image

আজ, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ইং

গ্রাম বাংলায় কনে দেখা সংস্কৃতি বনাম সামাজিক অশনিসংকেত

শিব্বির আহমদ রানা    |    ১৭:৫৬, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

image

সংস্কৃতি মানুষের জীবনকে চরমভাবে প্রভাবিত করে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে বদলে দিতে সুষ্ঠু সংস্কৃতির কোন বিকল্প নাই। প্রথমেই জানা যাক, সংস্কৃতি কী। সংস্কৃতি শব্দটির আভিধানিক অর্থ চিৎপ্রকর্ষ বা মানবীয় বৈশিষ্ট্যের উৎকর্ষ সাধন।ইংরেজি Culture-এর প্রতিশব্দ হিসেবে সংস্কৃতি শব্দটি ১৯২২ সালে বাংলায় প্রথম ব্যবহার করা শুরু হয়। আর সংস্কৃতি বলতে সেই সকল পন্থাকে বোঝায় যার মধ্য দিয়ে মানব জাতি তাদের প্রকৃত বর্বরতাকে কাটিয়ে ওঠে এবং ভ্রান্তিমূলক কৌশলের মাধ্যমে পূর্ণরূপে মানুষে পরিণত হয় এবং মানব কল্যাণের ভিত্তি রচিত হয় তাই সংস্কৃতি। সুষ্ঠু সংস্কৃতি মানুষের জীবনধারাকে বদলে দেয় আর অপসংস্কৃতি মানব সমাজকে দিন দিন কলুষিতার দিকে ঠেলে দেয়। এতে নষ্ট হয় সামাজিক ভীত। অপসংস্কৃতির কবলে সমাজে দানবীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে মানবতা বিবর্জিত অপবিশেষণ গুলো। যে সমাজে বা রাষ্ট্রে অপসংস্কৃতি গেড়ে বসে- সে সমাজ থেকে শান্তি, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, মানবতা, মনুষ্যত্ব সব বিলুপ্ত হতে থাকে। বেশ কয়েকটি অপসংস্কৃতি বাংলাদেশে প্রচলিত। তার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে বিয়ের জন্য পাত্র পক্ষের পাত্রী বা কনে দেখার সংস্কৃতি। বিয়ের জন্য কনে দেখার বিড়ম্বনাও কম নয়। অনেকে আছে যারা দিনের পর দিন শুধু কনে দেখে বেড়ায়। বরের পছন্দ হলে কনের হয় না, কনের হলে বরের বাবা-মায়ের হয় না। ফলে কনে দেখা চলতেই থাকে অবিরাম। আমার দেখা এক বন্ধুর জন্য কনে দেখতে দেখতে বছর গেলেও সুযোগ্য কনে নির্বচন করা হয়ে উঠেনি, পরে শেষমেষে প্রবাসী বন্ধুটি আবার বিদেশে পাড়ি জমালো! আমাদের সমাজে এমন মানুষও আছে যাদের কনে দেখায় যে সেঞ্চুরি হয়েছে। যে বন্ধুর কথা বলেছিলাম, কনে দেখতে দেখতে ৫০টির অধিক কনে দেখা হয়ে গেল এবং এতে সে সবচেয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

