image

আজ, মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১ ইং

পূর্বাঞ্চলে যে ‘ভয়াবহ অবস্থা’ চলিতেছে, পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরা তাহা জানে না

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান    |    ২১:২৭, মার্চ ১০, ২০২১

image

১৯৭১ সালের ১০ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ গ্রাম পর্যন্ত পৌছে যায়। বিভিন্ন শহর বন্দরে আন্দোলন, মিছিল, মিটিং হরতাল চলতে থাকে। বিভিন্ন দলের রাজনীতিকরা প্রমাদ গুনতে থাকেন যে, দেশের জন্য অশনি-সংকেত দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন জনসভা, বক্তৃতা বিবৃতিতে তারা অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী জানাতে থাকেন। এদিকে ছাত্রলীগ ও ডাকসু তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। পত্রিকাগুরৈার সম্পাদকীয় ও উপসম্পদকীয়তে সামরিক বাহিনী ও ভ‚ট্টোর দূরভিসন্ধি নিয়ে নিবন্ধ লেখা শুরু হয়। সেদিনের ইত্তেফাকের উপসম্পদকীয়তে আমরা দেশের একটা সার্বিক চিত্র দেখতে পাই। ওইদিন ‘মে -নেপথ্যে’ শিরোনামের উপসম্পাদকীয়তে নিচের প্রবন্ধ ছাপা হয়-
৭ই মার্চের প্রেস কনফারেন্সে অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খান এক পর্যায়ে বলিয়াছিলেন, পূর্বা লে যে ‘ভয়াবহ অবস্থা’ চলিতেছে, পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরা তাহা জানে না, কারণ যোগাযোগের অসুবিধার দরুন পর্যাপ্ত খবর সেখানে পৌঁছিতেছে না।
এয়ার মার্শালের কথাটা অর্ধপূর্ণ। ভারতীয় আকাশের উপর দিয়া পিআইএ-এর বিমান চলাচল বন্ধ হইয়াছে সত্য, কিন্তু তার ও বেতার যোগাযোগ ত বন্ধ হয় নাই। উহা অব্যাহতই রহিয়াছে। টেলি-প্রিন্টার সার্ভিসও পূর্ববৎ চলিতেছে। তাছাড়া আন্তঃআ লিক ফ্লাইটের সংখ্যা সাময়িকভাবে হ্রাস করার প্রয়োজন হইয়া থাকিলেও ইতিমধ্যে পিআই-এর ফ্লাইটের ফ্রিকুয়েন্সি প্রায় পুনর্বহাল হইয়া গিয়াছে। এতদসত্তে¡ও পূর্বা লের ‘ভয়াবহ অবস্থার’ সঠিক খবরাখবর পশ্চিমা লের মানুষের কাছে না পৌঁছার কারণ কি ? তবে কি খবরের পাইপ-লাইনে কোথাও ফুটা হইয়া গিয়াছে? সেই ফুটা বাহিয়া কি তরল-তাজা খবরগুলি চুয়াইয়া-চুয়াইয়া মাঝপথে পড়িয়া যাইতেছে ?
ইতিমধ্যে বৈদেশিক সাংবাদিকরাও এই মর্মে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছেন যে, অতীতের ন্যায় এবারও বাঙলা দেশ হইতে গণ-আন্দোলনের খবরা-খবর বিদেশের সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, বেতার ও টিভি-তে প্রেরণের উপর কড়া বিধি-নিষেধ আরোপ করা হইয়াছে। তাঁহারা যেসব প্রেস টেলিগ্রাম দেশ-দেশান্তরে বুক করেন, তাহা করাচীতে কঠোরভাবে সেন্সর করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যাপক ছাঁটকাট করিয়াও সন্তষ্ট না হইয়া উহা বেমালুম গায়েব করা হয়। জনৈক বিদেশী সাংবাদিক শেখ সাহেবের বাসভবনে এই অভিযোগ প্রকাশ করার পর মন্তব্য করেন, ‘এ-জন্যই ত বাঙলার মানুষ রক্তাক্ত স্বাধিকার আন্দোলন চালাইতেছে।
পূর্বা লের ‘ভয়াবহ অবস্থার’ খবর পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের কাছে পৌঁছিতেছে না বলিয়া জনাব আসগর খান যে-আশ্চর্য জনক বিষয়টি ব্যক্ত করিয়াছেন, তাহারও প্রকৃত কারণ হয়ত বিশেষ করিৎকর্মাদের এই কলকাঠি ঘোরানোর মধ্যেই সন্ধান করিতে হইবে।
