image

আজ, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০ ইং

জেনে নিন লিভার প্রতিস্থাপনের যাবতীয় জিজ্ঞাসা

ডেস্ক    |    ১৯:২৯, অক্টোবর ৫, ২০২০

image

লিভার বা যকৃৎ হল একটি আবশ্যিক প্রত্যঙ্গ, যা পাচকনালী থেকে আসা রক্তকে পরিস্রুত করে পুরো শরীরে ছড়িয়ে দেয়। পেশি গড়ে তুলতে, সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে ও রক্তকে জমাট বাঁধতে না-দেওযার জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যালকে বিষমুক্ত বা ডিটক্সিফাই করা, ওষুধপত্রকে বিপাক বা মেটাবলাইজ করা এবং প্রোটিনকে সংশ্লেষিত বা সিন্থেসাইজ করার কাজ করে লিভার।

লিভার প্রতিস্থাপন কী এবং কখন এর প্রয়োজন হয়?
লিভার প্রতিস্থাপন হল এমন এক সার্জারি যার মাধ্যমে অসুস্থ লিভারকে সরিয়ে তার জায়গায় সুস্থ লিভার বসিয়ে দেওয়া হয়। লিভার যখন পর্যাপ্ত ভাবে কাজ করতে পারে না (লিভার বিকল হয়ে যায়) তখন লিভার প্রতিস্থাপন করার কথা ভাবা হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের লিভার প্রতিস্থাপন করা হয় মূলত সিরোসিস হলে, এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন হয় বাইলিয়ারি আট্রেজিয়া হলে। ভাইরাল হেপাটাইটিস, লিভার ক্যানসার ও বংশগত রোগ হলেও লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়ে থাকে।

প্রতিস্থাপন টিম
লিভার প্রতিস্থাপন করাটা ঠিক হবে কি না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হয়। এই টিমে থাকেন:
লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ (হেপাটোলজিস্ট)
প্রতিস্থাপনকারী সার্জন
প্রতিস্থাপন সমন্বয় রক্ষী
পুষ্টিবিদ
ফিজিওথেরাপিস্ট
মনোবিদ
অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট

লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য একটি আদর্শ হাসপাতালের চেকলিস্ট
সার্জারির জন্য অতি সূক্ষ্ম ভাবে নির্বীজন (অ্যাসেপ্টিক) ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, তাই ল্যামিনার ফ্লো থাকা পৃথক অপারেশন থিয়েটার ফেসিলিটিতে এটা করা হয়ে থাকে।
লিভার সার্জারির জন্য 320 স্লাইস CECT অ্যাঞ্জিওগ্রাফি ও ভলিউমেট্রি, আর্গন বিম ইত্যাদি আধুনিকতম প্রযুক্তির সঙ্গে CUSA ও ওয়াটার জেটTM ইত্যাদি লিভার রিসেকশন টুল ব্যবহার করা হয়।
দিনরাত সর্বক্ষণ ব্লাডব্যাঙ্ক খোলা থাকে।
লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য লিভার-দাতা ও লিভার-গ্রহীতা এই দুজনেরই শরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য স্পেশ্যালাইজড প্যাথোলজি ও ইমিউনোলজির ব্যবস্থা রয়েছে।
হেপাটোবাইলিয়ারি ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট সর্বদা প্রস্তুত থাকে, ফোন করলেই হেপাটোবাইলিয়ারি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা যায়, অ্যানেস্থেসিয়া স্টাফ ও স্পেশ্যালাইজড নার্সিং টিমকেও পাওয়া যায়।

লিভার প্রতিস্থাপন সার্জারি
জীবিত লিভার-দাতার লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন সার্জারিতে জীবিত ও সুস্থ দাতার লিভারের একটা অংশকে বের করে এনে গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। এটা সম্ভব হয় কেননা লিভারের ক্রিয়াশীলতাকে সংরক্ষণ করার ক্ষমতা বিশাল (70%) এবং এর পুনর্গঠিত হয়ে ওঠার ক্ষমতাও আশ্চর্য রকমের। দাতা ও গ্রহীতা দুজনেরই লিভারের অংশগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক আকৃতি পেয়ে যায়।

মৃত লিভার-দাতার লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন সার্জারিতে দাতার মস্তিষ্ক চিরদিনের জন্য অকেজো হয়ে যায় এবং এই অবস্থার পুনরুদ্ধার করা যায় না। মৃত ব্যক্তির অন্যান্য প্রত্যঙ্গের মতো লিভারও দান করা হয় তাঁর নিকটতম আত্মীয়ের সম্মতি নিয়ে।

লিভার প্রতিস্থাপনের অপারেশন করতে সাধারণত 6 থেকে 10 ঘণ্টা সময় লাগে। অসুস্থ লিভারকে বের করে এনে তার জায়গায় দাতার লিভার বসানো হয়। নতুন লিভার প্রতিস্থাপন করার আগে সার্জন অসুস্থ লিভারকে পিত্তনালী ও রক্তনালী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন।

নতুন লিভার যাতে স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে থাকে এবং শরীর যাতে নতুন লিভারকে প্রত্যাখ্যান করতে না-পারে, তার জন্য প্রতিস্থাপন পরবর্তী পরিচর্যা, যেমন ওষুধপত্র খাওয়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয় হাসপাতালে এবং বাড়িতে। সফল ভাবে লিভার প্রতিস্থাপন হলে পর একজন ব্যক্তি ফের তাঁর কাজের জগতে, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।

