শিরোনাম
মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান | ২১:০৬, মার্চ ৪, ২০২১
৪ঠা মার্চের দৈনিক ইত্তেফাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণকে কেন্দ্র করে একাধিক সংবাদ পরিবেশিত হয়। বিশেষত অসহযোগের অংশ হিসেবে অফিস আদালত বন্ধ করে দেওয়া, টেক্স-খাজনা বন্ধ করে দেওয়াসহ অনেকগুলো নির্দেশনা দেওয়া হয় ওই ভাষণে। বঙ্গবন্ধু শংকাও করেছিলেন যে, হয়তো সামরিক জান্তা তাঁকে ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিতে নাও দিতে পারেন, তার আগেই তুলে নিয়ে যেতে পারেন। এই শংকা মাথায় রেখে তিনি নেতাকর্মীদৈর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন। আর বিভিন্ন ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যাতে হানাহানী, লুটতরাজ না হয় সে বিষয়ে তিনি কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন। কারণ, তিনি দেখেছেন ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির সময় কিভাবে ধর্মীয় বাতাবরণে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, লুটতরাজ, ধর্ষণ হয়েছে। সর্বোপরি শিরোনামের বক্তব্য থেকে বুঝা যায় বঙ্গবন্ধু তাঁর আপামর জনতাকে নিয়ে চুড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে
ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত কর-খাজনা বন্ধ-বঙ্গবন্ধু
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার প্রতিবাদে ঘোষিত কর্মসূচী পালনের দ্বিতীয় দিবসে গতকল্য (বুধবার) ঢাকার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানের উত্তাল-উদ্দাম, বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে ভাষণদানকালে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান বিগত দিনের ঘটনাবলীর পটভূমিতে বিচার করিয়া তুমুল করতালির মধ্যে সামরিক সরকারকে অবিলম্বে গণপ্রতিনিধিদের হস্তে ক্ষমতা সমর্পণ করিয়া ব্যারাকে ফিরিয়া যাওয়ার আহŸান জানাইয়া জলদগম্ভীর স্বরে ঘোষণা করেন ঃ বাংলার গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা সমর্পণ করিয়া ব্যারাকে না যাওয়া পর্যন্ত সরকারের সহিত স্বাধিকারকামী বাংলার মানুষ আর সহযোগিতা করিবে না, কোনও কর-খাজনাও দিবে না।
ছাত্রলীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মহতী সমাবেশে আগ্রহব্যাকুল অযুত শ্রোতৃমন্ডলীকে সাক্ষী রাখিয়া আওয়ামী লীগ প্রধান সর্বাত্মক অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়া সরকারী-বেসরকারী চাকুরীজীবীদের প্রতি নির্দেশ দেন: পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত আপনারা অফিস-আদালতে যাওয়া বন্ধ রাখুন।
বেতার, টেলিভিশন ও পত্র-পত্রিকার প্রতি নির্দেশ দিয়া তিনি বলেন : “যদি আমাদের বক্তব্য-বিবৃতি, আমাদের আন্দোলনের খবরাখবর প্রকাশ-প্রচারের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়, সে নির্দেশ আপনারা লংঘন করুন।” ভুট্টো-গংয়ের উদ্দেশে তিনি বলেন ঃ “গণতান্ত্রিক নিয়মে প্রণীত এক শাসনতন্ত্র যদি না চান, আপনাদের শাসনতন্ত্র আপনার রচনা করুন, বাংলা দেশের শাসনতন্ত্র আমরাই রচনা করিব।”
