image

আজ, শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১ ইং

করোনায় বাড়ছে ডিজিটাল মামলা, টার্গেট সাংবাদিক?

হারুন উর রশীদ স্বপন (ঢাকা)    |    ২৩:১৩, জুন ২৬, ২০২০

image

ছবি-প্রতিকী

DW (ডিডব্লু) এর পাতা থেকে ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশে করোনাকালে ‘বিতর্কিত' ডিজিটাল আইনের মামলার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আর মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, সাংবাদিকরাই এর প্রধান টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে জুন মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত ডিজিটাল আইনে যত মামলা হয়েছে তার আসামির প্রায় ২৫ ভাগ সাংবাদিক। এইসব মামলায় ৫২ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন, যার মধ্যে ১২ জন সাংবাদিক।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন পুলিশ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

আইন বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, করোনায় সরকার ব্যর্থতা ঢাকতেই সাংবাদিক ও নাগরিকদের মুখ বন্ধ করার জন্য এই আইনটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা ব্রিটিশ সংস্থা ‘আর্টিকেল ১৯' এর বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুক ফয়সাল বলেন, "করোনা সামাল দিতে পারছেনা, ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি হচ্ছে, পুলিশে ঘুসের ঘটনা ঘটছে। মানুষ তা নিয়ে কথা বলছে। আর তা ঠেকাতে নানা অজুহাতে ডিজিটাল আইনে মামলা হচ্ছে।”

মানবাধিকার সংস্থার তথ্য : ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) কার্যকর রয়েছে। আর্টিকেল ১৯-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২২ জুন পর্যন্ত মোট মামলা হয়েছে ১০৮ টি। এই সব মামলায় মোট আসামি ২০৪ জন। তাদের মধ্যে সাংবাদিক ৪৪ জন, আর অন্যান্য পেশায় কর্মরত ও সাধারণ মানুষ ১৬০ জন। এই হিসেবে প্রায় ২৫ ভাগ আসামিই হলেন সাংবাদিক।

এরমধ্যে মধ্যে জানুয়ারি মাসে ১০, ফেব্রুয়ারিতে ৯, মার্চে ১৩, এপ্রিলে ২৪, মে-তে ৩১ এবং জুন মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত ২১টি মামলা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে।

আর্টিকেল ১৯ বলছে, ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ৬৩টি। ২০১৮ সালে ডিএসএ এবং আইসিটি অ্যাক্ট মিলিয়ে মামলা হয়েছে ৭১টি।

তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯ সালে এক বছরে মোট মামলা হয়েছে ৬৩টি। আর সেখানে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই মামলা হয়েছে তার চেয়ে বেশি, ১০৮টি।

সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের তথ্য : বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ। কারণ অনেক মামলার খবরই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়না। তাই মানবাধিকার সংগঠনগুলোও তার খোঁজ পায়না। ফলে তাদের সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি।

বাংলাদেশে একটি মাত্র সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল আছে ঢাকায়। ডিজিটাল এবং তার আগের আইসিটি আইনের সব মামলার হিসাব আছে সেখানে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই বছরের মার্চ পর্যন্ত ডিজিটাল আইনে মামলা হয়েছে মোট ৩২৭টি। জানুয়ারি মাসে মোট মামলা হয়েছে ৮৬টি। এরমধ্যে থানায় ৪১টি এবং আদালতে ৪৫টি। ফেব্রুয়ারি মাসে হয়েছে ১১৯টি মামলা। থানায় ৯৫টি এবং আদালতে ৩৪টি। মার্চ মাসে মামলা হয়েছে ১২২টি। এরমধ্যে থানায় ৭৫টি এবং আদালতে ৩৭টি।

২০১৯ সালে মোট মামলা হয়েছে এক হাজার ১৮৯টি। এরমধ্যে থানায় ৭২১টি এবং আদালতে ৪৬৮টি।

২০১৩ সাল থেকে এপর্যন্ত ৫৫০টির মতো মামলা নিস্পত্তি হয়েছে। বিচারাধীন মামলা আছে এপর্যন্ত মোট এক হাজার ৯৫৫টি। এরমধ্যে থানায় দায়ের করা এক হাজার ৬৬৮টি এবং আদালতে ২৮৭টি। ৫৫টি মামলা হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত আছে।

সাইবার ট্রাইবুন্যালের পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শামীম জানান, ‘‘করোনার সময় মামলা বেড়ে যাচ্ছে।”

যা নিয়ে মামলা হয় : এই সময়ে করোনা নিয়ে ‘গুজব' ছড়ানোর অভিযোগেই বেশি মামলা হচ্ছে। এছাড়া মন্ত্রী, এমপি বাক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নিয়ে ‘মিথ্যা সংবাদ' ও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া, ‘মিথ্যা তথ্য ছড়ানো', চিকিৎসা নিয়ে সমালোচনা করা, ‘ত্রাণ চুরির মিথ্যা খবর' পরিবেশন করা, ধর্মের অবমাননা, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি প্রভৃতি কারণে মামলা হচ্ছে।

আর্টিকেল ১৯-এর ফারুক ফয়সাল জানান, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম মারা যাওয়ার পর তাকে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগেই ডিজিটাল আইনে ৯টি মামলা হয়েছে। বেগম রোকেয়া এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। আর ময়মনসিংহের ভালুকায় প্রধানমন্ত্রীকে  নিয়ে ফেসবুকে ‘কটূক্তি' করায় সর্বশেষ এক কিশোরকে আটক করা হয়েছে ডিজিটাল আইনে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে মো. ইমন নামে ওই কিশোর নবম শ্রেণির ছাত্র। তার বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন স্থানীয় হবিরবাড়ি ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হানিফ মোহাম্মদ নিপুণ। ২২ জুন তাকে গ্রেপ্তারের পর কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