লিভার প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন কখন হয়?
গুরুতর লিভার রোগ হলেই লিভার প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন হয়। এই রোগের নানা কারণ রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের লিভার প্রতিস্থাপন করার সবচেয়ে বড় কারণ হল সিরোসিস। এই সিরোসিস হলে লিভার আস্তে আস্তে খারাপ হতে থাকে এবং ক্রনিক আঘাতের ফলে অকেজো হতে শুরু করে। খারাপ কোষকলা লিভারের সুস্থ কোষকলার জায়গা দখল করে। এরা লিভার থেকে হওয়া রক্তপ্রবাহকে বাধা দেয় আংশিক ভাবে। সিরোসিস নানা কারণে হয়। যেমন হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস, মদ্যপান, লিভারের স্বয়ং-প্রতিরোধী রোগ, লিভারে চর্বি জমা হওয়া ও বংশগত লিভার রোগ। অত্যধিক মদ্যপান করার ফলে লিভারে সিরোসিস হওয়া বহু লোকেরও লিভার প্রতিস্থাপন করার দরকার হয়। বহু রোগীই আবার দীর্ঘদিন লিভার প্রতিস্থাপন না-করেও বেঁচে থাকতে পারেন। তাঁদেরকে শুধু মদ্যপান থেকে বিরত থাকতে হয় এবং 6 মাস ধরে লিভার সংক্রান্ত নানা সমস্যার চিকিৎসা করাতে হয়। তবেই তাঁদের লিভার বেশ ভাল ভাবেই সুস্থ হয়ে ওঠে। যেসব রুগির লিভার রোগ খুব বেড়ে যায়, এবং বহুদিন ধরে মদ্যপান থেকে বিরত থেকে ও চিকিৎসা করা সত্ত্বেও যাঁদের লিভার সেরে ওঠে না, তাঁদের জন্য লিভার প্রতিস্থাপনই হল একমাত্র চিকিৎসা।

শিশুদের মধ্যে লিভার প্রতিস্থাপন করার সবচেয়ে বড় কারণ হল বাইলিয়ারি আট্রেজিয়া। সদ্যোজাত শিশুদের বাইলিয়ারি আট্রেজিয়া নামক এই বিরল রোগ হয় লিভার ও ক্ষুদ্রান্ত্রের মধ্যবর্তী অভিন্ন পিত্তনালী ব্লক হয়ে থাকলে বা এই পিত্তনালী একেবারেই না-থাকলে। লিভার থেকে পিত্তকে নিয়ে আসা পিত্তনালী না-থাকলে বা নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকলে বাধাপ্রাপ্ত পিত্তগুলোর জন্যই সিরোসিস হয়। পিত্তর কাজ হল খাবারকে হজম করানো। এই রোগ ধরা না-পড়লে লিভার পরে পুরো অকেজো হয়ে যায়। তবে এই রোগ কেন হয়, তা জানা যায় না। এর একমাত্র মোক্ষম চিকিৎসা হল নির্দিষ্ট কিছু সার্জারি বা লিভার প্রতিস্থাপন।

লিভার ক্যানসার, বিনাইন (বিপজ্জনক নয়) লিভার টিউমার ও বংশগত রোগের ক্ষেত্রেও লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়।

কার লিভার প্রতিস্থাপন করা দরকার তা কী ভাবে নির্ধারণ করা হয়?
লিভার প্রতিস্থাপন করাটা ঠিক হবে কি না তা নির্ধারণ প্রয়োজন হয় বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন। আপনার মেডিক্যাল হিস্ট্রি ও অন্যান্য নানা ধরনের টেস্ট করে এই মূল্যায়ন করা হয়। আপনার লিভার প্রতিস্থাপন করার দরকার আছে কি না এবং প্রতিস্থাপনের কাজটা সুরক্ষিত ভাবে করা যাবে কি না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওযার জন্য প্রতিস্থাপন টিম রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে ও অন্যান্য নানা টেস্ট করিয়ে থাকেন। সার্জারির ধকল সহ্য করতে পারার মতো জোর আপনার আছে কি না তা জানার জন্য আপনার স্বাস্থ্যের অন্যান্য দিক, যেমন আপনার হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য ইত্যাদিও পরীক্ষা করে দেখা হয়।

লিভারের সমস্যা থাকা যে কোনও লোকই কি প্রতিস্থাপন করাতে পারেন?
আপনি প্রতিস্থাপন করাতে পারবেন না, যদি:
আপনার শরীরের অন্য কোনও অংশে ক্যানসার থাকে
আপনার হৃদযন্ত্র, ফুসফুস বা স্নায়ুর গুরুতর কোনও রোগ থাকে
আপনার মদ ও মাদকাসক্তি থাকে
আপনার কোনও সক্রিয় ও গুরুতর সংক্রমণ থাকে
আপনি ঠিক মতো ডাক্তারের বলে দেওয়া নিয়ম মেনে চলতে না-পারেন