গণ-অধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জীবনের সর্বস্তরের মানুষের এই মহতি সমাবেশে ভারাক্রান্ত কন্ঠে বক্তৃতা শুরু করিয়া এবারকার আন্দোলনের সূচনাপর্বে স্বাধিকারকামী ‘যে বীর বন্ধুরা আত্মাহুতি দিলেন’ তাহাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন প্রসঙ্গে ৭ কোটি বাঙ্গালীর বিক্ষুব্ধ কন্ঠস্বরকে নিজের কন্ঠে তুলিয়া লইয়া জলদগম্ভীর স্বরে তিনি ঘোষণা করেন “ বাংলার মানুষ খাজনা দেয়, ট্যাক্স দেয় রাষ্ট্র চালানোর জন্য- গুলী খাওয়ার জন্য নয়। তাই গরীব বাঙ্গালীর পয়সায় কেনা বুলেটের দ্বারা কাপুরুষের মত গণহত্যার পরিবর্তে অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়া নিন, বাংলার শাসনভার বাংলার নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে তুলিয়া দিন।”
পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী শেখ সাহেবের এই সভাশেষে পল্টন ময়দান হইতে একটি গণমিছিলের নেতৃত্ব করার কথা ছিল। কিন্তু পরে এই কর্মসূচী পরিবর্তন করিয়া তিনি সমাবেশে ভাষণদান করেন এবং জনগণের আশু কর্তব্য নির্দেশ করেন। মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে মুখরিত পল্টনের সেই বিশাল জনসমুদ্র আর বসন্তের বৈকালিক সূর্যকে সাক্ষী রাখিয়া শেখ মুজিব দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করেন, “প্রস্তুত-আমরা প্রস্তুত! দানবের সঙ্গে সংগ্রামের জন্য যে কোন পরিণতিকে মাথা পাতিয়া বরণের জন্য আমরা প্রস্তুত। তেইশ বছর ধরিয়া রক্ত দিয়া আসিয়াছি, প্রয়োজনবোধে বুকের রক্তের গঙ্গা বহাইয়া দিব। তবু সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়াইয়াও বাংলার বীর শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানী করিব না।”
নিন্দার ভাষা জানা নাই
বক্তৃতার শুরুতেই শেখ মুজিব বলেন, দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে আজ আমি এখানে আসিয়া দাঁড়াইয়াছি। তিনি বলেন, গত রাত্রে- গত দুইদিনে ‘বহুলোক’ হত্যা করা হইয়াছে। আমি নিজে মেশিনগানের গুলীর আওয়াজ শুনিয়াছি। এই হত্যাকাÐের নিন্দা করার ভাষা আমার জানা নাই। তিনি বলেন, গরীব মানুষের পয়সায় শান্তি ও শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর ভরণ-পোষণ চলে। তাদের দায়িত্ব দেশরক্ষা, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে তাদের ব্যবহার করা উচিত নয়। তিনি বলেন, নিরস্ত্র জনতাকে গুলী করিয়া হত্যা করা কাপুরুষতারই শামিল। তিনি অবিলম্বে শান্তি ও শৃংখলা রক্ষা বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়া লইয়া গণ-প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা তুলিয়া দেওয়ার দাবী জানান।
আমরা দায়ী নহি
দেশের বর্তমান সঙ্কট পরিস্থিতির পটভূমিকার বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে শেখ সাহেব বলেন, এজন্য আমরা দায়ী নইÑ এজন্য দায়ী গণ-প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর বানচাল প্রয়াসী ষড়যন্ত্রকারীর দল। তিনি বলেন, মেজরিটি জনগণ আমার পেছনে। কিন্তু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় আমার সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও করা হয় নাই। তিনি বলেন, ভুট্টো পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করিয়া অচলাবস্থার সৃষ্টি করিয়াছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা হয় নাই-অস্ত্র ধরা হইয়াছে বাংলার নিরস্ত্র শান্তিকামী মানুষের বিরুদ্ধে। শেখ সাহেব বলেন, আমি আবার বলি, আগুন লইয়া খেলা করিবেন না। যদি করেন, পুড়িয়া ভস্ম হইয়া যাইবেন।