গত ২২ মে হবিগঞ্জে গ্রেপ্তার হন ‘আমার হবিগঞ্জ' পত্রিকার সম্পাদক সুশান্ত দাশ গুপ্ত। স্থানীয় এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু জাহিরকে জড়িয়ে ত্রাণ চুরির খবর প্রকাশ করায় তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা করেন স্থানীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সায়েদুজ্জামান জাহির।

৩০ মে ঝালকাঠির নলছিটিতে ডিজিটাল আইনেগ্রেপ্তার হন স্থানীয় সাংবাদিক মনিরুজ্জামান মুনির। স্থানীয় রানাপাশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমানকে নিয়ে ফেসবুক পোস্ট দেয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সাধারণ ছুটির মধ্যে গণপরিবহন চলাচলের সমালোচনা করে ফেসবুক পোস্ট দেয়ার ‘অপরাধেও' ডিজিটাল আইনে সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। দৈনিক মানবজমিনের গাইবান্ধার পলাশবাড়ি প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম রতনকে গ্রেপ্তার করা হয় গত ২৬ মে। মামলাটি করেন স্থানীয় পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতা আব্দুস সোবাহান।

একইভাবে ফটো সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে গ্রেপ্তার করা হয় ক্ষমতাসীন দলের এক এমপির মামলায়।

করোনাকালে অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলছে। সাংবাদিকরা তথ্য প্রকাশ করছেন। তাদের কণ্ঠরোধ করার যে প্রক্রিয়া চালু হয়েছে তা কোনোভাবেই সহ্য করার মতো নয় বলে মনে করেন মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। ‘‘কর্তৃত্ববাদী মানসিকতায় এভাবে আইনের প্রয়োগ এবং অপব্যবহার অসহিষ্ণুতার লক্ষণ। আর সরকার তখনই অসহিষ্ণু হয় যখন সে বোঝে তার শাসন ব্যবস্থায় মারাত্মক রকম গলদ দেখা দিয়েছে,” মন্তব্য করেন তিনি।

যে ধারার বেশি প্রয়োগ হচ্ছে : সাইবার ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শামীম জানান, ডিজিটাল আইনের ২৫, ২৮ ও ২৯ ধারায় মামলা বেশি হয়। এই ধারাগুলো মানহানি, ধর্মের অবমাননা এবং গুজব ছড়িয়ে রাষ্ট্রের ক্ষতি করার অপরাধ। কিন্তু এইসব অপরাধ সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা নেই।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘‘এখানে জামিনেরও বিধান নেই। পুলিশও মামলা করতে পারে। তাই আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে, যা আমরা শুরুতেই বলেছিলাম।’’ তাই এই আইন বাতিল বা সুরক্ষার বিধান করা উচিত। বাকস্বাধীনতার সাথে এই আইন সাংঘর্ষিক তাই লেখালেখি, মত প্রকাশ বিষয়গুলো এই আইনের বাইরে নেয়া উচিত। তবে ডিজিটাল মাধ্যমে নাগরিকদের সত্যিকারের হয়রানি ও মানহানির প্রতিকারের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের তথ্য মতে, এই আইনে মট মামলার ৭৫ ভাগই নারী ভিকটিমদের করা। তবে তা আলোচনায় আসেনা বা তাদের তথ্য প্রকাশ পায়না। তারা প্রকাশ করতেও চান না।

বাকি মামলাগুলো রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের করা। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা এমপিদের পক্ষ হয়ে অনেকেই মামলা করেন। ট্রাইব্যুনালের পিপি নজরুল ইসলাম শামীম জানান, ‘‘এ ধরনের অনেক মামলাই শেষ পর্যন্ত আর প্রমাণ হয়না। হয়রানির জন্য করা হয়।”

উৎস : DW (ডিডব্লু)

নিউজটি DW (ডিডব্লু) থেকে হুবুহু প্রকাশিত। এতে সিটিজি সংবাদ.কম এর নিজস্ব কোন বক্তব্য নেই



image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

২৩:৪৫, জুলাই ৯, ২০২১

বুলিয়িং- ইংরেজিতে- Bullying


Los Angeles

১২:০৪, মে ৯, ২০২১

দিবসে নয়, মায়ের জন্য ভালবাসা হোক প্রতিদিন


Los Angeles

০০:২৭, মে ১, ২০২১

Knowledge rich বনাম Knowledge poor 


Los Angeles

০০:১৭, এপ্রিল ১৭, ২০২১

১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল ও মুজিব নগর সরকার- একটি সাক্ষাৎকার


Los Angeles

২৩:০২, এপ্রিল ১৩, ২০২১

পবিত্র রমযান হোক করোনা থেকে পরিত্রাণের মাস


Los Angeles

২৩:৩৯, মার্চ ৩০, ২০২১

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যম-২


Los Angeles

০০:৩৫, মার্চ ৩০, ২০২১

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যম


image
image
image

আরও পড়ুন

Los Angeles

১৩:১৫, জুলাই ৩০, ২০২১

প্রধানমন্ত্রীর উপহার জলে স্থলে একাকার


Los Angeles

১২:৫১, জুলাই ৩০, ২০২১

বাঁশখালীতে নিখোঁজের তিনদিন পর ভেসে এলো যুবকের লাশ