শিরোনাম
শমসের নেওয়াজ মুক্তা | ০০:০২, অক্টোবর ২৫, ২০২০
গত কয়েকমাস ধরে আমাদের সবার দুশ্চিন্তার জায়গাটি দখল করে রেখেছে একটাই বিষয়। তা হলো "করোনা ভাইরাস" এই বিষয়টিকেই নিয়ে চলছে নানান মতামত, বিশ্লেষণ, গবেষণা। মানবজীবনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ দিকই করোনার সাথে আলোচনায় যুক্ত হয়ে গেছে। কারণ এই করোনা নামক বিপর্যয়কে বাদ দিয়ে এখন আর কোন কিছুই বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি প্রায় সব বিষয়ই করোনার সাথে টিকে থাকার ভবিষ্যত ভাবনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
একটা বিষয় সবার কাছেই স্পষ্ট যে, করোনার আগের বিশ্ব আর পরের বিশ্বের মাঝে হবে বিস্তর ফারাক। নতুন যে পরিবর্তিত বিশ্ব হবে তাকে পত্রিকা, টিভি অনুষ্ঠান, বিভিন্ন আলোচনায় বলা হচ্ছে "নিউ নরমাল" অর্থাৎ "নতুন স্বাভাবিক।" তার মানে দাঁড়াল- আগের অনেক "স্বাভাবিক" আর পরবর্তীতে "স্বাভাবিক" থাকবেনা। নতুন অনেক কিছুই ঘটবে বা আমরা জীবনের প্রয়োজনে ঘটাতে বাধ্য হবো, যা করোনার আগে ছিলোনা। আর সেসবই আমরা "নতুন স্বাভাবিক" হিসেবে ধরে নিবো।
হাত ধোয়া ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গঠনে সুস্হতা আসবে। কিন্তু এমন অনেক বিষয় আছে যা আমাদের জীবনে অভ্যস্ততা এনে দিতে হয়তো সময় নিবে, সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। কিছু গুরুত্বপূ্র্ণ বিষয় রয়েছে যা অসামাজিক আচরণের পর্যায়ে পড়ে, তা যদি নতুন স্বাভাবিকে যুক্ত হয়, তাহলে আমাদের সন্তানেরা সেভাবেই গড়ে উঠবে। (যেমন-সংক্রমণের ভয়ে আপনজনদের কাছ থেকে দূরে থাকা, আত্মীয় অথবা প্রিয় বন্ধুদের সাথেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি)। এছাড়াও আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যা বাস্তবায়নে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। তা হলো-শিক্ষাব্যবস্হায় পরিবর্তন।
এই মহামারী কবে নিয়ন্ত্রণে আসবে কেউই জানেনা। মহামারী পরবর্তী বিশ্ব কেমন হবে তা কারো জানা না থাকলেও অনেকটাই যে পাল্টাবে এব্যাপারে সবাই নিশ্চিত। ভবিষ্যতের পরিবর্তনের গতিপথ রাজনীতি,অর্থনীতি,সংস্কৃতি সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্হা বদলে দেবে। তাহলে কেমন হবে সেটা?
আমরা সবাই তা একটু হলেও আঁচ করতে পারছি। আর তা হলো- অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্হার সুযোগ। উন্নত বিশ্ব অনেক আগে থেকেই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত চর্চা করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে করোনা সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম একটি বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। গতানুগতিক প্রক্রিয়ার বাইরে সৃষ্টি হবে আরেকটি নতুন শিক্ষা প্রক্রিয়া। সেদিন আর বেশি দূরে নেই, যেদিন এই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী বান্ধব নতুন একটি মাধ্যম সৃষ্টি হবে।
কিন্তু অনলাইন ক্লাসগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য কতটুকু নিশ্চায়ন হচ্ছে তা একটি গুরুত্বপূর্ন বিবেচনার বিষয়। কারণ, এক্ষেত্রে এমন কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা সারাদেশে সকল শিক্ষার্থীদের কাছে অনলাইন ক্লাসগুলো পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। আর শিক্ষায় দেশের অর্ধেক শিক্ষার্থীকে পিছিয়ে রেখে দেশ ও জাতির এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যেমন- কিছু জায়গা রয়েছে (হাওড় অঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল, পাহাড়ী অঞ্চল) যেখানে শক্তিশালী মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। অনেকের কাছে নেই অনলাইন ক্লাস উপযোগী ডিভাইস। রয়েছে সচেতনতারও অভাব। এতসব সীমাবদ্ধতাকে পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে অনলাইন ক্লাসগুলো পৌঁছুতে আমাদের করনীয় কি হতে পারে?
যেসব এলাকা এখনো বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা ও ইলেকট্রিসিটি থেকে বঞ্চিত সেসব এলাকার উন্নয়নে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। তা না হলে সংসদ টিভির ক্লাস বা রেডিওর ক্লাস কোনটাই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছুবেনা।
মোবাইল অপারেটরদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে নেটওয়ার্ক সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় জেলা ও উপজেলায় শক্তিশালী মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মোবাইলে অনলাইন ক্লাস নিশ্চিত করতে বিশেষ ফ্রি স্টুডেন্ট ডাটা প্যাকের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
অস্বচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার্থী বান্ধব সত্ত্বে অনলাইন ক্লাস উপযোগী ডিভাইসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আর্থিক অভাব ও নেটওয়ার্ক সুবিধার কারনে যেন মেধাবীরা হারিয়ে না যায় সেজন্য শিক্ষাখাতে বড় বিনিয়োগ করা অতীব জরুরি ও সময়ের দাবী।
আশা নয় বিশ্বাস, শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করে এসব পদক্ষেপ গ্রহন করলে অচিরেই সুবিধাবঞ্চিত এলাকাও আর পিছিয়ে থাকবেনা, তাল মিলিয়ে চলে নিজেদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সচেষ্ট হবে "নতুন স্বাভাবিক" এর দুনিয়ায়।
লেখক : শমসের নেওয়াজ মুক্তা, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার।
Developed By Muktodhara Technology Limited