image

আজ, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২ ইং

ফুটবলের মরা গাঙে কি আবার জোয়ার আসবে ?

ইকবাল কবির    |    ২২:১২, সেপ্টেম্বর ১, ২০২১

image

লেখক : ইকবাল কবির (ফাইল ছবি)

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের ফুটবলে জনপ্রিয়তার যে উত্তাল ঢেউ আর নদীতে যে জোয়ার ছিলো তা এখন আর নেই। ফুটবলের উত্তাল নদী শুকিয়ে এখন দারুণ খরায় ভুগছে। জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাবগুলো জুয়াড়ীদের দখলে। পাড়া-মহল্লায় নেই শতশত উন্মুক্ত খেলার মাঠ।বিকেল গড়ালে দেখা যায়না শিশুকিশোর তরুণদের ফুটবল হাতে মাঠে প্রবেশ করতে।কারণ মাঠ কই? মাঠের জায়গায় বড় বড় মার্কেট, দোকানপাট আর অবৈধ দখলদারদের কবলে। গত কয়েক দশকে এভাবেই ঢাকার পাড়া-মহল্লার খোলা মাঠগুলো হারিয়ে গেছে। যে বয়সে শিশু বর্ধন ও বিকাশের কারণে হাত-পায়ের হাড্ডির কামরানিতে খেলার মাঠে ছুটে যাওয়া কথা সেখানে তাদের থাকতে হচ্ছে চার দেয়ালের গ্রীলের খাঁচায়। এতে করে শুধু শারীরিক বা মানসিক বিকাশেই বাঁধাগ্রস্ত তা নয়, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীর সৃষ্টি হচ্ছে শিশু-কিশোরদের গড়নে।যার ফলে ঢাকার মাঠ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিশু- কিশোরদের প্রিয় ফুটবল খেলাও।

৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ৯০ দশকের মাঝামাঝি ঢাকার পাড়া-মহল্লায় অনুষ্ঠিত হতো শিশুকিশোরদের বিভিন্ন ফুটবল টুর্নামেন্টের জমজমাট আসর। ৭০দশকের মাঝামাঝি ঢাকার বাসাবো মাঠে অনুর্ধ ১৪ বছর বয়স্ক কিশোরদের (৪ফুট ১০ইঞ্চি উচ্চতা) নিয়ে অনুষ্ঠিত হতো সিলভার কাপ (রৌপ্য) ফুটবল টুর্নামেন্ট। প্রাক্তন ফুটবলার আমান সাহেবের অনুপ্রেরণায় এই টুর্নামেন্টে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ক্লাবগুলো অংশগ্রহণ করতো। ৮/১০ বছর নিয়মিত এই ফুটবল টুর্নামেন্টটি অনুষ্ঠিত হতো। কোন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নয়, নিজেরা উদ্যোগী হয়ে এই খেলার আয়োজন হতো।

আশির দশকের প্রথম থেকেই পুরান ঢাকার হাজারীবাগের লেদার ইন্জিনিয়ারিং কলেজ ও হাজারীবাগ পার্ক মাঠে একই উচ্চতা ও বয়সের কিশোরদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হতো জিয়া স্মৃতি কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্টে। একই মাঠে ক্রীড়া সংগঠক শফিকুর রহমান শফিক আয়োজন করতেন বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্ট। টুর্নামেন্টের পাশাপাশি এই সংগঠক নিজেই গড়ে তুলেছিলেন হাজারীবাগ কিশোর ফুটবল কোচিং সেন্টার। তার এই কোচিং সেন্টারে শতাধিক কিশোর ফুটবলার প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও ঢাকার পাড়া-মহল্লার টুর্নামেন্টে অংশ নিতো।

৯০ দশকেও হাজারীবাগ পার্ক মাঠে শাহ্ স্পোর্টস কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের আসর একটানা আট বছর অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।ঢাকার আজিমপুর কমিউনিটি সেন্টার মাঠে বর্তমান আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রহমান বাবলা আয়োজন করতেন অনুর্ধ্ব ১৪ বছরের কিশোর ফুটবল টুর্ণামেন্ট। মোহাম্মদপুর শহীদ পার্ক মাঠে অনুষ্ঠিত হতো অনুর্ধ্ব ১৪ বছর বয়ষ্ক কিশোদের একটি ফুটবল টুর্ণামেন্ট।পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ মাঠে অনুষ্ঠিত হতো গনি মিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের আসর। ঢাকার কোটকাচারি এলাকার নয়াটোলা আয়ল্যান্ড মাঠে বর্তমান আওয়ামীলীগ ও ঢাকাবারের আইনজীবী নেতা নাজিবুল্লাহ হিরুর সহযোগিতায় তার এলাকার তরুণরা নিয়মিত আয়োজন করতো শহীদ শেখ রাসেল স্মৃতি কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্ট। ঢাকার ধোলাইপাড়, যাত্রাবাড়ী, টিকাটুলি, কমলাপুর, গোলাপবাগসহ ঢাকার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার খেলার মাঠগুলোতে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো বয়স ভিত্তিক কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্ট। আর এই নিয়মিত কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা জয় করা পাড়া মহল্লার ক্রীড়া সংগঠকদের একটি নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এ যেনো মর্যাদার লড়াই হয়ে উঠেছিলো কাপ জয়ের নেশায়। তাই ঘরেরটা খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানোর মতোই ঢাকার আনাচে-কানাচেতে গড়ে উঠেছিলো ফুটবলের নিবেদিতপ্রাণ কিছু এ ক্রীড়া সংগঠক। যাদের নেশাই ছিলো শিশুদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিশালী টিম তৈরী করে এলাকার হয়ে ভিন মহল্লা থেকে শিরোপা জয় করে এলাকার সুনাম তৈরী করা।