‘মুখে শেখ ফরিদ বগলে ইট’ আজ নতুন নয়। ‘সংহতির’ সুললিত বাণী মুখে হরহামেশা উচ্চারণ করিলেও তাহাদের দ্বারাই ‘সংহতির’ কর্মটি সারা হইয়াছে সর্বমুহূর্তে, সর্ব ক্ষেত্রেই। দুই অ লের অনুসৃত হইয়াছে দুই ভিন্নমুখী নীতি। শোষণ ব না যত কিছু চালানো হইয়াছে, অসাম্য-অসমতা যত কিছু সৃষ্টি করা হইয়াছে, সবই পাকিস্তানের ‘সংহতির’ সুমধুর বুলির আড়ালে। ‘সংহতির’ গেম খেলিয়া বাঙ্গালীকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ ‘তখমা’ দেওয়া হইয়াছে। ‘সংহতির’ নামে ‘অস্ত্রের ভাষা’ শুনানো হইয়াছে। ‘সংহতিরই’ স্বার্থে নাকি আগরতলা মামলার ষড়যন্ত্রও পাকানো হইয়াছে। ‘সংহতিরই’ প্রয়োজনে গণতন্ত্র হরণ করিয়া একযুগের অধিককাল স্বৈরতন্ত্র চালানো হইয়াছে এবং নির্যাতনে-নিপীড়নে বৃহত্তর জনসংখ্যাকে জর্জরিত ও রক্তশূন্য করা হইয়াছে। সত্য সত্যই আমরা ‘সংহতির’ এক অদ্ভুত শিকার। বস্তুতঃ ‘সংহতি’ কথাটার অপব্যবহার তেইশ-চব্বিশটা বছর ধরিয়া এত বেশী করা হইয়াছে, প্রতিটি গণ-বিরোধী, গণতন্ত্র বিরোধী, বাংলা বিরোধী অপকর্ম করিতে গিয়া ‘সংহতির’ ধু¤্রজাল এত অধিক সৃষ্টি করা হইয়াছে যে কথাটার অর্থই এখন বাঙ্গালীর কাছে বদলাইয়া গিয়াছে। ‘সংহতির’ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বাধাই থাকুক এবং সে অর্থে বাংলা দেশের মানুষ যত ত্যাগ করিয়া থাকুক ও যত উদারতা দেখাইয়া থাকুক, আজ উহার ব্যবহারিক অর্থ দাঁড়াইয়াছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। উহা শোষণ, ব না, নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রায় সমার্থবোধক হইয়া দাঁড়াইয়াছে, একথা বলিলেও বোধ করি কিছুই অতিরঞ্জন দোষ হইবে না। অথচ ‘সংহতির’ উপর বিশ্বাস করিয়া বাঙ্গালী কী না দিতে বাকী রাখিয়াছে। একটানা বিশ্বাসভঙ্গ, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এবং ‘সংহতির’ অবব্যবহারে মানুষকে বেপরোয়া হইতে বাধ্য করিয়াছে। আজ তাহারা জীবন-পণ করা মহাসংগ্রামে নামিয়াছে। জনগণ-নন্দিত নায়ক শেখ মুজিব ৭ই মার্চের রেসকোর্সের ভাষণে ইহাকে অভিহিত করিয়াছেন ‘মুক্তি সংগ্রাম’ ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’। অথচ পয়লা মার্চের পূর্ব পর্যন্ত জনাব ভুট্টো এত যে উস্কানিমূলক ভাষা প্রয়োগ করিয়াছেন, ঢাকায় আহূত পরিষদকে কসাইখানা আখ্যা দিয়াছেন, তথাকথিত ‘ক্ষমতার দূর্গ’ হইতে চরম হুমকি প্রদান করিয়াছেন, বাংলার মানুষ তাহাতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হইয়াছে বটে, কিন্তু তবু সংগ্রাম শুরু করে নাই। তাহারা প্রেসিডেন্টের প্রদত্ত আশ্বাসে বুক বাঁধিয়া ছিল। তাহারা বিশ্বাস করিয়াছিল যে, ভুট্টো সাহেবের হঠকারী আচরণকে কোনক্রমেই প্রাধান্যলাভ করিতে ও গণতন্ত্রের পথে দÐায়মান হইতে দেওয়া হইবে না। জনগণ এই আশাই পোষণ করিতেছিলো যে, কায়েমী-স্বার্থী চক্র ও কতিপয় দেশী-বিদেশী মহলের সুগভীর ষড়যন্ত্র সত্তে¡ও নির্ধারিত দিবসে (৩রা মার্চ) পরিষদ বসিবে, তাহাদের ম্যাÐেট অনুযায়ী সংবিধান রচিত হইতে এবং অচিরে সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও ক্ষমতা হস্তান্তর হইবে; তখন ভুট্টো-কাইয়ুম চক্র ও তাঁহাদের উৎসাহ আনুকুল্যদাতাদের তড়পানিও থামিয়া যাইবে। কিন্তু পয়লা মার্চ মধ্যাহ্নে যেই মুহূর্তে গণপরিষদের অধিবেশন আকস্মিকভাবে স্থগিত করার আদেশ জারি হইল, তখনই জনগণের সকল ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গিয়া গেল এবং সমস্ত আশা ও আশ্বাসে জলাঞ্জলি দিয়া বাঙলার মানুষ সংগ্রামের পথকেই শেষ পথরূপে বাছিয়া লইল ও সেই পথেই পা বাড়াইল। বস্তুতঃ এই পন্থাগ্রহণে তাহাদিগকে ভুট্টো-কাইয়ুম চক্র ও তাহাদের দেশী-বিদেশী সহায়ক পরিপোষকগণ বাধ্যই করিয়াছেন। 
কিন্তু দোষটা সনাতন রীতিতে বাঙালীর উপরই চাপানো হইতেছে, লজ্জার মাথা খাইয়া ভুট্টো সাহেবের ‘মুখপাত্র’ আবদুল হাফিজ পীরজাদা ৫ই মার্চ বলিয়াছেন ঃ ‘স্থগিতাদেশে’ কাহারই কোন ক্ষতি হয় নাই, কিন্তু পূর্বা লে উহার যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়াছে, তাহা ‘ যে কোন দিক দিয়াই বিচার করা যাক, অন্যায়, অনাহূত ও অযৌক্তিক’। তিনি বলিয়াছেন, ইহার দায়িত্ব পিপিপির নয়, সর্বাংশেই আওয়ামী লীগের; ‘পাকিস্তান এক দেশ থাকিবে কি দুই দেশ হইয়া যাইবে-সে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব এখন সম্পূর্ণভাবেই বর্তাইয়াছে আওয়ামী লীগের উপর’। বলা বাহুল্য, পরম ‘সংহতিবাদী’ ভুট্টোর মুখপাত্র এক্ষেত্রেও ‘সংহতি’র নামে কুম্ভীরাশ্রæ ক্ষেপণ কিছু কম করেন নাই।
আওয়ামী লীগ তথা বাঙলা দেশের মানুষের উপর দোষ চাপাইয়াবার এই প্রবণতা চিরন্তন। সারা দেশ ও দুনিয়ার মানুষ বলিতেছে, দেশটাকে বিচ্ছিণ্ণতার মুখে ঠেলিয়া দিয়াছেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণও ভুট্টোকে বলিতেছেন ‘আইয়ুবী স্বৈরতন্ত্রের সন্তান’। কেহ বলিতেছেন, দেশী-বিদেশী অশুভ শক্তির উৎসাহে ভুট্টো সাহেব এখন যা কিছু করিতেছেন, দেশটাকে বিচ্ছিণ্ণ করার উদ্দেশ্য লইয়াই করিতেছেন। বালুচ নেতা নওয়াব আকবর খান বুগতি ১৭ই ফেব্রুয়ারীর বিবৃতিতে অত্যন্ত চাঁছাছোলা ভাষায় বলিয়াছেন, ভুট্টো সাহেব পাকিস্তানকে দ্বিধাবিভক্ত করিয়া পশ্চিমাংশের ‘প্রধানমন্ত্রী’ হইতে উদগ্রীব। পশ্চিম পাকিস্তানের আরও অনেক নেতাই শেখ সাহেবের ভুমিকায় ন্যায্যতা স্বীকার করিয়াছেন এবং বর্তমান অচলাবস্থার জন্য ভুট্টোকে দায়ী করিয়া দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলিয়াছেন, ‘সেপারেশন’ বা বিচ্ছিণ্ণতাই এখন ভুট্টোর রাজনীতির মূলমন্ত্র, তিনি আর কিছু না হউক, পশ্চিম পাকিস্তানের “মুকুটহীন সম্রাট” হইতে চান। ৬ই মার্চ লাহোরের মহতী সভায় পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাক্তন গভর্নর ও বর্তমানে কাউন্সিল লীগ নেতা অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল নুর খান অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সরাসরি ভাষায় বলিয়াছেন ঃ ভুট্টো সাহেবের ‘আসল বিরোধ ৬-দফার প্রশ্নে মোটেই নয়, বর  শাসনতন্ত্র রচনার পর ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রশ্নেই প্রকৃত বিরোধের কারণ নিহিত।’ নুর খান আরও বলেন, “জনাব ভুট্টো এবং আমলাতন্ত্র ও সরকারের উপদেষ্টারা দেশের পরবর্তী প্রশাসন কাঠামোতে ক্ষমতার হিস্যায় নিজেদের প্রাপ্তিযোগের প্রশ্নে রীতিমত উদ্বিগ্ন।” নুর খান খোলাখুলি এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ শাসনের বৈধ অধিকার রহিয়াছে; ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে সৃষ্ট সকল বাধাবিপত্তি অবিলম্বে দূর করিয়া তাঁহাকে ক্ষমতাগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানোই এই মুহূর্তের একমাত্র কর্তব্য।
পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন দায়িত্বশীল মহল হইতে ব্যক্ত এইসব অভিমতই প্রমাণ করে ভুট্টো সাহেবের ‘গেমটা’ কি এবং উহা কোন সর্বনাশা ভাঙ্গন, বিনাশ ও বিচ্ছিণœতার মুখে দেশটাকে ঠেলিয়া দিয়াছে। আজ পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষেরও মুখে মুখে এই জিজ্ঞাসাই ধ্বনিত হইতেছে ঃ আইয়ুবী স্বৈরতন্ত্রের সন্তান কেরিয়ারিষ্ট ভুট্টো কি তবে ক্ষমতার উদগ্র লালসায় এবং দেশী-বিদেশী ‘অশুভ-শক্তির’ উৎসাহে আনুকূল্যে দেশটাকে না ভাঙ্গিয়া ছাড়িবেন না ? জনগণের এই জিজ্ঞাসা ক্রমেই প্রবল হইয়া উঠিতেছে এবং শেখ মুজিবের দাবী ও অধিকারের প্রতি গণ-সমর্থন সেখানে ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে বলিয়াই বাঙলাদেশের নৃশংস হত্যাকান্ডের খবর পর্যন্ত সেখানে পৌঁছিতে দেওয়া হইতেছে না, দেশ-দেশান্তরে বুক করা প্রেস টেলিগ্রামে উপর করাচীতে বৈদেরেগ সেন্সরের ছুরি-কাঁচি চালানো হইতেছে। প্রেসিডেন্টকেও এখানকার প্রকৃত খবর পরিবেশন করা হইতেছে, নাকি অসত্য ও অর্ধ-সত্য পরিবেশন করিয়া তাঁহাকে বিভ্রান্ত করা হইতেছে তাহাইবা কে বলিবে ? হতাহতের সরকারী বিবরণ আমাদের সেই আশঙ্কাই বদ্ধমূল করিতেছে।
‘স্বৈরতন্ত্রের সন্তান’ ভুট্টো পাকিস্তানের রাজনীতিতে ঢুকিয়াছেন “বুল ইন এ চায়না শপ” এর মত। তাঁর ‘প্রগতির’ খোলস খসিয়া পড়িয়াছে এবং প্রথম পরীক্ষাতেই আসল চেহারা ধরা পড়িয়া গিয়াছে। কিন্তু মন্ড প্রবরের সঙ্গে তাঁর তফাৎ, মন্ডের বর্বতার ‘মেথড’ নাই, কিন্তু ভুট্টোর ক্ষমতা-প্রমত্ততার একটা ‘মেথড’ আছে, লক্ষ্য আছে। সেটা হইল, পাওয়ার তাঁহার চাই-ই-চাই। যে কোন প্রকারে হউক, উহা তাঁহাকে পাইতেই হইবে, -তা পাকিস্তানকে রাখিয়া হউক আর ভাঙ্গিয়া চুরিয়া মিসমার করিয়া হউক। 
ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে চলিয়াছে তাহা এখন আর কাহারও বুঝিবার বাকী নাই, তবে ইসলাবাবাদের ‘আসহাবে-কাহাফদের’ কথা নিশ্চয় করিয়া কিছু বলিতে পারি না। ‘বিধি অখন্ডনীয়’ এই প্রবাদোক্তি স্মরণ করিয়া আমরা মনকে প্রবোধ দিতে চেষ্টা করি বটে, কিন্তু সত্যই কি মন প্রবোধ মানে ? এতকাল ‘সংহতিবাদীদের’ হাতে আমরা মার খাইয়াছি, কিন্তু আজ খাইতেছি ভুট্টোর ন্যায় সংহতিনাশী ও বিচ্ছিণ্ণতার প্রকৌশলবিদ এবং তাহাদের রক্ষক পরিপোষকদের হাতে। বিপুল রক্তের দূর্লভ মুদ্রায় ভুট্টোর বিচ্ছিণ্ণতাবাদের মূল্য আমাদিগকেই পরিশোধ করিতে হইতেছে। একদিকে বুল্টে, বেয়নেট, অন্যেিদক ওদের গাঁইত-শাবল। কোন্টা ফিরাইব ?
ওইদিন মাওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানে জনসভা করেন। জনসভার সংবাদ বিশাল পরিসরে ছাপা হয়। তার প্রথমাংশ বিধৃত হল:

