শিরোনাম
ঢাকা ব্যুরো | ২১:০৫, অক্টোবর ২০, ২০২০
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগে গত দুই বছরে একাধিক নবজাতক শিশুকে মৃত্যু সনদ দেয়ার পর কবরস্থানে দাফনের সময় জীবিত হয়ে আবার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এমন ঘটনা ঘটেছে। এরপর বার বার তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও চিকিৎসকদের দায়িত্বহীনতা বা ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্হা নেয়ার কথা জানাতে পারেনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
২০১৮ সালের ২৩ এপ্রিল এক নবজাতককে মৃত ঘোষণার পর আজিমপুর কবরস্থানে দাফনের আগে গোসল করানোর সময় নবজাতক চিৎকার করে উঠলে প্রথমে আজিমপুর মাতৃসদন কেন্দ্রে পরে সেখান থেকে আগারগাঁও শিশু হাসপাতালে নেয়া হলে আড়াই দিন জীবিত থাকার পর শিশুটি মারা যায়। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা গত দুই বছরেও প্রকাশ করা হয়নি।
একইভাবে এবছর গত ১৬ অক্টোবর ( শুক্রবার) আরেক নবজাতক দাফনের পূর্বে জীবিত থাকার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ঘটনাটি দেশের সকল সংবাদ মাধম্যে প্রচার হলে এবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। হাইকোটে একটি রিটও দায়ের হয়। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। যাতে তাদের দায়িত্বের বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আনা যায়। এছাড়া গত দুই বছরের বেশী সময় ধরে ঢামেক কর্তৃপক্ষ নবজাতকের মৃত্যুর সনদ সাদা কাগজে কোন চিকিৎসকের সীল ছাপ্পড় ছাড়াই দিয়ে আসছে। এতে করে ঢাকার বিভিন্ন কবরস্থানে লাশ দাফনে জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেলে নবজাতককে মৃত ঘোষণা পর দাফন করার সময় নড়েচড়ে উঠার ঘটনায় হাসপাতালের চিকিৎসকদের ব্যর্থতার দায় স্বীকারের পাশাপাশি চিকিৎসকদের কোন অবহেলা ছিলো না বলে দাবি করা হয়েছে এবং চিকিৎসকসহ সবারই চেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিলোনা বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন।

মঙ্গলবার দুপুরে ১৬ অক্টোবরের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের সভাকক্ষে আয়োজন করা হয় সংবাদ সম্মেলন।
সম্মেলনে হাসপাতালটির পরিচালক বলেন, শাহিনুর বেগম নামে ওই রোগীকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তখনই তার কনডিশন ভালো ছিলোনা। আস্তে আস্তে তার অবস্থা আরো খারাপের দিকে চলে যায়। এরপর চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেয় এবং তার বাচ্চা প্রসবের চেষ্টা চালায়। শিশুটি ২৬ সপ্তাহের অপরিনত বয়সে ভূমিষ্ঠ হয়। মায়ের গর্ভে ২৮ সপ্তাহ পার হলে বেচে থাকার মত পরিপূর্ণ বয়স পায় বলে তিনি জানান। তবে এই বেবিটি স্বাভাবিক অবস্থায় জীবিত থাকার আগের বয়সেই ভূমিষ্ঠ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ভূমিষ্ঠ হবার পর চিকিৎসক, নার্স নিয়ম অনুযায়ি পর্যবেক্ষণ করেছে বলে তিনি জানান। তবে নবজাতকটির সাইন অফ লাইফ না পাওয়ায় ঘণ্টাখানেক অবজারভেশনেও রাখা হয় নবজাতকটিকে। এরপরই মৃত ঘোষণা করে স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়। এরপরও ৪/৫ ঘণ্টা নবজাতকটি তাদের কাছেই ছিলো বলে তিনি জানান। পরে দাফনের জন্য নিয়ে গেলে সেখানে নড়েচড়ে উঠলে আবার হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। বিষয়টি জানার পর দ্রুত এনআইসিইউ ম্যানেজ করে সেখানে তাকে রাখা হয়।
পরিচালক আরো বলেন, ঘটনার পরপরই বিষয়টি তদন্তের জন্য ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিলো। সেই কমিটিই আজ তাদের তদন্ত প্রতিবেদন ও কিছু সুপারিশ করেছে। তদন্তে উঠে এসেছে জন্মের পর নবজাতকটির কোনো সাইন অফ লাইফ ছিলোনা। এটি একটি রেয়ার (বিরল)কেস। তবে চিকিৎসকদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিলোন না বলে তিনি দাবি করেন। মা ও মেয়ে দুজনকেই বাচানোর চেষ্টা ছিলো তাদের। আনফরচুনেটলি এমনটি হয়েছে বললেও তিনি চিকিৎসকদের ব্যর্থতা রয়েছে বলে জানান। যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এই ঘটনায় আদালতে রিটের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখান থেকে আরো তদন্ত করার বিষয় আসে তাহলে সেটিও করা হবে।
ঢামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দীন বলেন, বিশ্বে অনেক দেশেই এমন ঘটনা ঘটে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ইনম্যাচিউড বেবি, সাপে কাটা রোগী, বিদ্যুৎপৃষ্টের রোগীর ক্ষেত্রেও এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে বলে তিনি জানান।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের অনেকগুলি প্যারামিটার আছে যেগুলো দিয়ে আমরা বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হবার পর পরীক্ষা নিরীক্ষা করি, এই নবজাতকের বেলায় তার সবই করা হয়েছিলো, তবুও তারা নবজাতকটির কোনো সাইন অফ লাইফ পায়নি। ওই সময়ে যে চিকিৎসক ও নার্সরা কাজ করেছে তারা হয়তো আগে কখনো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি। এই ঘটনায় কারো নেগলেন্সি, দায়িত্বহীনতা তদন্তে পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন। তবে তাদের শতভাগ চেষ্টা ছিলোনা বলে তিনি মনে করেন, তাদের ব্যর্থতা থাকলেও তা অনিচ্ছাকৃত বলে তিনি জানিয়েছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ট্রেনিং প্রোগ্রামের বিষয়েও নানা সুপারিশ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, আমরাই এই ঘটনার পুরো দায় নিচ্ছি, আমরা মিস করেছি, এটি আমাদের ব্যর্থতা, যার যেখানে দায়বদ্ধতা আছে সেটা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এসময় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত তদন্ত কমিটি ও হাসপাতালটির নবজাতক বিভাগের প্রধান ডাঃ মনীষা ব্যানার্জী বলেন, শিশুটি এখন অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে ও সেলাইন চলছে। আগের চাইতে ভালো আছে। আমরা তাকে মুখে খাবার খাওয়ানো শুরু করবো। শিশুটি বেচে গেলেও আশ্চর্যজনক হবে। আমরা আশাবাদি। তবে এখনও শিশুটির ইনফেকশনের আশংকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিশুটি এখনও শঙ্কটাপন্নই বলা যায়।
তিনি আরো বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করে আমাদের মনে হয়েছে এটি অনিচ্ছাকৃত ভুলের মধ্যে পড়েছে। তবে আমাদের এখানে "নিউনেটালিক" ও "নিউনেটাল প্রেশেন্ট মনিটর" নেই। এগুলো থাকলে এরকম ঘটনা ঘটনার আর কোনো সুযোগ থাকবেনা।
এদিকে সাদা কাগজে মৃত্যু সনদ দেয়ার বিষয়ে হাসপাতালে পরিচালকের মুঠো ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।
Developed By Muktodhara Technology Limited