মৃত্যুর ভয় দেখাইবেন না
সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্দেশে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়া শেখ মুজিব বলেন, বাংলা মানুষকে মৃত্যুর ভয় দেখাইবেন না। শত্রুর সঙ্গে দুর্দৈবের সঙ্গে, দুর্যোগের সঙ্গে কোলাকুলি করিয়াই আমরা বাঁচিয়া আছি। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা ধরিয়া, মৃত্যুকে বুক পাতিয়া বরণ করিয়াই আমরা স্বাধিকার আদায় করিব। বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন পরিচালনার জন্য জনগণের প্রতি আহŸান জানান। তিনি বলেন, উচ্ছৃংখলতা আন্দোলনকে বিপথগামী করিতে পারে।
অবিস্মরণীয় সমাবেশ
গতকল্যকার পল্টনের গণ-সমুদ্র ছিল নানা দিক দিয়া অবিস্মরণীয়। নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই সমগ্র পল্টন লোকে-লোকারণ্য হইয়া যায়। আর সভা শুরু হওয়ার আগেই সেই আদি-অন্তহীন জনসমুদ্রের ¯্রােত ডিআইটি এভিন্যু, জিন্নাহ এভিন্যু, বায়তুল মোকাররম, এমনকি ষ্টেডিয়ামের ছাদ পর্যন্ত সয়লাব করিয়া দেয়। গতকল্যকার এই জনতার মধ্যে সমাবেশ ঘটিয়াছে সকল স্তরের মানুষের। বয়স, পেশা, সামাজিক মর্যাদা, পোশাক-পরিচ্ছদ আর চেহারায় তাদের যতই অমিল থাকুক, মিল ছিল একটি ক্ষেত্রে হাতে বাঁশের লাঠি, লক্ষ্য, বাংলার স্বাধিকার। দেখিয়া মনে হইতেছিল, বাংলার স্বাধিকারের দাবী আর বাঁশের লাঠি বাংলার মানুষকে সকল ভেদাভেদ বিস্মৃতি করিয়া এক করিয়া দিয়াছে।
কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশ শুরু হয়্ শুরুতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ আজ (বৃহস্পতিবার) হইতে পরবর্তী ৪ দিনের কর্মসূচী ঘোষণা করেন।
প্রস্তাবাবলী
সমাবেশে প্রস্তাব পাঠ করেন কেন্দ্রীয ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক এম. এ, রশিদ। এক প্রস্তাবে শান্তি ও শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর গুলীবর্ষণে নিহত বাঙ্গালী ভাইদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করিয়া এই জঘন্য হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়িয়া তোলার আহবান জানান হয়।
এক প্রস্তাবে সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী শান্তি ও শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর গুলীতে আহত বীর বাঙ্গালীদের বাঁচাইয়া রাখার জন্য স্বাস্থ্যবান বাঙ্গালী ভাইদের বøাড ব্যাঙ্কে রক্ত প্রদানের আহŸান জানান হয়। এক প্রস্তাবে শোষণহীন সমাজ-ব্যবস্থা কায়েমের জন্য সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষক-শ্রমিক রাজ কায়েমের শপথগ্রহণ করা হয়।
এক প্রস্তাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা রাখিয়া তাঁহার সকল নির্দেশ ও কর্মসূচীকে যথাযথভাবে পালন করিয়া সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
সর্বশেষ প্রস্তাবে দলমত নির্বিশেষে বাংলা দেশের প্রতিটি নর-নারীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার আহবান জানান হয়।
জনসভায় বক্তৃতা করে ডাকসু’র সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ এবং জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব আবদুল মান্নান। বক্তৃতা প্রসঙ্গে জনাব আবদুল মান্নান শ্রমিক সমাজকে ছাত্র-সমাজের কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার আহবান জানান।