‘লাকুম দ্বীনুকুম অল্ইয়াদ্বীন’
পঁচিশে মার্চের পর শেখ মুজিবের সহিত মিলিয়া আন্দোলন শুরু করিব
পল্টনের জনসভায় মওলানা ভাসানীর ঘোষণা

গতকাল (মঙ্গলবার) পল্টনের এক বিরাট জনসভায় তুমুল করতালি ও হর্ষধ্বনির মধ্যে অশীতিপর বৃদ্ধ ন্যাপ নেতা মওলানা ভাসানী ঘোষণা করেন : শেখ মুজিবের নির্দেশিত ২ শে মার্চের মধ্যে কোন কিছু না করা হইলে আমি শেখ মুজিবের সহিত মিলিয়া ১৯৫২ সালের ন্যায় তুমুল গণ-আন্দোলন শুরু করিব। 
ন্যাপ নেতা মওলানা ভাসানী দেশের সর্বশেষ অবস্থার পটভ‚মিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আহŸান জানাইয়া বলেন : ‘একদিন ভারতের বুকে নির্বিচারে গনহত্যা করিয়া, জালিয়ানওয়ালাবাগের মর্মান্তিক ইতিহাস রচনা করিয়া, অত্যাচার-অবিচারের বন্যা বহাইয়া দিয়াও প্রবল পরাক্রমশালী বৃটিশ সরকার শেষ রক্ষায় সম্ভব হয় নাই। শেষ পর্যন্ত তাহাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হইয়াছে। পাক-ভারত উপমহাদেশকে শত্রæতে পরিণত না করিয়া সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মধ্যে সরিয়া যাওয়াই তাঁহারা মঙ্গল মনে করিয়াছেন। যে বৃটিশ সাম্রাজ্যে একদিন সুর্য অস্ত যাইত না, রূঢ় বাস্তবের কষাঘাতে সে সাম্রাজ্যের সুর্যও আজ অস্তমিত। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকেও তাই বলি, অনেক হইয়াছে, আর নয়। তিক্ততা বাড়াইয়া আর লাভ নাই।‘লাকুম দ্বীনুকুম অল্ইয়াদ্বীন-এর নিয়মে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া লও’।.....। তিনি বলেন আপনি দওলততানা ভ‚ট্টো, খুরোর সহিত আলোচনা করিয়া ২/৩ দিন পরে আসুন। তাড়াহুড়ার কাম নাই। তারপর এখানে আসিয়া বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া লউন। 
ওইদিন আরো যেসব সংবাদ পরিবেশিত হয়-