প্রতিস্থাপন করার সিদ্ধান্ত কী ভাবে নেওয়া হয়?
রুগির পরিচর্যায় যুক্ত সমস্ত লোক, ডাক্তার ও রুগির পরিবারের লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিবারের লোকের মত নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা যেন স্পষ্ট ভাবে বোঝেন যে লিভার প্রতিস্থাপনের কী কী ঝুঁকি আছে এবং এর থেকে কী কী লাভই বা পাওয়া যায়।

নতুন লিভার পেতে কত সময় লাগে?
আপনি যদি লিভার প্রতিস্থাপনের সক্রিয় প্রার্থী হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার নাম প্রতীক্ষারতদের তালিকায় রাখা হবে। রক্তের প্রকার, শরীরের আকৃতি ও মেডিক্যাল কন্ডিশন (রুগি কতখানি অসুস্থ) অনুযায়ী রুগিদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়। প্রত্যেক রুগিকে সাধারণ কয়েকটা রক্ত পরীক্ষার (ক্রিয়েটিনাইন, বিলিরুবিন ও INR)ভিত্তিতে প্রায়োরিটি স্কোর বা প্রাধান্য প্রদান পূর্বক নম্বর দেওয়া হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই স্কোর MELD (মডেল অব এন্ড স্টেজ লিভাৰ ডিজিজ) নামে পরিচিত এবং শিশুদের ক্ষেত্ৰে এই স্কোর পরিচিত PELD (পেডিয়াট্রিক এন্ড স্টেজ লিভার ডিজিজ) নামে।

সর্বোচ্চ স্কোর প্রাপক রুগিদের সবার প্রথমে লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। তাঁরা যত বেশি অসুস্থ হতে থাকেন, ততই তাঁদের স্কোর বাড়তে থাকে এবং এই ভাবে প্রতিস্থাপনের ব্যাপারে তাঁদের প্রাধান্যও বাড়তে থাকে। এই ভাবে সবচেয়ে অসুস্থ রুগিরই সবার আগে লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। আগে থেকে এটা অনুমান করাটা সম্ভব নয় যে, লিভার পেতে ঠিক কত সময় লাগবে। প্রতীক্ষারতদের তালিকায় আপনার নাম কত নম্বরে আছে তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য আপনি সব সময়েই আপনার প্রতিস্থাপন সমন্বয় রক্ষীকে পাবেন। আপনি নতুন লিভার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকার সময় ডাক্তারের সঙ্গে আপনি এই কথা আলোচনা করে নিতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয় যে সার্জারি না-হওয়া অবধি আপনি কী ভাবে নিজেকে শক্ত রাখবেন। নতুন লিভারের যত্ন কী ভাবে নিতে হয় সে সম্পর্কেও আপনি জানার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারেন।

প্রতিস্থাপনের জন্য লিভার কোথা থেকে আসে?
লিভার প্রতিস্থাপনের দুটি বিকল্প আছে: জীবিত দাতার লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন এবং মৃত দাতার লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন।
যেসব রুগির এন্ড-স্টেজ লিভার রোগ হয়েছে, তাঁদের জন্য জীবিত দাতার লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সুস্থ ও জীবিত দাতার লিভারের একটা অংশ নিয়ে গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দাতা ও গ্রহীতা, দুজনেরই লিভারের অংশগুলো বেড়ে স্বাভাবিক আকৃতি পেয়ে যায়।

রুগির রক্তের সম্পর্কের ব্যক্তি, স্বামী/স্ত্রী বা বন্ধু লিভার-দাতা হতে পারেন। প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারা ঝুঁকিকে যতটা সম্ভব কম করার জন্য দাতার চিকিৎসা সংক্রান্ত ও মনস্তাত্ত্বিক দিকের গভীর মূল্যায়ন করা হয়। কে উপযুক্ত দাতা হতে পারেন, তা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রক্তের প্রকার ও শরীরের আকৃতি। প্রতিস্থাপন সার্জারির আগে জীবিত দাতাদের ও তাঁদের থেকে নেওয়া লিভারকে পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। এইসব টেস্ট করে দেখা হয় যে লিভার যেন সুস্থ থাকে, আপনার রক্তের প্রকারের সঙ্গে যেন মিলে যায় এবং এর আকৃতিও যেন ঠিক থাকে, যাতে আপনার শরীরে এই লিভার খুব ভাল করে কাজ করার সুযোগ পায়।

যে গ্রহীতার শরীররে জীবিত দাতার লিভার প্রতিস্থাপন করা হবে তাঁকে প্রতিস্থাপনের প্রতীক্ষারত তালিকায় সক্রিয় থাকতে হবে। তাঁদের স্বাস্থ্যও যথেষ্ট মজবুত হতে হবে যাতে তাঁদের শরীরে প্রতিস্থাপন সর্বোত্তম সফল ভাবে করা যেতে পারে।

মৃত দাতার লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন করার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে মৃত ব্যক্তি হয়তো দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিলেন, বা তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছিল বা মাথায় চোট পেয়েছিলেন। এই অবস্থায় দাতার হৃদযন্ত্র তখনও সক্রিয় থাকে, কিন্তু তাঁর মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এমন ব্যক্তিকে আইনত মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়, কারণ তাঁর মস্তিষ্ক চিরকালের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং তাঁর মস্তিষ্ককে পুনরায় সক্রিয় করে তোলা যায় না। এই সময়টাতে দাতাকে সাধারণত ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রাখা হয়। পুরো লিভারটাই সদ্যমৃত ব্যক্তির থেকে বের করে আনা হয়। এমন ব্যক্তির নিকটতম আত্মীয়ের সম্মতি নিয়ে লিভার নেওয়া হয়। মৃত দাতা এবং তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে থাকা পরিস্থিতিগুলোকে গোপন রাখা হয়।

