শিরোনাম
এস এম শাহেদ হোসাইন ছোটন,বোয়ালখালী প্রতিনিধি | ১৭:২০, মে ২১, ২০২১
আবদুল মাহিরের বয়স মাত্র চার মাস। নানীর কোলে কাঁদছে মাহির। কেননা মাহিরের পাশে মা নেই। মা চলে গেলেন পরকালে। গত শনিবার (১৫ মে) রাত ১১ টার দিকে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার মধ্যম চরণদ্বীপ শরীফ পাড়ার সাইর মিয়া মেম্বারের বাড়ি থেকে লুৎফুন নাহার পুতুল (২৮) নামে ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে বোয়ালখালী থানা পুলিশ।
নিহত পুতুলের আবদুল মুমিন (৭) ও আবদুল মাহির ৪ মাস বয়সী সন্তানসহ দুই সন্তান রয়েছে। মাকে হারিয়ে দুই সন্তানের কান্না সবাইকে আবেগাক্রান্ত করছে। একে পরিকল্পিত হত্যা বলে অভিযোগ করে নিহতের পরিবার। পরিবার জানায়, বোয়ালখালীর মধ্যম চরণদ্বীপ শরীফ পাড়ার সাইর মিয়া মেম্বারের বাড়ির জৈনিক আবদুর সালামের পুত্র প্রবাসী আবদুল মালাকের সাথে একই উপজেলার সারোয়াতলী ১নং ওয়ার্ডের আবুল বশরের মেয়ে লুৎফর নাহার পুতুলের বিয়ে হয় ৮ বছর আগে।
নিহত পুতুলের মা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমার একমাত্র মেয়ে পুতুল। আল্লাহর কাছে অনেক প্রার্থনা করে আমার পুতুলকে পেয়েছি।বিয়ের পর থেকেই সে আমাদের বাড়ীতে থাকতো । এবার ঈদের শবে কদরের আগের দিন স্বামীর আদেশ রক্ষা করার জন্য শাশুর বাড়ীতে যায়। আমার মেয়ে মারা যাওয়ার এক ঘন্টা আগে আনুমানিক রাত সাড় ৯টার সময় আমার সাথে মোবাইলে কথা বলেছিল। আমার মেয়ে ওই সময় বলে, ছেলেদের খাওয়া দাওয়া নিয়ে আমার শাশুড়ি যন্ত্রণা দিচ্ছে। বিষয়টি আমি ফোনে প্রবাসে জামাইকে জানালে সেও ফোনে ক্ষিপ্ত হয়ে উল্টাে পুতুলকে গালাগাল করে। আমার মেয়ে নিজে আত্নহত্যা করতে পারে না। আমার মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে দ্রুত পুতুলের শাশুর বাড়ীতে গিয়ে মেয়েকে যে অবস্হায় দেখতে পাই, আমার মেয়ের শরীরের বিভিন্নস্হানে আঘাতের চিহ্ন। এটিকে আত্নহত্যা বলা যায় না। ৮ বছরের মধ্যে ১বছরও স্বামীর বাড়ীতে থাকতে পারেনি পুতুল।
পুতুলের বিয়ের পর থেকে তার স্বামী প্রবাসে থাকায় এবং স্বামীর অবর্তমানে শ্বশুরবাড়ির লোকজন পুতুলের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাত। একপর্যায়ে পুতুল স্বামীর পরামর্শে বাপের বাড়ীতে চলে যায়।
পুতুলের মা আরও বলেন, আমার মেয়েকে মেরে ফেলে পুতুলের দুই সন্তানকেও নিয়ে যায়। পরে স্হানীয় এক নেতার মাধ্যমে দুই সন্তানকে তারা ফেরত দেয়।
এ ব্যাপারে পুতুলের ৭ বছরের পুত্র আবদুল মোমিন প্রতিবেদকে বলেন, আমার আম্মু আল্লাহর কাছে চলে গেছে। আমি আমার আম্মুকে খুব মিস করছি। আমি আমার ভাইকে নিয়ে বাঁচতে চাই। আমার দাদু আমার আম্মুকে সব সময় গালি দিত। আমি দরজার ফটক দিয়ে দেখেছি আমার আম্মুকে ৫ জন মিলে মেরেছে।
৫জন কে জানতে চাইলে মোমিন বলেন, আমার দাদু, ডলির মা, ছোট আম্মু, ডলির বাবা ও মনজু। এই ৫ জন মিলে আমার আম্মুকে মেরে ফেলেছে।
কিভাবে মেরেছে জানতে চাইলে মোমিন বলেন, ২জন আমার আম্মুকে হাত-পা চেপে ধরেছে আর ৩ জন আমার আম্মুর গলা টিপে মেরে ওড়না দিয়ে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিয়েছে। আমি সবাইকে ডাকতে গেলে আমার দাদু আমাকে ভয় দেখায় বলে তোকেও মেরে কর্ণফুলির নদীতে ভাঁসিয়ে দেব।
মোমিন বলে, আমার আম্মুকে যেভাবে মেরেছে তাদেরকেও একই ভাবে শাস্তি দিতে হবে। আমি তাদের বিচার চাই।
রবিবার(১৬ মে) বিকেলে বোয়ালখালী থানায় নিহত লুৎফুন নাহার পুতুলের মা জান্নাতুন ফেরদৌস বাদী হয়ে আত্নহত্যা প্ররোচনার অপরাধে মামলা করেন।
নিহত লুৎফুন নাহার পুতুলের শাশুড়ি মনোয়ারা বেগম (৫০)কে প্রধান আসামী করে দায়ের করা মামলায় ২নং আসামী শাবনুর আক্তার, প্র: নুপুর (২৪), স্বামী – মোঃ আইয়ুব, গ্রাম -মধ্যম চরণদ্বীপ, ০৭ নং ওয়ার্ড, শরীফ পাড়া, ( সাইর মিয়া মেম্বারের বাড়ী, চরণদ্বীপ ইউপি, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম। ও ৩ নং আসামি মোঃ আব্দুল মালেক ( ৩৫),পিতা- মৃত আব্দুস সালাম, গ্রাম -মধ্যম চরণদ্বীপ, ০৭ নং ওয়ার্ড, শরীফ পাড়া, ( সাইর মিয়া মেম্বারের বাড়ী, চরণ দ্বীপ ইউপি, বোয়ালখালী সহ ২ জন অজ্ঞাতনাম আসামি করা হয়েছে।
৩০৬/৩৪ পেনাল কোড-১৮৬০; আত্নহত্যা প্ররোচনা দানের অপরাধে মামলা দায়ের হয়েছে বলে বোয়ালখালী মামলা সূত্রে জানা যায়। পুতুলকে হত্যার পর শাশুড়ি মনোয়ারা বেগম ও পুতুলের স্বামীর পরিবারের সবাই পালিয়ে যাওয়া ,মর্গ থেকে লাশ গ্রহণ করতে কেউ না যাওয়ার কারণে হত্যার বিষয়টি আরো জোরোলো হচ্ছে।
গত (১৬ মে ) রবিবার ময়না তদন্তের পর সারোয়াতলী বাপের বাড়ীতে মাগরিবের নামাজের পর জানাজা শেষে পুতুলকে চিরনিদ্রায় শায়িত করেন পরিবার।
বোয়ালখালী থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আবদুল করিম বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুতুলের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়না তদন্তের জন্য তার লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আসামীরা পলাতক আছে ।তাদের গ্রেফতার করতে অভিযান অব্যহত আছে।
Developed By Muktodhara Technology Limited