পুরান ঢাকায় ফুটবল সংগঠক ছিলেন হাজারীবাগ বটতলা এলাকার সোনা মিয়ার টিম, গণকটুলি এলাকার শফিকুর রহমান শফিকের হাজারীবাগ কিশোর ফুটবল কোচিং সেন্টার, বাড্ডানগর লেনের আবুল কালাম ডাড্ডুর কিশোর ফুটবল টিম, আজিমপুর কিশোর একাদশের আব্দুর রহমান বাবলা, আমলিগোলার আফসার উদ্দীন আফসুর আমলিগোলা সবুজ সংঘ, লালবাগের জাহাঙ্গীরের লালবাগ তরুণ সংঘ, তেজগাওয়ের আলতাফ হোসেনের ন্যাশনাল কিশোর ফুটবল ট্রেনিং সেন্টার, মীরপুর কিশোর ফুটবল একাদশের মানু, ইস্কাটন সবুজ সংঘের বাবুল, ধলপুর গোলাপবাগের জুলহাস ও গোলাপ, স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানার সোহরাব, কমলাপুর বৌদ্ধ বিহারের কিশোর ফুটবল টিম, লালবাগের সরকার জি কিশোর ফুটবল টিম। পরবর্তীতে ধোলাইপাড়ের মনসুর স্পোটিং ক্লাব। এরা মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজেরাই কিশোর ফুটবল টিম গঠন ও বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়োজন করতেন নিয়মিত। পাড়া-মহল্লায় এ ধরণের টুর্নামেন্টের কারণে এলাকায় শিশুকিশোরা আকৃষ্ট হতো ফুটবলে। সেই সঙ্গে ফুটবলের জনপ্রিয়তায় ভুমিকা থাকতো মহল্লা ভিত্তিক টুর্নামেন্টেগুলোর।

আশি-নব্বই দশকে ঢাকার পাড়া-মহল্লার কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্টগুলোর কারণেই ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশ শিশু কিশোর ক্রীড়া ফেডারেশন প্রথম ঢাকায় কিশোর ফুটবল লীগের আয়োজন করে। প্রায় শতাধিক দল কিশোর ফুটবল লীগে অংশ নেয়ায় সারা দিলেও বাছাই করে ২৪টি দল নিয়ে কিশোর লীগের আয়োজন করা হয়। এ যেনো ঢাকার ফুটবল জনপ্রিয়তায় এক নতুন মাত্র যোগ করে দিয়েছিলো। ঢাকার ফুটবল লীগে মোহামেডান-আবাহনীকে ঘিরে যেমন উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছিলো তেমনি পাড়া-মহল্লার কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন ফুটবলে জোয়ার সৃষ্টি করেছিলো।

১৯৮০ সালেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন চালু করে পাইওনিয়ার ফুটবল লীগ। প্রথম বছরে ঢাকার ৮০টি কিশোর ফুটবল দল অংশ নিয়েছিলো। ঢাকার ফুটবল জনপ্রিয়তার নেপথ্যে পাড়া-মহল্লার টুর্নামেন্টেগুলোর অবদান ছিলো। ছিলো বহু উন্মুক্ত খেলার মাঠ। ৭০দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ৯০দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ঢাকার ফুটবলের ছিলো স্বর্ণ যুগ। ফুটবলের উত্তাল জোয়ারে ভাসতো গোটা ঢাকা। সময়ের ব্যবধানে আজ হারিয়ে গেছে ঢাকার ফুটবল সেই পাগল সংগঠকরা, হারিয়ে গেছে উন্মুক্ত খেলার মাঠগুলো। বিকেল হলে এখন আর দেখা যায় না স্কুল শেষে কিশোরদের দল বেঁধে হাতে ফুটবল নিয়ে মাঠে যেতে। শোনা যায়না পাড়া-মহল্লায় ফুটবল ফাইনালে দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকার গো---ল। তাই তো নেই আজ ঢাকার ফুটবল লীগের জৌলুশ।

লেখক : ইকবাল কবির, সাংবাদিক ও ক্রীড়া বিশ্লেষক।



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

১৮:০৯, মে ১২, ২০২২

বজ্রপাত হচ্ছে-সাবধান হই


Los Angeles

১২:২৮, অক্টোবর ৭, ২০২১

“কয় জন ভালো নয়, সয় জন ভালো হয়”


Los Angeles

০০:৫৯, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২১

বাংলাদেশের ফুটবলের কলংকিত দিন ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর !


Los Angeles

১১:৩৪, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১

প্রকৃতিতে নয়, কেবল কাগজের নোটেই আছে ‘জাতীয় পাখি দোয়েল‘


Los Angeles

২২:১২, সেপ্টেম্বর ১, ২০২১

ফুটবলের মরা গাঙে কি আবার জোয়ার আসবে ?


Los Angeles

২৩:০৮, আগস্ট ১৫, ২০২১

শাসক নয় বঙ্গবন্ধু আপাদমস্তক সেবক ছিলেন


Los Angeles

১৮:৫৭, আগস্ট ১৩, ২০২১

আড্ডা যেন এক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়


Los Angeles

০০:০৪, আগস্ট ৮, ২০২১

বাইরে মুক্তির কল্লোল ও বন্দী একটি পরিবার


image
image