দাতা ও গ্রহীতা এই দুজনেরই কি কোষকলার প্রকার, লিঙ্গ, বয়স ইত্যাদি মিলতে হবে?
না। লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য শুধুমাত্র দাতা ও গ্রহীতার লিভারের আকৃতি প্রায় একই হতে হবে এবং রক্তের প্রকারও উপযোগী হতে হবে। অন্য কিছু মেলানোর প্রয়োজন নেই।

লিভার প্রতিস্থাপন করা কি সুরক্ষিত?
লিভার প্রতিস্থাপন করাটা সুরক্ষিত। কারণ, লিভারের সংরক্ষণ ক্ষমতা খুব বেশি এবং এর একটা অংশ বের করে আনার পর (2-3 মাসের মধ্যে) এটা পুনর্গঠিত হয়ে নিজের প্রকৃত আকৃতি পেয়ে যায়। দাতার স্বাস্থ্যে এর কোনও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে না, তাঁকে 2-3 সপ্তাহের বেশি ওষুধ খেতে হয় না এবং এক মাসের মধ্যেই তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। তিন মাসের মধ্যে শ্রমসাধ্য কাজ (ভারী জিনিস তোলা ইত্যাদি) করতে পারবেন।

সার্জারির আগে ও পরে কী কী ধরনের বড়সড় ঝুঁকি দেখা দিতে পারে?
সার্জারির আগে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হল এটাই যে লিভারের রোগের কিছু গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে, যার ফলে রুগির সার্জারি করাই হয়তো সম্ভব না-হতে পারে। প্রতিস্থাপন করা হলে সার্জারি সংক্রান্ত যে কোনও ধরনের ঝুঁকিই থাকতে পারে। তার উপর আবার অসুস্থ লিভার বাদ দেওয়া এবং দাতার লিভার প্রতিস্থাপন করার ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল সমস্যাও দেখা দিতে পারে। রুগির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে এটাই যে কিছু সময়ের জন্য তাঁর লিভার হয়তো কোনও কাজই করবে না। সার্জারির ঠিক পরেই রক্তপাত, প্রতিস্থাপিত লিভারের ঠিকঠাক কাজ না-করা এবং সংক্রমণ ইত্যাদি বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে। রুগির শরীর নতুন লিভারকে প্রত্যাখ্যান করছে কি না তা দেখার জন্য রুগিকে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ভাল করে নজরে রাখতে হবে।

হাসপাতালে কী হয়?
আপনার জন্য কোনও লিভারকে শনাক্ত করার পর আপনাকে সার্জারির জন্য প্রস্তুত করা হবে। আপনি যখন হাসপাতালে এসে পৌঁছবেন তখন আপনার অপারেশনের আগে আপনার অতিরিক্ত কিছু রক্ত পরীক্ষা, ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম ও বুকের এক্স-রে করানো হবে। আপনার লিভার যদি কোনও জীবিত দাতার থেকে নেওয়া হয়, তাহলে আপনাকে ও দাতাকে দুজনকেই একই সঙ্গে সার্জারি করা হবে। আপনি সদ্যমৃত দাতার থেকে লিভার পেয়ে থাকলে সেই লিভার হাসপাতালে এসে পৌঁছনোর পরেই আপনার সার্জারি আরম্ভ হবে।

সার্জারি করতে কত সময় লাগে?
লিভার প্রতিস্থাপন করতে সাধারণত 4 থেকে 14 ঘণ্টা লাগে। অপারেশনের সময় সার্জনরা আপনার লিভারকে বের করে এনে তার জায়গায় দাতার লিভার বসিয়ে দেবেন। আপনার অসুস্থ লিভারকে বের করে আনার আগে সার্জন ওই লিভারকে আপনার পিত্তনালী ও রক্তনালী থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। লিভার থেকে প্রবাহিত রক্তকে মেশিনের সাহায্যে আটকে দিয়ে আপনার শরীরের বাকি অংশে তাকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সার্জন এরপর সুস্থ লিভারটাকে সঠিক জায়গায় বসিয়ে সেটাকে আপনার পিত্তনালী ও রক্তনালীর সঙ্গে যুক্ত করে দেন। প্রতিস্থাপনের অপারেশনটা খুব বড়সড় একটা চিকিৎসা পদ্ধতি বলে সার্জনরা আপনার শরীরের বিভিন্ন অংশে টিউব লাগিয়ে রাখেন। অপারেশনের সময় এবং তারপরেও আরও কয়েক দিন আপনার শরীর যাতে নির্দিষ্ট কিছু কাজ করে যেতে পারে, তার জন্যই এই টিউবগুলোর প্রয়োজন হয়।

