শিরোনাম
ফজলুর রহমান | ১৮:০৯, আগস্ট ৩, ২০১৯
ফজলুর রহমান ::: তুলনার রাজ্যটা বড় দাপুটে। বড়ই বিধ্বংসী বিচরণ এই রাজত্বের। ফলে প্রিয়ার রূপ হয় চাদের ন্যায়। ঘনচুল কালো মেঘের উপমা পায়। কারো হৃদয় সাগরের বিশালতার সাথে তুল্য হয়। কারো মূল্য হীরার চেয়েও দামী হয়।
তুলনার কবলে পড়ে কখনো সৃষ্টির সেরা জীবও নিচের কাতারে নামে। আমরা বলি, 'ওতো মানুষ নয়, ফেরশতা'। কিংবা বলা হয়, 'ও আমার জীবনে সাক্ষাৎ দেবদূত হয়ে এসেছে'। অথবা আরো অন্যভাবে, 'যেন সে এক এঞ্জেল'।
আশরাফুল মাখলুকাতের আকার আছে। আর ফেরেশতা, দেবদূত কিংবা এঞ্জেল যাই বলুন না কেন আপনি তাদের আকার পাবেন না। ধরতে পারবেন না। চিনতে গেলেও না।
তবে বেশি হতাশ হওয়ার আগে আপাতত তিনটি নাম পড়ুন-দরবেশ, মায়া ও আদর। মানুষের মাঝে ফেরেশতাময় উপস্থিতি পাবেনই পাবেন এই তিননামে। বাইরে থেকে দেখবেন, কেবলই মনে হবে নিষ্পাপ তিনটি মুখ। হাতে পেতে পারেন তিনটি সাদা খাতা, যদি খুলতে পারেন ওই তিনটি বুকের সিন্দুক। তিনজনের আমলনামায় যে কালো দাগ দেননি দয়াময় খোদা!
দরবেশকেই চেনাবো আগে। এই দরবেশের দাড়ি-টুপি নেই। সুফিয়ানা আলখাল্লাও নেই। এমনকি হালের কোন কেলেঙ্কারির কারণে বিদ্রুপে তাকে দরবেশ ডাকলেও বড় পাপ জমবে আপনার।
এই দরবেশের বয়স দশ বছরও পার হয়নি। পরনে হাফপ্যান্ট। সাথে সহজ জামা। ঘুম নেই তার চোখে৷
এক দুই ঘন্টা নয়। এক কিংবা দুই দিনও নয়। দিনের পর দিন এমন নির্ঘুম যাচ্ছে তার। চোখের নিচে কালি পড়েছে। শরীরে না ঘুমানোর চাপ পড়েছে। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ পড়েছে। স্থির বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টার।
কথা বুঝতে পারে, বলতে পারে না। খাবার খেতে পারে চাইতে পারে না। আদর নিতে পারে, অনাদরে কাঁদতে পারে না।
এই দরবেশকে আদর করবেন তো আপনার বুকটা ভরে যাবে। তাকে কোলে নিবেন তো ফেরেশতার স্পর্শ নেয়া হবে। অবশেষে তাকে ফেলে আসবেন তো চোখ ভেসে যাবে জলে।
দ্বিতীয় এঞ্জেলের নাম দিলাম মায়া। শিশুকালের বয়স যেন তাকে পেয়ে বসেছে। কিছুতেই যেন তাকে বাড়তে দিবে না। শিশুর সারল্যতা তাকে ছাড়তে নারাজ। তার ঠোঁটে হাসি পেতে হলে আপনাকে হাসতে হবে। তার চোখে খুশি আনতে হলে আপনাকে খুশি ভাব আনতে হবে আগে। তার মুখে কথা চাইলে আপনাকে বলে যেতে হবে কথার পর কথা।
এই হাসি, এই খুশি, এইসব কথার ঝুড়ি পায়ে দলে ফিরতে চাইবেন তো আবেগে ভাসবেন। স্বর্গীয় আবেগ বলে যাহারে।
শেষেরজন আদরকে চেনা বড় মুশকিল। বাইরে তার স্বাভাবিক আবরণ। ভিতরে জ্বলছে অস্বাভাবিকতার আগুন। খেতে চায়, তবে একা নয়। গিফট পেতে চায়, তবে হাত টেনে নয়। ঘুমুতে চায়, তবে ঘুম পাড়িয়ে না দিলে নয়।
এই আদুরে দেবদূতের মাঝে কত না গল্প! চোখে দেখা পারিবারিক নানা ঝড়, মনের মাঝে আঁকা অবহেলার অনেক ছবি, শরীর জুড়ে থাকা অনাদরের গাঁথুনি- সব ষষ্ঠ ইন্দিয় সহযোগে হয়তো বুঝতে পারে। কেবল পারেনা প্রকাশ করতে।
তাহলে এই দরবেশ ভাব, এই মায়ার আলো, এই আদরের হাসি কেবলই কি স্রষ্টার জন্য তুলে রাখা। স্রষ্টাই যেন তাদের হয়ে বলবেন, তাদের হয়ে হাসবেন, তাদের হয়ে প্রকাশিত হবেন। ফেরেশতা কিংবা দেবদূত অথবা এঞ্জেলরা এভাবেই তো থাকেন নিত্য। আড়ালে স্রষ্টাকে রেখে দূতিয়ালিতে থাকেন তারা।
তো এক ছাদের নিচে আমি আজ এই তিন ফেরেশতাকে দেখেছি। চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি বিশেষায়িত স্কুলে। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় যার অবস্থান। নাম যার- উই কেয়ার অটিজম স্কুল।
অনাবাসিক সুবিধা নিয়ে একাধিক নিষ্পাপ চেহারা এখানে আসে সপ্তাহের পাঁচদিন। দেশের অটিজম শিশুদের জন্য বিরল সেই অাবাসিক সুবিধা নিয়ে এখানে কয়েকটি মায়াবী মুখ থাকে প্রতিদিন। আপনিও আসুন একদিন। আমি নিশ্চিত, এখানে এলে আপনার পূণ্যের পাতাগুলো করতে পারবেন রঙিন। এখানে এলে ভালো কাজের আলো হবে অমলিন।
এখানে পাখি ডাক দেয়। এখানে বৃক্ষ ছায়া দেয়। এখানের মানুষ পরিবারের প্রতিবেশ দেয়। এখানের কাজ স্বর্গীয় পরিবেশের আবেশ দেয়।
লেখকঃ ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়(চুয়েট)।
Developed By Muktodhara Technology Limited