চাইলেই কিন্তু বিয়ে হুট করেই করা যায়না। বিয়ে হচ্ছে মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। রাস্তাঘাটে কারো সঙ্গে দেখা হলে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে বলে ফেললাম, 'চলো, আমরা বিয়ে করি।' বিয়ে ব্যাপারটা কিন্তু এমন না। পৃথিবীর কোনো দেশেই এমন করে বিয়ে হয় না। যার সঙ্গে জনমজনম জীবনযাপন করতে হবে, হুট করে তার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যায় না। বিয়ের কিছু রীতিনীতি আছে, অাছে সামাজিক কিছু সংস্কৃতি। বিয়েকে ঘিরে আমাদের দেশে চালু আছে নানা সংস্কৃতি, রেওয়াজ, আচার-অনুষ্ঠান কিংবা প্রথা। আপনি যাকে বিয়ে করবেন, বিয়ের আগে তাকে দেখতে হবে, তার সম্পর্কে জানতে হবে। এই 'দেখা' ও জানাকেই বলা হয় 'কনে দেখা' বা 'পাত্রী নির্বচন। এটিও বিয়েকেন্দ্রিক একটি সংস্কৃতি। এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ঐতিহ্যগত একটি সংস্কৃতির অব্যাহত ধারা। এ কনে দেখা সংস্কৃতি বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে প্রচলিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিরও পরিবর্তন সাধিত হয়। এককালে শুধু অভিভাবক কর্তৃক কনে দেখার সংস্কৃতির প্রচলিত ছিল। বরের মা-বাবা ও দাদা-নানা, কিংবা দাদী-নানি এরাই বরের জন্য কনে নির্বচন করতো। এতে বরের পছন্দ-অপছন্দের কোন প্রধান্য থাকত না। বাসর রাতেই দু'জন অচেনা মানুষের পরিচয় হতো! পরবর্তীতে এ সংস্কৃতির পরিবর্তন হলো। কনে দেখার কাজে যুক্ত করা হলো বরকেও। শুধু দেখা নয়, তার মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়া হতে লাগল। সেই ধারা এখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত বলা চলে। গ্রামবাংলায় এই কনে দেখার অনুষ্ঠানকে বলা হতো 'পানচিনি'। এখনো বলা হয়। কেন এই নাম? কারণ আছে। কারো বাড়িতে অতিথি হিসেবে গেলে উপহার হিসেবে সঙ্গে কিছু নেওয়াটা বাংলার চিরায়ত রীতি ছিল। বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে তখন মানবতার চর্চ্চা ছিল। প্রাচীনকালে তো আজকের মতো এত এত খাবার-দাবার ছিল না। তখন মিষ্টি নেওয়ার মতো প্রথা প্রচলন ছিলনা। পান সুপারি ও চিনি খাওয়ার মতো সহজ কাজটিতে কনে দেখার কাজ সেরে ফেলতো তখন। এখন আর পান চিনির আয়োজনে কনে দেখার প্রথা বিলুপ্তির পথে। বেশ কয়েক বছর আগে আজিব হয়েছি বন্ধুর জন্য কনে দেখতে গিয়ে কনের পক্ষ থেকে ৩৫ আইটেমের নাস্তা করার দৃশ্য দেখে। বর্তমানে এটা একটা অাভিজাত্যের মধ্যে পড়লেও কিছু কিছু পরিবারের জন্য অশনিসংকেতে পরিণত হয়েছে।

সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে সংস্কৃতিতে আসে নানা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন। বর্তমানে আমাদের দেশে ঘটা করে কনে দেখতে গিয়ে, বরের পাশাপাশি বাবা, বাবার বন্ধুরাও কনে দেখে। এতেই কনে দেখা সীমাবদ্ধ নেই! বরের দুলাভাই, মামাত, ফুফাত ভাই, বন্ধ এদের নাকি কনে দেখা লাগে। অতচ ইসলামী শরিয়তে বর ছাড়া অন্য কোন পুরুষের কনে দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং হারাম। হোক সে বরের পিতা বা অন্য কোন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন। তাদের কেউ বরের পক্ষ হয়ে কনে দেখলে কবীরা গুনাহ হবে। সুতরাং আমাদের দেশে বাবা, ভাই, বন্ধু-বান্ধব মিলে ঘটা করে মেয়ে দেখার যে প্রথা চালু আছে তা শরীআতের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। পুরুষ সদস্য বাদ দিয়ে শুধু নারী সদস্য নিয়েও ঘটা করে মেয়ে দেখা শরীআত সম্মত নয়। কেননা এভাবে ঘটা করে কনে দেখার পর যদি কোন কারণবশতঃ বিয়ে না হয়, তাহলে এটা ওই মেয়ে পক্ষের জন্য রীতিমত বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে অন্যরা মেয়ের ব্যাপারে নানা রকম সন্দেহের মধ্যে পড়ে। ফলে এই মেয়ে বিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়। আর কোন মানুষকে এভাবে বিপদে ফেলা ইসলাম সম্পূর্ণ নিষেধ করেছে। তাই ঘটা করে বিয়ের জন্য পাত্রী নির্বচন নামে দল বেঁধে বরের রথযাত্রা রীতিমতো অপসংস্কৃতিই বটে। বর্তমানে আধুনিক শিক্ষা ও বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে কনে দেখার রীতিনীতির পরিবর্তন ঘটেছে। বিয়ের ক্ষেত্রে এখন ঘটকের প্রয়োজনীয়তা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে বলা চলে। পেশাগত ঘটক এখন নেই বললেই চলে। শিক্ষিতদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মীয়তার সূত্রে কখনো কখনো ঘটকের দায়িত্ব পালন করে। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক ও নানা ওয়েবসাইটে কিংবা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও ঘটকালি করা হয়। ছেলে-মেয়েদের ছবি ও পূর্ণ পরিচয়সহ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। এ জন্য নির্ধারিত ফি দিয়ে প্রথমে প্রতিষ্ঠানের সদস্য হতে হয় এবং উদ্দেশ্য সফল হলে প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য পরিশোধ করতে হয়। আরা এতে অনেকে প্রতারিতও হয়ে থাকেন। সমাজ পরিবর্তনের এই ছোঁয়া গ্রামাঞ্চলেও পড়েছে। আগের মতো ঘটক আর দেখা যায় না। তাছাড়া বর্তমানে অনেকেই পূর্ব পরিচয়সূত্রে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। পেশাদার ঘটক না থাকলেও গ্রামাঞ্চলে এখনও অনেকেই এ দায়িত্ব পালন করে থাকে। তাদেরকে বলা হয় 'বিয়ের দালাল' বা 'উকিল'। এদের কাছ থেকে কনের নাম-ঠিকানা ইত্যাদি সংগ্রহ করে নেয় কনেপক্ষ। গোপনে তারা বরের পরিবারের জাতগোষ্ঠি ও সহায়-সম্পদের খোঁজখবর নেয়। তারপর ঘটকের মাধ্যমে বাজারের হোটেলে বা অন্য কোথাও বরপক্ষের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়। অনেক ক্ষেত্রে হবু বরকেও দেখা হয়। বর পছন্দ ও পরিবার মনঃপূত হলে পাত্রীপক্ষ ঘটকের মাধ্যমে কনে দেখার তারিখ জানিয়ে দেয়। হবু বর মিষ্টি-মিঠাই ইত্যাদি এবং সঙ্গে দুলাভাই, বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে কনের বাড়িতে যায়। মহাধুমধামে হয় ভূরিভোজ। ভোজনপর্বের পর কনে দেখার পালা। কনেপক্ষ যাতে কোনো ফাঁকিজুকি করতে না পারে সেজন্য সঙ্গে নেওয়া হয় দু-একজন নারী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্পর্কে তারা বরের ভাবি বা বড় বোন। নারীরা কনের সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে। পছন্দ হলে কনের হাতে আংটি পরিয়ে দেয়। অপছন্দ হলে কোন রকম হাজার দেড় এক টাকা কনের হাতে গুজিয়ে দিয়ে কোনরকম লা-পাত্তা! এরকম সংস্কৃতিকে আমি মোটেও মানতে পারিনা। কনে দেখার চূড়ান্ত পর্যায়ের আগে কেন রথযাত্রায় লস্কর, কেন ভূরিভোজ? এসব প্রশ্নের উত্তর বর্তমান সমাজের কারো পক্ষেই যেন জানা নেই। কি অমানবিক চিত্র, কি অদ্ভুত চরিত্র! অতচ এভাবে অপসংস্কৃতি সমাজকে তিলে তিলে অমানবিক করে তুলেছে।