পুরো সুস্থ হয়ে ওঠার সময় কী হয়?
শুরুতে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে আপনার লিভার সহ পুরো শরীরের ক্রিয়াকলাপের উপর খুব ভাল করে নজর রাখার কাজটা করা হয়। রুগিকে একবার ওয়ার্ডে পাঠানো হয়ে গেলে ঘন ঘন তাঁর রক্ত পরীক্ষা করানোর মাত্রা কমিয়ে দেওয়া হয়, খাওয়াদাওয়া করতে দেওয়া হয়, পেশিকে ফের মজবুত করে তোলার জন্য ফিজিওথেরাপি করতে দেওয়া হয়। শরীর যাতে নতুন লিভারকে প্রত্যাখ্যান করতে না-পারে, তার জন্য শুরুতে শিরার মাধ্যমে এক বা একাধিক ওষুধ শরীরে ঢোকানো হয়, পরে আস্তে আস্তে ওষুধ খেতে দেওয়া হয়। প্রতিস্থাপনের সময় লিভারের ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করার জন্য এবং প্রত্যাখ্যানের কোনও লক্ষণকে শনাক্ত করার জন্য ঘন ঘন নানা টেস্ট করানো হয়।

আমি কবে বাড়ি ফিরতে পারব?
লিভার প্রতিস্থাপনের পর মোটামুটি দুই থেকে তিন সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়। কোনও কোনও রুগিকে আরও আগে ছেড়ে দেওয়া হয়। আবার, নতুন লিভার কেমন কাজ করছে এবং নতুন কোনও সমস্যা দেখা দিতে পারে কি না, এসবের উপর নির্ভর করে কোনও কোনও রুগিকে হাসাপাতালে আরও বেশি দিন রাখা হয়। এই দু ধরনের সম্ভাবনার জন্যই আপনাকে প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে হবে। আপনাকে একবার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে রেগুলার নার্সিং ফ্লোরে পাঠিয়ে দেওয়া হলেই আপনাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া সংক্রান্ত ডিসচার্জ ম্যানুয়াল দেওয়া হয়। এতে লেখা থাকে যে বাড়ি ফিরে আপনাকা কী কী নিয়ম মেনে চলতে হবে। হাসপাতালে থাকাকালীনই আপনি আস্তে আস্তে খাওয়াদাওয়া করা শুরু করে দেবেন। প্রথমে আপনাকে স্বচ্ছ তরল খেতে দেওয়া হবে, তারপর আপনার নতুন লিভার কাজ করতে শুরু করলেই আপনাকে গোটা খাবার দেওয়া শুরু হবে।

আপনি জানতে পারবেন যে কী ভাবে আপনি নিজের যত্ন নেবেন এবং আপনার নতুন লিভারকে সুরক্ষিত রাখার জন্য আপনি কী ভাবে নতুন ওষুধপত্র খাবেন। এইসব কাজ নিয়মিত করতে করতে আপনি নিজেরই স্বাস্থ্য পরিচর্যায় একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠবেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার আগে আপনি জানতে পারবেন যে লিভারকে আপনার শরীরকে প্রত্যাখ্যান করার এবং লিভারের সংক্রমণের লক্ষণগুলো কেমন হয় এবং কখন ডাক্তার ডাকা দরকার হবে তা-ও জানতে পারবেন। সুফল পাওয়ার জন্য প্রতিস্থাপনের পর যা যা নিয়ম মেনে চলতে বলা হবে সেগুলোকে ভাল করে মেনে চলার মতো ইচ্ছা রুগির মনে থাকতে হবে।

লিভার প্রতিস্থাপনে কী কী সমস্যা দেখা যায়?
লিভার প্রতিস্থাপন করার পর সবচেয়ে বড় যে দুটো সমস্যা দেখতে পাওয়া যায় সেগুলো হল শরীরের দ্বারা নতুন লিভারকে প্রত্যাখ্যান এবং লিভারের সংক্রমণ।

লিভারকে প্রত্যাখ্যান করা মানে কি?
একজন ব্যক্তি (দাতা)-র থেকে লিভার নিয়ে অপর ব্যক্তি (গ্রহীতা)-র শরীরে প্রতিস্থাপন করলেই গ্রহীতার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা নতুন প্রত্যঙ্গটাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, ঠিক যেমন এই ক্ষমতা শরীরের বাইরের কোনও উপাদানের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে সেইরকম। এরপর একের পর এক এমন কিছু ব্যাপার ঘটতে থাকে যে, প্রতিস্থাপিত প্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াটাকেই বলে প্রত্যাখ্যান। এটা খুব দ্রুত হতে পারে (তীব্র প্রত্যাখ্যান). বা দীর্ঘ সময় ধরেও হতে পারে (ক্রনিক প্রত্যাখ্যান)।

দাতার প্রত্যঙ্গের সঙ্গে গ্রহীতার শরীরের অবস্থা খুব ভাল করে মিলে যাওয়া সত্ত্বেও প্রত্যাখ্যানের ঘটনা ঘটতে পারে। আপনার শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা, মানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কাজই হল আপনার শরীরে বাইরের কোনও জিনিস ঢুকলে তাকে নষ্ট করে দেওয়া। এই প্রতিরোধ ক্ষমতা অবশ্য আপনার প্রতিস্থাপিত লিভার ও অযাচিত আক্রমণকারী, যেমন ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যে কোনও পার্থক্য করতে পারে না। সেই জন্যই আপনার প্রতিরোধ ক্ষমতা আপনার নতুন লিভারের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাকে নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। একেই বলে প্রত্যাখ্যান পর্ব। লিভার প্রতিস্থাপন করানো প্রায় 70 শতাংশ রুগিরই শরীরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার আগে কিছু না-কিছু পরিমাণে এই প্রত্যাখ্যান পর্ব চলে। প্রতিরোধ ক্ষমতার এই হামলা থেকে বাঁচার জন্য প্রত্যাখ্যান-বিরোধী ওষুধপত্র দেওয়া হয়।