মুজিব-ভাসানী আলোচনা
ন্যাপ প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে গতকাল (মঙ্গলবার) টেলিফোনে কথাবার্তা হইয়াছে বলিয়া সংশ্লিষ্ট মহল হইতে জানা গিয়াছে। পল্টন ময়দানের জনসভায় ভাষণ দানের উদ্দেশ্যে সন্তোষ হইতে ঢাকা পৌছার পরই মাওলানা ভাসানীর সহিত আওয়ামী লীগ প্রধানের সাথে টেলিফোনে উপরোক্ত কথাবার্তা হয়।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ পুনঃপ্রচারের দাবী
গত ৭ই মার্চ তারিখে রেসকোর্স ময়দানের গণসমাবেশে প্রদত্ত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডকৃত ভাষণ বেতারে পুনরায় প্রচার করার জন্য বাংলা দেশের বিভিন্ন জেলা হইতে অসংখ্য টেলিগ্রাম ও টেলিফোন কল পাওয়া যাইতেছে বুলয়া শেখ সাহেবের প্রেস সেক্রেটারী জানাইয়াছেন। প্রেস সেক্রেটারী বাংলার জনগণের এই দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে অবিলম্বে একটি নির্ধারিত অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ বেতারে পুনরায় প্রচার করার জন্য বেতার কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানাইয়াছেন। তিনি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের প্রতিও অনুরূপ অনুরোধ জানান।

ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের জরুরী সভায় ‘স্বাধীন বাংলা দেশ’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন
গতকাল (মঙ্গলবার) সার্জেন্ট জহুর (ইকবাল) হল কেন্টিনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের এক জরুরী সভা সংগঠনের সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গৃহীত এক শোক প্রস্তাবে ‘বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে উপনিবেশবাদী পাকিস্তানী সেনা’ কর্তৃক নিহত ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক ইকবালসহ অন্য সহীদানের জন্য গভীর শোক প্রকাশ, তাহাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং মঞীদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়। সভায় গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবে গত ২রা মার্চ বটতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগ ও ডাকসুর নেতৃত্বে গঠিত ‘স্বাধীন বাংলা দেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ সভায় গৃহীত ‘স্বাধীন বাংলা দেশ’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অপর এর প্রস্তাবে বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘স্বাধীন দেশে জাতীয় সরকার’ গঠনের অনুরোধ করা হয়। সভায় ‘বাংলা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের’ জন্য ছাত্রলীগ সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ, ডাকসু সহ-সভাপতি আ: স: ম: আবদুর রব এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখনকে লইয়া গঠিত “স্বাধীন বাংলা দেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ উপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। .....।

প্রয়োজনে বাংলা হইতে জাতিসংঘ স্টাফ অপসারণের নির্দেশ
জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল মি: উখনত প্রয়োজন হইলে পূর্ব পাকিস্তান হইতে জাতিসংঘের স্টাফ ও তাঁহাদের পরিবারবর্গকে াপসারণের জন্য গতকাল ঢাকাস্থ জাতিসংঘের উপ-আবাসিক প্রতিনিধিকে ক্ষমতা দান করিয়াছেন। ঢাকাস্থ উপ-আবাসিক প্রধান হের কার্লফ্রিৎজ উলফের নিকট প্রেরিত এক তারবার্তায় উখানত তাঁহাকে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব দিয়াছেন। হের উলফ পশ্চিম জার্মানীর লোক।
উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধির অফিস করাচীতে অবস্থিত।

