শিরোনাম
ঢাকা ব্যুরো | ০০:০১, জুন ১৫, ২০২০
একটি রাজনৈতিক সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছে তিন তিনটি টার্ম। মহামারি করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ কতটুকু সফল এ নিয়ে নতুন করে বলার অবকাশ নেই। বার বার সাধারণ ছুটি আর স্বাস্থ্যবিধি দিয়ে জণগনকে অঘোষিত লকডাউনের আওতায় আনার চেষ্টা করে সফল হওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত লাল, হলুদ আর সবুজ জোন ভাগ করে লকডাউন করার মাধ্যমে চেষ্টা করা হচ্ছে সংক্রমণ রোধ করার। কিন্তু এ চেষ্টার সফলতা নিয়ে কেউ কেউ সংশয় সন্দিহান হলেও অনেকেই আবার আশাবাদী।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাঃ আব্দুল্লাহ প্রথম থেকেই সংক্রমণ রোধে প্রয়োজনে কারফিউ দেওয়ারও মতামত দিয়েছিলেন। প্রতিদিন মৃত্যু ও সংক্রমণ বেড়েই চলছে। উপসর্গ নিয়ে জেলায় জেলায় শহরে শহরে মানুষ মরছে, বাড়িতে, এ্যাম্বুলেন্সে, বিনাচিকিৎসায় হাসপাতালের গেটে। ধনী, শিল্পপতি, ডাক্তার, আমলা, সরকারের মন্ত্রী, সচিবের স্ত্রী, সাংবাদিক,করোনার মাঠের যোদ্ধা পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা প্রাণ হারাচ্ছেন করোনায়। সংক্রমনে করোনা উৎপত্তি দেশ চীনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কেন আজ এই পরিণতি? করোনাতো উড়তে পারে না যে, আমাদের দেশে বাতাসের সঙ্গে চলে এসেছে। এ যেন দাওয়াত দিয়েই আনা হয়েছে। বিদেশ ফেরত প্রবাসী যাত্রীদের অবাধে দেশে প্রবেশের সুযোগ, যথা সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেয়াই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের জন্য করোনার ভয়াল থাবা।
প্রথম থেকেই আমলাদের মুখে আমাদের প্রস্তুতির আস্ফালন, দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের মুখে আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী এসব কথাবার্তাই আজ রাষ্ট্র ব্যবস্থা করোনা মোকাবেলায় একটি কঠিন চ্যালেন্জের মুখে দাড় করিয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। আমাদের প্রস্তুতি আর চিকিৎসা সেবা কেমন তা প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিলে লাশের স্তুপ আর আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধিই বলে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য বিষেশজ্ঞ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেরই প্রশ্ন রাষ্ট্র চালাচ্ছেন কারা? রাজনৈতিক সরকার না আমলারা? গত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে একটি ভুল সুধরাতে আরেকটি ভুল, ভুলের পর ভুলের মধ্যে যেন করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হচ্ছে।
সরকারের তথ্য মন্ত্রীর দাবি সরকার ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে সাড়ে তিন কোটির বেশীর মানুষের কাছে ত্রাণ সহায়তা পৌছে দেয়া হয়েছে, অপরদিকে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহম্মেদ এর দাবি বিএনপিও ৫০লাখ পরিবারের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে। তবে সংকটটা কোথায়? অন্যদিকে ব্রাকের এক জরিপে দাবি করা হয়েছে, করোনাকালিন সংকটে ত্রাণ পাওয়ার মতো ৭৫ শতাংশ মানুষের মাঝে সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌছেনি। তবে যাদের অসহায়ত্বের দোহাইয়ে দেশে কারফিউ দিয়ে স্থবির করা হয়নি, তাদের ভাগ্যেই যদি ত্রাণ সামগ্রী না পৌছায় তবে কি লাভ হলো ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি দিয়ে?