প্রত্যাখ্যানকে কী ভাবে রোধ করা যায়?
লিভার প্রতিস্থাপনের পর আপনাকে ইমিউনোসাপ্রেস্যান্টস নামক ওষুধ দেওয়া হবে। আপনার প্রতিরোধ ক্ষমতার নতুন লিভারকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেবে এই ইমিউনোসাপ্রেস্যান্টস। নতুন লিভারকে আপনার প্রতিরোধ ক্ষমতা যাতে বাধা দিতে না-পারে, তার জন্য এই ওষুধগুলো আপনার প্রতিরোধ ক্ষমতার গতিকে কমিয়ে দেয় বা একে দমিয়ে রাখে। ইমিউনোসাপ্রেস্যান্টস ওষুধগুলো খুব ভাল ভাবেই প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকিকে কমিয়ে দেয়, নতুন প্রত্যঙ্গকে রক্ষা করে এর ক্রিয়াকলাপকে সুরক্ষিত রাখে। এই ওষুধগুলো গ্রহীতার প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আটকে দেয় যাতে এই ক্ষমতার প্রতিস্থাপিত প্রত্যঙ্গের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কমে যায়। এই কাজের জন্য বিভিন্ন ধরনের ওষুধ পাওয়া যায়। কিন্তু প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি কমানোর ব্যাপারে এগুলোর সবারই কাজ করার ধরন আলাদা আলাদা। বিভিন্ন ধরনের ওষুধের মধ্যে থাকতে পারে স্টেরয়েড, সাইক্লোস্পোরিন, ট্যাক্রোলিমাস, সিরোলিমাস আর মাইকোফেনোলেট মোফেটিল। আপনাকে যেভাবে বলা হবে ঠিক সেভাবেই এই ওষুধ খেয়ে যেতে হবে সারা জীবন।

ইমিউনোসাপ্রেস্যান্টস-এর কী কোনও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে?
ইমিউনোসাপ্রেস্যান্টস ওষুধগুলো একজন ব্যক্তির সংক্রমণের বিরুদ্ধে থাকা প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়, তাই তাঁর শরীরে কোনও সংক্রমণ হলে তার চিকিৎসা করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। লিভারকে প্রত্যাখ্যান করার দিকটাকে বাধা দেওয়াই এই ওষুধগুলোর কাজ হলেও, এগুলো কিছু কিছু ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া ও ফাংগাসের বিরুদ্ধে শরীরের লড়াই ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। রুগিদের উপর যেসব জীবাণু বেশি আক্রমণ চালায় সেগুলোকেই নষ্ট করে এই প্রতিরোধমূলক ওষুধগুলো। অবশ্য, সংক্রমণ থাকা লোকের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই ভাল।

প্রতিস্থাপিত লিভার গ্রহীতাদের কি সারা জীবন ধরে এইসব ওষুধ খেয়ে যেতে হবে?
সাধারণ ভাবে বলতে গেলে, হ্যাঁ খেতে হবে। অবশ্য প্রতিস্থাপিত লিভারের সঙ্গে শরীর নিজেকে মানিয়ে নিলেই প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারটাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ওষুধ খাওয়াটাকে ক্রমশ কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এমন কয়েকজন রুগি আছেন যাঁরা এইসব ওষুধ খাওয়া বন্ধ করেও ভাল মতোই আছেন। গবেষকরা তাই পরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করছেন যে এটা কী ভাবে সম্ভব হচ্ছে।

প্রত্যাখ্যানের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো কী?
প্রতিস্থাপিত লিভারকে প্রত্যাখ্যান করার লক্ষণ ও উপসর্গের তালিকা নীচে দেওয়া হল:
100 ডিগ্রির উপরের জ্বর
অবসান ও অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া
খামখেয়ালি ভাব
মাথা ব্যথা
পেট ফোলা, নরম হওয়া বা ব্যথা
অরুচি বেড়ে যাওয়া
জন্ডিস (ত্বক ও চোখ হলদে হয়ে যাওয়া)
ঘন (খয়েরি) রঙের প্রস্রাব
চুলকানি
বমি বমি ভাব
এগুলো কোনওটাই প্রত্যাখ্যানের নির্দিষ্ট উপসর্গ নয়। কিন্তু এগুলোর প্রতি নজর দেওয়া একান্তই দরকার। তাই এসব দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার দেখাতে হবে। তিনিই বিচার বিবেচনা করে দেখবেন যে এগুলোকে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখার কোনও প্রয়োজন আছে কি না। বা কিছু সময় অপেক্ষা করে নিলে ভাল হয়।