শাজাহান সিরাজ বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন যে, যারা আগুন জ্বালায়, লুঠপাট করে তারা জনতার সংগ্রামকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করিতেছে। তিনি বলেন যে, ইহাদের টাকা দিয়া শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বানচালের কাচে নামানো হইয়াছে, যেমন নামানো হইয়াছিল ১১-দফা আন্দোলনের সময়। তিনি এই সব চক্রান্ত্রকারীর চক্রান্ত ছারখার করিয়া ফেলিতে জাগ্রত জনগণের প্রতি আহŸান জানান।
আমি যদি না থাকি-
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল (বুধবার) পল্টন ময়দানে এক বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে ভাষণদানকালে তাঁহার অনুপস্থিতিতেও নির্ভয়ে স্বাধিকার আন্দোলন চালাইয়া যাওয়ার জন্য বাংলার জনগণের প্রতি আহবান জানান।
শেখ মুজিব ব্যাথাভারাক্রান্ত কন্ঠে বলেন, “হয়তো ইহাই আপনাদের সামনে আমার শেষ ভাষণ। আগামী রবিবার রেসকোর্সে আমার বক্তৃতা করার কথা। কিন্তু কে জানে, সে সুযোগ আমাকে নাও দেওয়া হইতে পারে। তাই আজ আপনাদের কাছে আর আপনাদের মাধ্যমে বাংলার জনগণের কাছে আমি বলিয়া যাইতেছি, আমি যদি নাও থাকি আন্দোলন যেন না থামে।” অত্যন্ত ধীরে ধীরে প্রিয়-পরিজনের কাছে অন্তিম বাসনা প্রকাশের মত বেদনার সুরে বঙ্গবন্ধু বলেন, “বাংলার ভাইয়েরা আমারÑ আমি বলছি, আমি থাকি আর না থাকি- বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন যেন না থামে, বাঙ্গালীর রক্ত যেন বৃথা না যায়। আমি যদি নাও থাকি, আমার সহকর্মীরা আছেন। তাঁরাই নেতৃত্ব দিবেন। আর যদি কেহই না থাকে, তবু আন্দোলন চালাইয়া যাইতে হইবে। বাংলার ঘরে ঘরে প্রতিটি বাঙ্গালীকে নেতা হইয়া নির্ভয়ে আন্দোলন চালাইয়া যাইতে হইবেÑ যে কোন মূল্যে বাংলার স্বাধিকার ছিনাইয়া আনিতে হইবে।”
এই কথাগুলি বলার সময় আবেগে বার বার শেখ সাহেবের কন্ঠ কাঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতে থাকে। আর তার জবাবে পল্টনের জনসমূদ্র ‘জয় বাংলার’ সধন গর্জনে শুধু জানাইয়া দেয়, ভয় নাই বঙ্গবন্ধু, আমরা প্রস্তুত।
শেখ মুজিব কর্তৃক ‘বন্দুকের নলের মাথায়’ সম্মেলনের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান আগামী ১০ই মার্চ ঢাকায় রাজনৈতিক নেতাদের সম্মেলনে যোগদানের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার আমন্ত্রণকে ‘বন্দুকের নলের মাথায়’ আমন্ত্রণের নামে ‘নিষ্ঠুর তামাসা’ বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া উহা প্রত্যাখ্যান করিয়া দিয়াছেন।
গতকাল (বুধবার) রাত্রে এক বিবৃতিতে শেখ সাহেব বলেন, বেতারে প্রচারিত এই আমন্ত্রণের পটভূমিতে রহিয়াছে ঢাকা চট্টগ্রামসহ বাংলা দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের পাইকারীহারে হত্যার বেদনা-দায়ক অধ্যায়। তিনি বলেন, যেই মুহূর্তে এইসব বীর শহীদের রক্তের দাগ রাজপথের বুক হইতে এখনও শুকাইয়া যায় নাই, যখন বহু শহীদের নশ্বরদেহ দাফনের প্রতীক্ষায় পড়িয়া আছে, যখন শতশত বুলেটবিদ্ধ মানুষ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়িয়া চলিয়াছে, সেই মুহূর্তে এই সম্মেলনের আমন্ত্রণ নিষ্ঠুর তামাসা ছাড়া আর কিছুই নয়। ইহা আরও নির্মম পরিহাসস্বরূপ এই জন্য যে, এমন কিছু লোকের সঙ্গে আমাদের একত্রে বসিতে বলা হইয়াছে, যাদের হীন চক্রান্তই নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক জনতার মৃত্যুর জন্য দায়ী।