ত্রাণ পৌঁছানো আর না পৌছানো নিয়ে বিতর্ক যাই থাকুক, দেশের কর্মহীন বেশীরভাগ পরিবারের মাঝে সরকার ত্রাণ পৌছে দিয়েছে। তবে বাস্তবতা কি তা আজ ভুক্তভোগীরাই হারে হারে টের পাচ্ছন। একদিকে অসুস্থ মানুষের বিনাচিকিৎসায় মৃত্যু আর রোগী নিয়ে হাসপাতালের গেটে গেটে ধর্না অন্যদিকে মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসটাও একশ্রেণির অসাধু মুনাফাখোর সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সেবার বেহাল অবস্থার চিত্রটা চাকচিক্য, যেনো মোজাইকের কবরের ভেতরের মাংশহীন মুদ্দারের কংকালের মতো ফুটে উঠেছে। দেশে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বিশ্লেষক এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মনে প্রশ্ন, করোনা মোকাবেলায় সরকারের এ সিদ্ধান্তগুলো দিচ্ছেন কারা? রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রী না আমলারা? কাদের কথায় বিশ্বাস করে সরকার আজ করোনা মহামারির মোকাবেলায় বিপর্যস্ত হয়ে পরেছেন।
যে ভুল সিদ্ধান্ত গুলোর কারণে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে :-
১.বিদেশ ফেরত প্রবাসী বা সেই দেশের পাসপোর্ট নিয়ে আসা বাংলাদেশী নাগরিকদের সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে তিন সপ্তাহের কোয়ারান্টাইন বাধ্যতামূলক করতে না পারা।
২.প্রবাসীদের করোনা টেষ্ট না করে হাট বাজারে অবাধে ঘুরতে দেয়া।
৩.তিন দফায় ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি কি কারণে কেন? তার গুরুত্ব জনসাধারণকে বুঝাতে না পারা। ছুটির পর ঢালাওভাবে গ্রামে যাওয়া আসা করতে দেয়া।
৪. ৮ মার্চ প্রথম ৩ জন সনাক্তের পর পরই আক্রান্ত এলাকাগুলো পুরোপুরি লকডাউন না করা।
৫.দেশে যুদ্ধ অবস্থা বিরাজ না করলে জরুরী অবস্থা জারির সুযোগ বর্তমান সংবিধানে না থাকলেও সংসদ যেহেতু বহাল আছে তাই অধিবেশন ডেকে সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কারফিউ দিয়ে সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে পুলিশ ও র্যাব’র সাহায্যে যাদের ত্রাণ প্রয়োজন তাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা না করা। পাশাপাশি সংক্রমিত এলাকায় টেষ্ট এর ব্যবস্থা না করা।
এভাবে এক অথবা দেড় মাস মানুষকে ঘরে রাখতে পারলেই বিশ্বে আজ আমরা ভিয়েতনাম বা দঃকোরিয়ার মতো করোনা মোকাবেলায় সাফল্যের নজির স্থাপন করতে পারতাম।
সরকার ৮ মার্চ প্রথম ৩ জন করোনা রোগী সনাক্তের ঘোষনা দিলো। ১৮ মার্চ প্রথম ১জন মৃত্যুর ঘোষণা দেয়। ওই দিনই ২৯মার্চের পর থেকে দফা দফায় ৬৬ দিন ৫ জুন পর্যন্ত সাধারণ ছুটি দেয়া হলেও সারাদেশকে সংক্রমণ ঝুকিপূর্ণ বলে জনগণকে ঘরে আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করা।
অর্থনীতি সচল রাখতে বা খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কথা বিবেচনা করেই আস্তে আস্তে সব খুলে দেয়ার ফলে দেশে মৃত্যু ও সংক্রমণ দুটোই বাড়তে থাকে। সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশ চীনকেও পেছনে ফেলে দেয়। তিন মাসেরও বেশী সময় পার করে দেয়ার পর লাল, হলুদ আর সবুজ জোন ভাগ করে পুরোপুরি লকডাউন করে পরীক্ষা চলছে সফলতা নিয়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি তিন চার কোটি লোকের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তবে এই ত্রাণ কি কারফিউ দিয়ে পৌছানো যেতো না? এ ছাড়া মার্চ মাসের ৩য় সপ্তাহ হতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা হওয়ায় বেশীর ভাগ বেসরকারি অফিস প্রতিষ্ঠান, দোকান কর্মচারী ও গার্মেন্টস কর্মীরা বেতন না পেয়ে খালি হাতে দীর্ঘ সময় ঘরে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। যেখানে প্রথম সনাক্তের প্রায় তিন সপ্তাহ পর সাধারণ ছুটির ঘোষণা দেয়া হলো। তা কি ১ এপ্রিল থেকেই দেয়া যেতো না? সাধারণ ছুটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি অফিস প্রতিষ্ঠান, দোকান কর্মচারী ও গার্মেন্টস কর্মীদের বেতন ৩১ মার্চের মধ্যে পরিশোধ করে দেয়ার অনুরোধ সরকার করতে পারতেন না? মাত্র দুটি মাস কষ্ট করলে আমরা বেঁচে থাকতে এবং দেশকে ২শ বছর এগিয়ে নিতে পারবো এমন অনুরোধ কি সরকার জণগনের কাছে রাখতে পারতেন না? ছুটির পর ছুটি করোনা থেকে মুক্তি দেয়নি। মানুষের মনে এ যেন এক অদেখা সাগর পাড়ি দেয়ার মতো গন্তব্য মনে হচ্ছে। তাই চার পাশে ক্ষোভ বাড়ছেই। সীমিত আকারের দোহাইয়ে সব খুলে দিয়ে করোনার তান্ডবকে লাগামহীন পাগলা ঘোড়া বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এর শেষ পরিণতি কি তা সময়ই বলে দিবে।
Developed By Muktodhara Technology Limited