প্রত্যাখ্যানের আসলে কোনও উপসর্গই দেখা যায় না বলে সবচেয়ে ভাল উপায় হল প্রতিস্থাপনের পর নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানো। সেটা করালেই প্রতিস্থাপিত লিভারকে প্রত্যাখ্যান করার ইঙ্গিত আগেভাগে পাওয়া যেতে পারে। ডাক্তার লিভারের পাচক রসকে বোঝার জন্য আপনার রক্ত পরীক্ষা করিয়ে দেখবেন। পাচক রস থেকেই আগে ভাগে জানা যায় যে প্রতিস্থাপিত লিভারকে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে কি না। শুরুতে এই পরীক্ষাগুলো রোজই করানো হবে। লিভার প্রতিস্থাপনের পর প্রথম মাসটায় এই পরীক্ষাগুলো অন্তত প্রতি সপ্তাহে করানো হবে। আস্তে আস্তে যত মাস ও বছর কাটতে থাকবে ততই প্রত্যেক বার পরীক্ষা করানোর মধ্যকার ব্যবধান বাড়তে থাকবে। প্রত্যাখ্যানের সন্দেহ দেখা দিলেই লিভার বায়োপ্সি করিয়ে সে-ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বায়োপ্সি করার দরকারই পড়ে না, কেননা প্রত্যাখ্যানের সন্দেহ খুব দৃঢ় হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার বায়োপ্সি করাটা খুবই দরকার। বায়োপ্সির জন্য ডাক্তার লিভারের ছোট্ট একটা টুকরো নিয়ে সেটাকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে পরীক্ষা করে দেখেন।

আর কী কী কারণ লিভার প্রতিস্থাপনকে নষ্ট করে দিতে পারে?
রুগির যে-সমস্যার জন্য লিভার প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন হয়, সেই সমস্যাটাই প্রতিস্থাপিত লিভারের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। অপারেশনের আগেই যদি রুগি হেপাটাইটিস সি-র দ্বারা সংক্রামিত হয়েছিলেন, তাহলে সেটাও প্রতিস্থাপিত লিভারকে নষ্ট করতে পারে।

অন্যান্য কিছু সমস্যার মধ্যে রয়েছে
লিভারের মধ্যে যাওয়া এবং লিভার থেকে বের হওয়া রক্তনালী বুজে যাওয়া
অন্ত্রে পিত্ত নিয়ে যাওয়া নালীগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়া

প্রতিস্থাপন করার পরেও যদি কোনও ফল পাওয়া না-যায়?
মনে আশা রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি। লিভার প্রতিস্থাপনের অধিকাংশ অপারেশনই ভাল মতোই হয়। প্রায় 80 থেকে 90 শতাংশ প্রতিস্থাপিত লিভারই 1 বছর পরেও ভাল মতোই কাজ করে যাচ্ছে। কখনও কখনও লিভার সক্রিয় হয়ে উঠতে বেশি সময় নিয়ে নেয়। লিভার বিকল বিভিন্ন মাত্রায় হয়। লিভারের ক্রিয়াকলাপে খুঁত থাকলেও রুগিরা বেশ ভাল মতোই থাকে। যদি কোনও সমস্যা দেখা দেয়, যেমন নতুন লিভার কাজ করতে পারছে না, বা আপনার শরীরই তাকে প্রত্যাখ্যান করছে, সে ক্ষেত্রে আপনার ডাক্তার ও প্রতিস্থাপন টিম বিচার বিবেচনা করে দেখেন যে কাজ করতে অক্ষম প্রতিস্থাপিত লিভারটাকে বদলে দ্বিতীয় (বা এমনকী তৃতীয়) বার প্রতিস্থাপন করা যায় কি না। দুর্ভাগ্যবশত কিডনির মতো লিভারের ক্ষেত্রে ডায়ালিসিস করার মতো কোনও চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। নতুন লিভারের প্রতীক্ষায় থাকা রুগিরা যাতে তাঁদের বিকল লিভার নিয়েই বেঁচে থাকতে পারেন, তার জন্য ডিভাইস তৈরির টেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষকরা।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমি কী ভাবে নিজের লিভারের যত্ন নেব?
হাসপাতালের প্রতিস্থাপন কেন্দ্র থেকে চলে যাওয়ার পরেও আপনাকে প্রায়ই ডাক্তারের কাছে আসতে হবে এটা জানার জন্য যে আপনার নতুন লিভার ভাল মতো কাজ করছে কি না। আপনার নতুন লিভার প্রত্যাখ্যান, সংক্রমণ অথবা রক্তনালী বা পিত্তনালীর সমস্যার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না জানার জন্য আপনাকে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে। আপনাকে অসুস্থ লোকের সংস্পর্শ খুব সাবধানে এড়িয়ে চলতে হবে। আপনার মধ্যে অসুস্থতার কোনও লক্ষণ দেখা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যাবেন। দৈনন্দিন কাজকর্ম করার মতো জোর আনার জন্য এবং সার্জারির আগের মতো সুস্থ শরীর ফিরে পাওয়ার জন্য বাড়িতে নানা পরিচর্যা নিতে হবে। এটা খুব দীর্ঘ ও ধীর একটা প্রক্রিয়া। এতে সহজ সরল কিছু কাজ করে যেতে হয়। প্রথমেই হাঁটাচলা করার জন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন হবে। ফুসফুসকে সুস্থ রাখার জন্য এবং নিউমোনিয়া যাতে না-হয় তার জন্য কেশে কেশে থুতু ফেলতে হবে এবং গভীর নিঃশ্বাস নেওয়া ব্যায়াম করতে হবে। প্রথমেই আইস চিপ্স খাওয়া শুরু করতে হবে, তারপর স্বচ্ছ তরল খাবার এবং সবশেষে গোটা খাবার। সব ধরনের খাদ্যগোষ্ঠীর খাবার থাকা সুষম আহার খেতে হবে। প্রায় 3 থেকে 6 মাস পরে কেউ যদি মনে করেন যে তিনি কাজে যেতে পারবেন এবং তাঁর ডাক্তার যদি তাঁকে অনুমতি দেন, তাহলে তিনি কাজে যেতে পারেন। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া ও ব্যায়াম করা ছাড়াও মদ্যপান থেকে বিরত থাকতে হবে, বিশেষ করে মদ্যপানের জন্যই আপনার লিভার বিকল হয়ে গিয়ে থাকে। কোনও ওষুধ খাওয়ার আগে, এমনকী যেসব ওষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কেনা যায়, সেসব ওষুধও খাওয়ার আগে নিজের ডাক্তারকে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করে নেবেন যে এগুলো খাওয়া যাবে কি না। আপনার নতুন লিভারের ভাল মতো যত্ন নেওয়ার জন্য আপনার ডাক্তার আপনাকে যা যা নিয়ম মেনে চলতে বলবেন, সেগুলোকে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলাটা একান্ত দরকার।

