শিরোনাম
শিব্বির আহমদ রানা | ২২:৫৮, এপ্রিল ১৭, ২০২০
খেলাটি গ্রামের ছোট বাচ্চারা, বৌ-ঝিরা কাগুজের ঢালে খেলতো। চার জন প্লেয়ার গোল চক্কর দিয়ে বসে এ খেলায় মজে যেতো নিমিষেই। নিশ্চই বুঝতে পারছেন খেলাটির নাম 'লুডু'। বাংলাদেশের অতীব প্রাচীন জনপ্রিয় একটি খেলা। অনেকে এটাকে 'লুডো' খেলা বলে জানে। এখন আর আগের মতো নেই এ খেলার স্বরুপ। ধরনে পরিবর্তন আসেনি, চক্কর রুপরেখা ঠিকই আছে। গুঁটিতে চার-চক্কা ঠিক আগের মতো আছে। পরিবর্তন এসেছে ডিজিটালে। ঠিক আগের মতোই সব পদ্ধতি আছে। পরিবর্তন হয়েছে কাগুজের ঢালের। এখন খেলাটি বেশ জনপ্রিয়, বহুল পরিচিতি পেয়েছে গ্রাম থেকে শহরে। বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে, চায়ের দোকানে, পার্কের খোলা জায়গায়, রাস্তার ধারে সন্ধ্যার আগমনে, দোকানে কাজের ফাঁকে অবসরে।
এখন সবার হাতে হাতে মোবাইল। একটি টার্চস্ক্রিন মোবাইল মানেই একটি 'লুডু' খেলার মাঠ/ক্ষেত্র। গ্রামের রন্দ্রে রন্দ্রে ছোট-বড়, ছেলে-মেয়ে সবাই মজেছে এ খেলায়। এটি আর এখন বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ব নেই। বিশেষ করে যুবক শ্রেনীর লোকগুলো রীতিমতো এ খেলায় এডিক্টেড। এরা লোক চক্ষুর অগৌচরে, কিংবা প্রকাশ্যে বাজি ধরেই গেইম খেলে। যেন এক গ্রামিণ কেসিনো। টাকার বাজিতে খেলতে খেলতে 'লুডু' আর সামাজিক খেলার গন্ডিতে আবদ্ব নেই। লুডু এখন নিরেট জোয়া খেলা। এ খেলায় চরমভাবে মত্ত হচ্ছে সমাজের একটি বড় অংশ কিশোরের দল। এরা নানা অপকর্ম করে বসে। জমায়েত হয়ে খেলা শেষে চলে চুরি-চামারির মতো নানা পরিকল্পনা। এদের উপদ্রব এখন রাস্তার মোড়ে, রাতের আঁধারে খোলা নিরিবিলি জায়গায়, চা-দোকানের গোপন অাস্তানায়। ধীরে ধীরে বাজির খেলায় নেশাসক্ত হয়ে পড়ছে তারা। মদ, ইয়া, হিরোইন সেবনে মেতেছে কিশোরের দল। নতুন রুপে এদের নাম হয়েছে 'কিশোর গ্যাং'। একটি টার্চ মোবাইলের বদৌলতে এ খেলার বেড়ে চলেছে রাম-রাজত্ব। ধীরে ধীরে সামাজিক মুল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। নীতি-নৈতিকতার অধঃপতন হচ্ছে। কিশোর অপরাধ বেড়েই চলছে। অাইন-শৃঙ্খলার অবণতি হচ্ছে। কলুষিত হচ্ছে সমাজের মু্ল্যবোধ। বেকার যুবকের এ 'লুডু' খেলা সমাজের জন্য যেন এক অশনিসংকেত।
সারাদেশজুড়ে চলছে করোনা আতংক। বলা হচ্ছে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে। সঙ্গত্যাগ করে, দূরত্বের গুরুত্ব বজায় রাখতে বলেছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সম্প্রতি বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ অভিহিত করে লকডাউন ঘোষণা করেছে। জেলা, উপজেলা, শহর-নগর, গ্রাম কিংবা পাড়া মহল্লায় চলছে যৌথবাহিনীর তল্লাসি। নিজে বাঁচুন, অপরকে বাঁচান, বাড়িতে থাকুন, নিরাপদে থাকুন- কিন্তু কে শুনে কার কথা। দিন যাচ্ছে গতর হয়ে নভেল করোনা ভাইরাসে বাড়ছে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা, থেমে নেই মৃত্যুর মিছিল। নিতান্ত বাধ্য হয়ে ঘরে থাকা মানুষগুলো এ কঠিন সময়ে দমেনি একটুও। থেমে যায়নি তাদের অপকর্ম। হাতের স্মার্টফোন টা নিয়ে রাতের আঁধারে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, গোপনে চায়ের দোকানে, মাছের-বাগান বাড়ির প্রজেক্টের মাঁচা কিংবা টঙে লুডুতে মজেছে একশ্রেণীর লোকজন। থাকছেন হোমকোয়ারেন্টাইনে! কিন্তু চলছে টার্চ মোবাইলে লুডু খেলার আড্ডা। এ খেলায় মজে তাদের নেই করোনার ভয়। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, কিশোর, যুবক সকলেই মগ্ন লুডুতে। বিশেষজ্ঞের মতে, যেখানে করোনা একটি ছোঁয়াচে রোগ! হাঁচি-কাশিতে ছড়ায়। কোন কিছু স্পর্শ করাতে করোনার ভয় হয়, সেখানে টার্চ মোবাইলে আঙ্গুলের টিপ্পনীতে গেইম খেলেছি নাকি করোনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এসেছে- কোন ধাতব পদার্থে করোনার জীবাণু নয় দিন পর্যন্ত জীবিত থাকে। আর টার্চফোন সে তো জিবাণুর উত্তম বাহক। লুডুর আড়ালে করোনার সাথে জীবন নিয়ে খেলছি না তো?
উপজেলার বাঁশখালীতে কিছু বখাটে যুবক শ্রেনীর উৎপাত এখনো বন্ধ হয়নি। অভিযোগ উঠেছে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম্য চায়ের দোকানের ভিতরে, রাস্তার মোড়ে, গোপন আস্তানায় মেতে উঠেছে জুয়া খেলায়। মোবাইলে গেইম খেলা চলছেই অবিরত। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বারদের বাধা-নিষেধকে উপেক্ষা করে চলছে কিশোর গ্যাংদের আড্ডা। লুডু'কে বানিয়েছে জুয়ার উপকরণ। টাকার বাজিতে খেলছে মোবাইলের পরিচিত এই গেইমটি। যুব-সমাজের বেপরোয়া বেড়ে চলছে দিন দিন। এরা জমায়েত হয়ে রিতীমতো আড্ডা দিয়ে যাচ্ছে। করোনার কঠিন সংকটময় সময়ে গ্রামিণ কেসিনো খ্যাত- জুয়া, লুডু, দাবা'র দাপট বন্ধ হয়নি। টার্চফোনেই চলছে দেদারছে লুডু খেলা।
Developed By Muktodhara Technology Limited