ঘটা করে ছেলে, ছেলের বন্ধু ভাই, বোন জামাই, বাবা মা সব হাজির হয়ে একটি মাইক্রোবাস, কিংবা দু'তিনেক আটোরিকশায় চড়ে কনের বাড়ীতে পাত্রী দেখতে যাওয়ার নামে যে প্রথা তা জঘণ্যতম একটি অপসংস্কৃতি। এটা সম্ভবত হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত প্রথা। এর কারণে, শরীয়তের বিধান লংঘনের পাশাপাশি বেশ কিছু সামাজিক সমস্যারও সৃষ্টি হয়। তাছাড়া কনে দেখার এই রেওয়াজ নারী জাতীর প্রতি চরম অবহেলার বহিঃপ্রকাশ। নারী শাসিত সমাজে কনে দেখার নামে রথযাত্রা এবং বিশাল আয়োজনে ভূরিভোজ, অর্ধশত আইটেমের নাস্তা পরিবেশন শেষে কনে পছন্দ না অপছন্দের পালা যেন রিতীমতো     অবাক করা কান্ড। আর এতেই সৃষ্টি হয় সামাজিক নানা সমস্যা- মেয়ের পরিবারের অর্থ খরচ করে আয়োজন করা, ছেলের পরিবারের ইজ্জত রক্ষার্থে ব্যপক উপহার প্রদান, মেয়েকে মানসিক অস্বস্তি ও চাপের সম্মুখীন করা, সবচেয়ে বিশ্রী ও ভয়ানক ব্যাপার ঘটে, যখন বিয়েটা হয় না। সামাজিকভাবে হেনস্তা ও গ্লানির শিকার হতে হয় মেয়ে ও মেয়ের পরিবারকে। এই সামগ্রিক সমস্যা আমাদের নিজেদের তৈরি করা 'কুপ্রথা' থেকেই জন্ম নেয়। সামাজিকভাবে ওই মেয়েটি মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। এতেই কন্যার বাবা-মা বিষয়টি নিয়ে বেশ টেনশনে থাকে। তাই আমাদের সভ্য জীব হিসেবে উচিত এসব কু-প্রথার বিরোদ্ধে অবস্থান নেওয়া। সমাজকে মানবীয় গুণের দ্বারা বদলে দেওয়া। অামাদের এটাই ভাবা উচিত যে কাল পরশু আমি-আপনিও ত মেয়ের বাবা হতে যাচ্ছি। তাই সামাজিক এ অপসংস্কৃতি দূরীকরণে আমাদেরকেই সচেতন হতে হবে। প্রত্যেকটা অপসংস্কৃতি সামাজিক অমঙ্গল বয়ে আনে। সমাজের শান্তি, সম্প্রীতি, সোহার্দ্য বিনষ্ট করে। এক্ষেত্রে কনে দেখা কিংবা পাত্র নির্বচন করার বিষয়ে ইসলামকেই প্রধান্য দেওয়া আমাদের জন্য উচিত। এতে সামাজিক কল্যাণ বয়ে আনবে, সাথে সাথে অপসংস্কৃতির কবর রচিত হবে।

লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

১৮:০৯, মে ১২, ২০২২

বজ্রপাত হচ্ছে-সাবধান হই


Los Angeles

১২:২৮, অক্টোবর ৭, ২০২১

“কয় জন ভালো নয়, সয় জন ভালো হয়”


Los Angeles

০০:৫৯, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২১

বাংলাদেশের ফুটবলের কলংকিত দিন ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর !


Los Angeles

১১:৩৪, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১

প্রকৃতিতে নয়, কেবল কাগজের নোটেই আছে ‘জাতীয় পাখি দোয়েল‘


Los Angeles

২২:১২, সেপ্টেম্বর ১, ২০২১

ফুটবলের মরা গাঙে কি আবার জোয়ার আসবে ?


Los Angeles

২৩:০৮, আগস্ট ১৫, ২০২১

শাসক নয় বঙ্গবন্ধু আপাদমস্তক সেবক ছিলেন


Los Angeles

১৮:৫৭, আগস্ট ১৩, ২০২১

আড্ডা যেন এক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়


Los Angeles

০০:০৪, আগস্ট ৮, ২০২১

বাইরে মুক্তির কল্লোল ও বন্দী একটি পরিবার


image
image