের ঋণ এখনো শোধ হয়নি। ঋণের কিস্তির মেয়াদ শেষ হলে আশ্রয়ণ প্রকল্পে চলে যাবো।"
৩নম্বর ব্যারাকে ১১নম্বর ঘরের উপকারভোগী বরকল কানাইমাদারী এলাকার মৃত মো. কাশেমের স্ত্রী শাহনাজ বেগমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার পুত্রবধূ মায়মূনা আক্তার সানজু জানান, "বিদ্যুৎ না থাকায় বাচ্চা কান্নাকাটি করে। তাছাড়া আমার শাশুড়ী অসুস্থ মানুষ। ফ্যানের বাতাস না পেলে তার অসুস্থতা আরো বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ সংযোগ দিলে আমরা আশ্রয়ণ কেন্দ্রে উঠবো।"
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মো. সেলিম বলেন, "এখানে খাবার পানির খুব সমস্যা। ৭০টি পরিবারের জন্য ১৪টি টিউবওয়েলের মধ্যে ১১টি নষ্ট। টিউবওয়েল নষ্ট থাকায় মানুষের গোসল, থালা-বাসন ধোয়া, মাছ-সবজি ধোয়ার সময় লাইন ধরতে হয়। তাছাড়া ৫টি পরিবারের জন্য দুইটি টয়লেট ও একটি গোসলখানা পর্যাপ্ত নয়। গোসল করতে গেলে আমাদের মহিলাদের সমস্যা হয়।"
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, "ছয় মাস হয়ে গেছে এখানে এসেছি। এখনও বিদ্যুৎ পাইনি। গরমে বাচ্চা কান্নাকাটি করে। রাতের অন্ধকারে ভুতুরে পরিবেশ বিরাজ করে। বিদ্যুৎ ছাড়া কতটা কষ্টে আছি আমরাই জানি।"
পারুল আক্তার বলেন, "এখানে রাস্তাঘাট ভালো না, মানুষের যাতায়াত নেই। যে কারণে কাজও নেই। আমার স্বামী অনেক দূরে গিয়ে যা কাজ পায় তাই করে। অনেক কষ্ট করে চলতে হচ্ছে। একটা ঘর পেলেও ছেলে-মেয়েদের নিয়ে প্রায় না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। এভাবে আর বেশিদিন থাকা সম্ভব না। অন্যদের মতো আমাদেরও চলে যেতে হবে।"
নজরুল বলেন, "এখানে অনেক পরিবার এসে আবার চলে গেছে। কারণ এখানে অনেক সমস্যা। বাজার করতে যেতে হয় প্রায় তিন মাইল দূরের বাগিচাহাট অথবা খানহাট। এতে যাওয়া-আসায় জনপ্রতি ১২০ টাকা খরচ হয়।"
মোহা. হোসেন বলেন, "বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খুঁটি এবং ক্যাবল টানানো হলেও এখনো সংযোগ দেয়া হয়নি। মিটারের জন্য বিদ্যুৎ অফিসে ৫শ ৬৫ টাকা জমা দিয়েছি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংযোগ দেয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।"
এব্যাপারে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে পল্লী বিদ্যুৎ চন্দনাইশের ডিজিএম আবু সুফিয়ান বলেন, "হাশিমপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে গত ২০ দিন আগে আমরা বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের কাজ শুরু করেছি। আগামী ১০দিনের মধ্যে সকল কাজ সম্পন্ন করতে পারবো। ঘরের ওয়্যারিং, ইলেক্ট্রিশিয়ানের মজুরী এবং লাইন নির্মাণের খরচ আমাদের অফিস থেকে বহন করা হচ্ছে। মিটারের জামানত বাবদ ৪শ টাকা, আবেদন ফি ৫০ টাকা ও সদস্য ফরম বাবদ ১১৫ টাকা করে নেয়া হয়েছে।"
টিউবওয়েলগুলোতে পানি না পাওয়ার ব্যাপারে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চন্দনাইশ উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ফরহাদ উদ্দিন বলেন, "হাশিমপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের টিউবওয়েলগুলো উপজেলা পরিষদ থেকে দেয়া হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্প উদ্ভোধনের আগে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুরোধে টিউবওয়েলগুলো আমরা মেরামত করে ব্যবহার উপযোগী করে দিয়েছিলাম। হাশিমপুর এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ার ফলে সমস্যা হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে টিউবওয়েলগুলো মেরামত করার উদ্যোগ নেবো। এখন যেহেতু বর্ষা মৌসুম আশা করি লেয়ারজনিত সমস্যা হবে না।"
এব্যাপারে চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাদিয়া ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।
Developed By Muktodhara Technology Limited