জাপানী নাগরিকদের অপসারণের ব্যবস্থা
টোকিও থেকে প্রচারিত এক খবরে বলা হয় যে, জাপানের পররাষ্ট্র দফতর পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত জাপানী নাগরিকদের অপসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে।
রাজশাহীতে কারফিউ জারির প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ নেতা জনাব কামরুজ্জামানের বিবৃতি
পাকিস্তান আওয়ামী লেিগর সাধারণ সম্পাদক জনাব এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান গতকাল (মঙ্গলবার) রাজশাহীতে সান্ধ্য আইন জারির প্রতিবাদ ও অবিলম্বে উহা প্রত্যাহারের দাবী জানান।...।

সরকারী আধা-সরকারী কর্মক্ষেত্র অচল
শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত স্বাধিকার আন্দোলনের কর্মসূচী অনুযায়ী গতকাল (মঙ্গলবার) সেক্রেটারিয়েট, বিভিন্ন সরকারী ও আধা-সরকারী অফিস, হাইকোর্ট, জেলা কোর্ট প্রভৃতিতে গতকাল হরতাল পালিত হয়। যেসব সরকারী অফিস জরুরী প্রয়োজনে খোলা রাখার অনুমতি ঘোষণা করা হইয়াছিল গতকাল শুধু সেগুলিই খোলা ছিল।

লেখকঃ মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান, পরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের শর্ত মানিয়া লও

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম : বঙ্গবন্ধু

ঢাকার রাজপথে স্বাধিকারকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণা কন্ঠে কন্ঠে ক্ষুব্ধ গর্জন, প্রাণে প্রাণে সংগ্রামী শপথ

ঢাকার উত্তপ্ত রাজপথ, নানা জল্পনা-কল্পনা ও রাজনৈতিক ধোঁয়াশায় কাটে ৬ই মার্চ

দেশে যদি বিপ্লবের প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে সে বিপ্লবের ডাক আমিই দিব, আমিও কম বিপ্লবী নই: বঙ্গবন্ধু

দানবের সঙ্গে সংগ্রামের জন্য যেকোন পরিণতিকে মাথা পাতিয়া বরণের জন্য আমরা প্রস্তুত : বঙ্গবন্ধু

৩ হইতে ৬ মার্চ প্রতিদিন সকাল ৬টা হইতে দুপুর ২টা পর্যন্ত সমগ্র প্রদেশে হরতাল পালন করুন : বঙ্গবন্ধু

২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সাংবাদিক সম্মেলন

আসুন, পরিষদেই সমাধান খোঁজা হইবে : বঙ্গবন্ধু

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদা : প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

ঘুরে আসুন সাজেক, খেয়াল রাখবেন কিছু বিষয়ে

নারী ও শিশু নির্যাতন: সভ্য সমাজের বর্বর বার্তা


image
image

রিলেটেড নিউজ

Los Angeles

০০:২৭, মে ১, ২০২১

Knowledge rich বনাম Knowledge poor 


Los Angeles

০০:১৭, এপ্রিল ১৭, ২০২১

১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল ও মুজিব নগর সরকার- একটি সাক্ষাৎকার


Los Angeles

২৩:০২, এপ্রিল ১৩, ২০২১

পবিত্র রমযান হোক করোনা থেকে পরিত্রাণের মাস


Los Angeles

২৩:৩৯, মার্চ ৩০, ২০২১

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যম-২


Los Angeles

০০:৩৫, মার্চ ৩০, ২০২১

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যম


Los Angeles

০০:২৪, মার্চ ৩০, ২০২১

বঙ্গবন্ধুর অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন


Los Angeles

১৪:৩২, মার্চ ২৭, ২০২১

ঢাকার প্রতিরোধঃ রাজারবাগ


image
image
image

আরও পড়ুন

Los Angeles

১৩:৫৫, জুন ১৫, ২০২১

দোহাজারীতে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ আটক-৩, কাভার্ডভ্যান জব্দ


Los Angeles

১৩:৪৭, জুন ১৫, ২০২১

আউশে আশাবাদী আনোয়ারার চাষীরা


Los Angeles

১৬:২৫, জুন ১৪, ২০২১

রাউজানে মাদকসহ আটক-১