শেখ মুজিব বলেন, যখন সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত, যখন আমাদের কানে বাজিতেছে অস্ত্রের ভাষার সুতীব্র হুংকার, সেই মুহূর্তে এই আমন্ত্রণ বন্দুকের নলের মাথায় আমন্ত্রণেরই শামিল। আর এই পরিস্থিতিতে এ ধরনের কোন আমন্ত্রণ গ্রহণের প্রশ্নই ওঠে না। তাই আমি ইহা প্রত্যাখ্যান করিতেছি।
ভুট্টোর গ্রহণ
জনাব ভুট্টো প্রেসিডেন্ট কর্তৃক আগামী ১০ই মার্চ ঢাকায় আহূত নেতৃ সম্মেলনে যোগদান করিবেন। পিপলস পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক সমাপ্ত হওয়ার অব্যবহিত পরে পার্টির মুখপাত্র জনাব আবদুল হাফিজ পীরজাদা একথা ঘোষণা করেন। পীরজাদা বলেন যে, প্রস্তাবিত সম্মেলনে শেখ মুজিবের সংগে আলোচনার সুযোগ গ্রহণের জন্যই পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে।
লুঠতরাজ ও উচ্ছৃংখলার বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ান
পল্টন ময়দানের গতকল্যকার বিশাল জনসমাবেশে বক্তৃতাকালে জাতীয় পরিষদের নিঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও উচ্ছৃংখল ঘটনার তীব্র নিন্দা করিয়া জনসাধারণকে সতর্ক করিয়া বলেন, এসব কাহাদের কাজ তা আমরা জানি। বাংলার স্বাধিকার-বিরোধী যে বিশেষ মহল নিজেদের এজেন্টদের দ্বারা এই সব অনাসৃষ্টি ঘটাইয়া যাইতেছে, বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন বিপথগামী করার এ অশুভ চক্রান্ত রুখিতেই হইবে। তিনি বলেন, বিপথগামী করিয়া আন্দোলন বানচাল করাই তাহাদের এ অশুভ তৎপরতার লক্ষ্য। যে কোন মূল্যে ইহাদের প্রতিহত করিতেই হইবে।
দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহŸান জানাইয়া শেখ সাহেব বলেন ঃ “আপনাদের প্রতি আমার নির্দেশ, বাংলার স্বাধিকার আদায়ের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন চালাইয়া যান। কিন্তু মনে রাখিবেন এই আন্দোলন হইবে শান্তিপূর্ণ, অহিংস, সুশৃংখল ও সুসংগঠিত। গণ-আন্দোলনের সাফল্যের জন্য শৃংখলাবোধের দরকার সবচাইতে বেশী। উচ্ছৃংখলতা আন্দোলনকে বিপথগামী করিতে পারে। মনে রাখিবেন, লুঠতরাজ, অগ্নিসংযোগ, হানাহানি আর কোলাহল আন্দোলনের লক্ষ্যকেই বানচাল করিয়া দিবে। আর সাবধান, মুখচেনা মহলের ভাড়াটিয়া উস্কানিদাতাদের ফাঁদে পা দিবেন না। ইহারা এই আন্দোলন বানচালের জন্য ষড়যন্ত্র চালাইতেছে। স্বাধিকার আন্দোলনের স্বার্থে এই অশুভ তৎরতা প্রতিহত করিতেই হইবে।”
শেখ মুজবি আরও বলেন, “আমার সুস্পষ্ট নির্দেশ রহিল, যে যেখানে থাকুন, নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ দায়িত্ব পালন করুন। আন্দোলনকে শান্ত ও সংযত রাখুন। হিন্দু হইক, মুসলমান হইক, বাঙ্গালী হউক, অবাঙ্গালী হউকÑ যারা আজ বাংলাদেশে বাস করে, তাদের সকলের জানমাল-ইজ্জতই আমাদের কাছে পবিত্র আমানত। যে-কোন মূল্যে উহা রক্ষা করিতে হইবে।”
আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আন্দোলন যাহাতে বিপথগামী না হয়, উচ্ছৃংখলতা ও হিংসাত্মক কার্যকলাপের দরুন এই বিরাট গণ-আন্দোলনের মূল লক্ষই যাতে বানচাল হইয়া না যায়, সে জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ কর।”
ওই দিনে আরও কতগুলো লক্ষণীয় সংবাদ পরিবেশিত হয়-
চট্টগ্রামে হাঙ্গামাঃ রংপুর ও সিলেটে সান্ধ্য আইন