আমি কি আবার আমার দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারব?
অবশ্যই। লিভার প্রতিস্থাপন সফল ভাবে হওয়ার পর অধিকাংশ লোকই তাঁদের সুস্থ স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্ম আবার শুরু করতে পারেন। প্রতিস্থাপনের আগে আপনি কতটা অসুস্থ ছিলেন তার উপর নির্ভর করে আপনার শক্তি ফিরে পেতে কিছু সময় লাগবে। আপনার ডাক্তার আপনাকে বলতে পারবেন যে, পুরো সুস্থ হয়ে উঠতে আপনার কত সময় লাগতে পারে।

কাজ- পুরো সুস্থ হওয়ার পর অধিকাংশ লোকই ফের কাজে যাওয়া শুরু করতে পারেন।
খাওয়াদাওয়া- অধিকাংশ লোকই আগের মতোই খাওয়াদাওয়া শুরু করতে পারেন। কোনও ওষুধের জন্য ওজন বাড়তে পারে, কোনওটার জন্য ডায়াবেটিস হতে পারে আবার কোনওটার জন্য কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। পরিকল্পানা মাফিক খাওয়াদাওয়া করে এবং সুষম তথা কম চর্বি থাকা খাবার খেয়ে আপনি সুস্থ থাকতে পারবেন। লিভার প্রতিস্থাপন হওয়া রুগিদের শরীরে জল থেকে যায় বলে তাঁদের ওজন বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। শরীরে জলের মাত্রা কমানোর জন্য বা একেবারে শূন্য করার জন্য এই রুগিদের নুন কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। 
ব্যায়াম- লিভার প্রতিস্থাপন সফল হওয়ার পর অধিকাংশ লোকই শারীরিক কসরত করতে পারেন।
যৌনতা- লিভার প্রতিস্থাপনের পর অধিকাংশ লোকই স্বাভাবিক যৌন জীবনে ফিরে আসতে পারেন। মহিলাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিস্থাপনের পর এক বছরের মধ্যে তাঁরা যেন গর্ভবতী হয়ে না-পড়েন। প্রতিস্থাপনের পর যৌন জীবন ও প্রজননের ব্যাপারে কী করা যেতে পারে সেসব কথা আপনি নিজের প্রতিস্থাপন টিমকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।
যে কোনও কিছই নতুন করে শুরু করার আগে আপনার ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করে বিশদে সব জেনে নিন।



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

১৮:৩৯, অক্টোবর ১৫, ২০২০

বাতের ব্যথায় সুস্থতায় করণীয়


Los Angeles

১৮:২৮, অক্টোবর ১৫, ২০২০

মোটা ভীতি : ভাত কতটুক কখন কিভাবে খাবেন ?


Los Angeles

১৩:৩৫, অক্টোবর ৮, ২০২০

এপেন্ডিসাইটিস সম্পর্কে জানুন


Los Angeles

১৯:১৬, অক্টোবর ৫, ২০২০

সবজিতেই সুস্থতা সবজিতেই মুগ্ধতা


Los Angeles

১৮:৫০, অক্টোবর ৫, ২০২০

কলায় যখন আপত্তি !


Los Angeles

১৮:৪৪, অক্টোবর ৫, ২০২০

হৃদয়ের অসুস্থতা বুঝবেন যেভাবে


Los Angeles

০১:২৩, সেপ্টেম্বর ২, ২০২০

রাউজানের প্রমি ‘মিস গ্লোবাল অস্ট্রেলিয়ার’ মূল পর্বে


image
image
image

আরও পড়ুন

Los Angeles

০০:০৩, অক্টোবর ২২, ২০২০

পেকুয়ায় ভ্রাম্যমান আদালতে ২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ৩টি যানবাহনকে অর্থ দন্ড


Los Angeles

২৩:৫৯, অক্টোবর ২১, ২০২০

উখিয়ায় সন্ত্রাসী হামলায় আবদুল মালেক গুরুতর আহত


Los Angeles

২৩:৫৪, অক্টোবর ২১, ২০২০

ফটিকছড়ির সুয়াবিল ও নানুপুরে পুণঃনির্বাচন দাবি বিএনপি’র