স্বাধিকার আন্দোলনের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সংগ্রামী বাংলা রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে। স্বাধিকার আন্দোলনের উপর হামলার বিরুদ্ধে গণমানুষের আশা-আকাংক্ষা নস্যাতের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে এককণ্ঠ হইয়া গর্জিয়া উঠিয়াছে টেকনাফ হইতে পঞ্চগড় পর্যন্ত সমগ্র বাংলা দেশ। .....। গতকাল (বুধবার) ঢাকায় সর্বাত্মক হরতালের দ্বিতীয় দিনে শহীদের সংখ্যা আসিয়া দাঁড়াইয়াছে তেইশে, আর প্রদেশব্যাপী হরতালের প্রথমদিনেই আত্মাহুতি দিয়াছে বীর চট্টলার অন্তত: ৭৫টি সোনার সন্তান। আর এই খবর লেখার সময় পর্যন্ত বাংলার অন্তত: তিনটি জায়গায় ঢাকা, সিলেট ও রংপুরে নামিয়া আসিয়াছে সান্ধ্য আইনের করাল ছায়া।
আহতদের পাশে বঙ্গবন্ধু
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল (বুধবার) সন্ধ্যা সাড়ে ৮টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্বাধিকার আন্দোলনে আহত বীর সৈনিকদের দেখতে যান।
সরেজমিন দেখতে যান
প্রেসিডেন্টের প্রতি ভাসানীর তারবার্তা
গতকাল (বুধবার) রাত্রে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নিকট প্রেরিত এক তারবার্তায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার প্রতিবাদ জানাইয়াছেন। তিনি প্রেসিডেন্টকে অবিলম্বে ঢাকা আসিয়া সরেজমিনে এখানকার বর্তমান পরিস্থিতি পরিদর্শনের আহবান জানান।
প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নেতৃ-সম্মেলনের আমন্ত্রণ
প্রেসিডেন্ট ভবন হইতে ৩রা মার্চ নিন্মোক্ত ঘোষণাটি প্রচার করা হয়: “একটি সাধারণ লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সাহায্য করিতে প্রেসিডেন্ট তাঁহার সাধ্যানুযায়ী সবকিছুই করিবেন বলিয়া গত ১লা মার্চের ঘোষণায় যে প্রতিশ্রæতি দিয়াছিলেন, তদানুযায়ী তিনি ঢাকায় এক বৈঠকে মিলিত হওয়ার জন্য জাতীয় পরিষদে সকল পার্লামেন্টারী গ্রæপের নির্বাচিত নেতাদের নিকট জরুরী ব্যক্তিগত আমন্ত্রণলিপি প্রেরণ করিয়াছেন। আগামী ৮ই মার্চ পবিত্র আশুরার দিন পড়ায় আগামী ১০ই মার্চ এ সম্মেলনের দিন ধার্য করা হইয়াছে।
ঢাকায় গত দুইদিনে ২৩ জন নিহত ও তিন শতাধিক আহত
গত মঙ্গলবার ও বুধবার ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে কারফিউ লংঘনের কারণে শান্তি ও র্শংখলা রক্ষা বাহিনীর গুলিবর্ষণ, ছুরিকাঘাত, বোমা, ইট-পাটকেল ও লাঠির আঘাত এবং প্রাইভেট বন্দুক ও পয়েন্ট ২২ রাইফেলের গুলীতে ২৩ ব্যক্তি নিহত ও সোয়া তিন শতাধিক ব্যক্তি আহত হইয়াছেন বলিয়া বিভিন্ন সূত্র হইতে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়।
লেখকঃ মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান, পরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ।
৩ হইতে ৬ মার্চ প্রতিদিন সকাল ৬টা হইতে দুপুর ২টা পর্যন্ত সমগ্র প্রদেশে হরতাল পালন করুন : বঙ্গবন্ধু
২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সাংবাদিক সম্মেলন
আসুন, পরিষদেই সমাধান খোঁজা হইবে : বঙ্গবন্ধু
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদা : প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
ঘুরে আসুন সাজেক, খেয়াল রাখবেন কিছু বিষয়ে
নারী ও শিশু নির্যাতন: সভ্য সমাজের বর্বর বার্তা
Developed By Muktodhara Technology Limited